নির্বাচন-দিনের নির্ঘুম রাত্তিরে…

Posted on 1st May, 2026 (GMT 14:41 hrs)

দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ⤡

ক।। গৌরচন্দ্রিকা

আমি শোকার্ত। ভারতের গণতন্ত্রকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখছি। সরকার আর নির্বাচনী কমিশন আঁতাত করে যাচ্ছেতাই কাজকম্মো চালাচ্ছে। বিচারব্যবস্থার অবস্থাও তথৈবচ। আর সরকার? সরকার, রাষ্ট্র, দেশ আর ভারতীয় জনতা পার্টি সমার্থক হয়ে গেছে। সদাগররা বিপুল টাকা ঢালছে ভাজপার ফান্ডে। কেন? Cronyism? আম্বানি -আদানির duopoly? বিপুল ধার নিয়ে ফেলেছে আমাদের ভারত সরকার বিগত বারো বছরে।

যাকগে সেকথা। কিন্তু, আমি ভীত-সন্ত্রস্ত। যদি ওই ভাজপা চলে আসে আমার রাজ্যে, তাহলে তো আমাকে ভিটেমাটি ছাড়া করবে এরা! ভোট-গণনান্তে যে সন্ত্রাস শুরু হবে, তা’ রুখবে কে? সবারই তো আছে পোষা লুম্পেন গুণ্ডা । তারাও তো বিজয়ীর পক্ষে চলে যাবে। ব্যাপক ঘোড়া কেনা-বেচা হবে।

নাহ, আমি বোধহয় ভুল ভাবছি, কেননা এই

নির্বাচনে কোনো সন্ত্রাস নেই এখানে দেখুন⤡

খ।। কালো হাঁসের আবির্ভাব

এই অ-সময়েই এক জ্যান্ত সহ-নাগরিক এসে হাজির হয় আমার সামনে। ভোটার-লিস্টিতেও ওর নাম নেই। যদিচ আছে যাবতীয় কাগজপত্তর। ও প্রথমেই বলে ওঠেঃ “হাম হ্যায় কী হম নেহি”?

Exi(s)ting Without Exit in Contemporary India: “Hum Hain Ki Hum Nahin?” VIEW HERE ⤡

আমি পড়লুম আতান্তরে–অস্তিত্বের সংকট দেখা দিচ্ছে যে। আমি কোথায়? কেন? কি করছি? আমার এজেন্সি কী? কার এজেন্ট হয়ে কাজ করছি? অজ্ঞাত–জানি না।

ও বলে, “আমার এই একটা উদাহরণেই পুরো SIR-এর নামে CAA চালানো বাতিল হয়ে যাবে।”

আমি হেসে ফেল্লুমঃ “মাত্র একটা নমুনাতেই?” যেহেতু আমি কেঃ সঃ কর্মচারী, তাই চেষ্টা করলুম নিজেকে সরকার=দলের পক্ষে কথা কইতে।

আমি ওর কাছে কোটিখানেক হাঁসশুমারি করে এক ও অদ্বিতীয় সত্যির দাবি পেশ করলুমঃ

“এই পৃথিবীর সব হাঁস সাদা।“

ও এনে দেখালো একটা কালো হাঁস।

ব্যাস! আমার সব সত্যির বেলুনটা দুম করে ফেটে গেলো এক ঝটকায়।

Black Swans vs. the Machine: A Dialogue with Grok (AI) VIEW HERE ⤡

আমি বললুম, “বিজেপি-সরকারের আমলে সমস্ত ভোটপ্রক্রিয়া বৈধ, বৈজ্ঞানিক আর নির্ভুল।”

ও সঙ্গে সঙ্গে এক ব্রাজিলের মডেলকে এনে দাঁড় করালো-যার নাম রয়েছে ভোটার লিস্টিতে।

তারপর আবার একজন জ্যান্ত লোককে এনে দেখিয়ে দিলো যে নির্বাচনী লিস্টিতে সে ব্যাটা মড়া। এক্কারে প্রত্যক্ষ প্রমাণ!

এরপর সে ফেসবুক খুলে দেখিয়ে দিলো একটা লোক সগর্বে বলছে যে সে হরিয়ানাতেও ভোট দিয়েছে, আবার বিহারেও ভোট দিয়েছে। ভোটার লিস্টি খুলে দেখিয়েও দিলো সেটা।

এরপর সে ভোটার লিস্টি খুলে দেখালো একটা বাড়িতে, একই ঠিকানায় ৪০০ লোক থাকে। কিন্তু সে নাকি সরেজমিন তদন্ত করে দেখেছে যে সেই ঠিকানার দশ ফুট বাই দশ ফুটে এতো লোক থাকাটা অসম্ভব।

ও থামলো না। ও আরো দেখাতে থাকলো। বহু কেন্দ্রে যতো ভোট গুণতি হয়েছে, আর যতো ভোট পড়েছে – তাতেও ব্যাপক গরমিল।

হঠাৎ এরপর দেখি নন্দলাল বসুর উত্তরাধিকারীরা এসে হাজির। তাঁরা তাঁদের ভোটার আই কার্ড দেখালেন, দেখালেন আরো প্রচুর কাগজ-পত্তর, কিন্তু শত চেষ্টাতেও, কোর্টে গিয়েও তাঁদের নাম লিস্টিতে উঠলোনা।

আমি ফাঁপড়ে পড়লুম। আমার সত্যের দাবি এই কালো হাঁসের যুক্তিতক্কে নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। এই কালো হাঁসগুলোর খপ্পরে পড়ে আমি বেহাল।

ও বললো, ‘’শূন্য ঠিকানাওলা মানুষের নামে ভরে আছে ভোটার লিস্টি। জ্ঞানদা বলেছেন, “এরা তো ঘরহীন, রাস্তায় শুয়ে থাকে। তাই এদের ঠিকানাটা ওরম।“

তাহলে প্রধাণমন্ত্রী আবাস যোজনা থাকা সত্ত্বেও কেন ঘরহীন মানুষ? এটা এই প্রকল্পের ব্যর্থতা নয় কি? কেনই বা ঘরহীন মানুষকে ধারের জন্য ছুটতে হয় মুকেশ আম্বানির কুটুম অজয় পিরামলের ফিন্যান্স কোম্পানির মতো চড়া সুদে লোন-দেনেওয়ালার কাছে?’

ও আরো বলে চললোঃ “করদাতাদের পয়হায় বুথে সিসিটিভি লাগিয়ে নজরদারি করা হলেও সেই সিসিটিভির ফুটেজ যায় গায়েব হয়ে। দেখানো যায় না। মা-মাসীদের নজ্জা করবে না! ও আরো কইলো, সরকার বাহাদুরের কেন এতো প্রবল লুকোনোর ইচ্ছে (Will to Hide, জুগুপ্সা, erit celare)?

আমি বিপদে পড়ে বলে উঠলুম, আদেশ দিলুম— এসব নিয়ে প্রশ্ন করা চলবেনা। চোপ! শাট আপ!”

ও তবু চুপ করলো না, বরং বললে, “চলবে না কোনো আর-টি-আই। আর-টি-আই খতম। সরকারিভাবে বেসরকারি অশোকস্তম্ভ-ছাপ্পাওলা পি-এম কেয়ার ভাণ্ডার নিয়েও কোনো প্রশ্ন নয়!”

তার কথার তোড় কিছুতেই থামে না–ছুটলে কথা থামায় কে? (অঘোষিত জরুরি অবস্থার সময় সংলাপ যায় থেমে–কী কহিবো আর কী কহিবো না তাহা আমার মালুম নেই।–এটা আমার মনের কথা–স্বগোতক্তি। সাহস করে, মন-মুখ এক করে কইতে পারিনে যে–)

অঘোষিত জরুরি অবস্থার (দুঃ-)সময়ে না-রাষ্ট্রের বি-কল্প-না (Imagining No-State Alternities Amidst the Horrors of Undeclared Emergency) এখানে দেখুন⤡

আরো বলে চলে, “এবার বলুন যেসব VIP, MLA, MP, সদাগররা দেবতা-পদে আরোহণ করেছেন , জনকল্যাণে নিজেদের সঁপে দিয়ে দেবতা হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কাকে ভোট দেবো? কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম? কোন্ দেবতারে হবি মোরা করি সমর্পণ?কোন্ দেবতারে ভোট মোরা করি সমর্পণ?

কেননা কালো হাঁসের যুক্তির দৌলতে এই নির্বাচনটাই তো সম্পূর্ণরূপে অবৈধ।

আর হ্যাঁ, VIP-র বাংলা মানে জানেন তো? “Vওটের সময় Iহাদের Pআওয়া যায়”।‘

আমি বল্লুম, “একপক্ষধারণ করো। জানবে, বিজেপি-স্বধর্মে খুন-ধ @র্ষ *ণ& করা ভালো, কিন্তু পরের ধর্ম ভয়াবহ—গীতার ৩ নমবর অধ্যায়ের ৩৫ নমবর শোলোকে এমন কথাই কওয়া হয়েছে। মেরে ফেলো ভিন ধর্মের লোকেদের। গীতার এই আপ্তবাক্য লঙ্ঘন করো না। প্রাণ সঁপে দাও অখণ্ড হিঁদু রাষ্ট্রে।“

“না দেবো না। যা অবৈধ, তাকে গোড়ার গলদ বলেই কোদালকে কোদাল বলবো” বলে ও গেয়ে উঠলোঃ

তবু পারি নে সঁপিতে প্রাণ ।

পলে পলে মরি সেও ভালো, সহি পদে পদে অপমান ।।

কথার বাঁধুনি, কাঁদুনির পালা— চোখে নাহি কারো নীর ।

আবেদন আর নিবেদনের থালা ব’হে ব’হে নত শির ।

কাঁদিয়ে সোহাগ, ছি ছি একি লাজ ! জগতের মাঝে ভিখারির সাজ—

(রেউড়ির উবে-যাওয়া অর্থনীতিঃ Dole Economy)

আপনি করি নে আপনার কাজ, পরের ‘ পরে অভিমান ।।

আপনি নামাও কলঙ্কপশরা, যেয়ো না পরের দ্বার—

পরের পায়ে ধ’রে মান ভিক্ষা করা সকল ভিক্ষার ছার ।

‘দাও দাও’ ব’লে পরের পিছু পিছু কাঁদিয়া বেড়ালে মেলে না তো কিছু—

মান পেতে চাও, প্রাণ পেতে চাও, প্রাণ আগে করো দান।।”

গ।। কোন্ দেবতারে ভোট মোরা করি সমর্পণ?

জ্ঞানচক্ষু খুলতে না খুলতেই ভোটচুরির বহর দেখে ফেলেছিলুম। কদিন আগে রাহুল গান্ধীর ভোট-ডাকাতি নিয়ে প্রেস কনফারেন্স দেখতে দেখতে কতো কতাই না মনে পড়লো।

১৯৭২। আমার বয়স সাত। বরানগরে থাকি। বরানগর তখন এত্তো বেআইনি ঘিঞ্জি বস্তিতে পরিণত হয় নি।  ইতোমধ্যে তাই নেহাতই কৌতুহল বসে খুনে ভরা বরানগর দেখা হয়ে গেছে। খড়খড়ির জানলা দিয়ে দেখতুম। মা-বাবারা টেনে সরিয়ে আনতেন। বোমের নানান অংশ ছুটে আসতো আমাদের বাগান পেরিয়ে খড়খড়ি জানলায়।

বিকেলে বাড়ির সামনের মাঠে খেলছি। দাদু এসে বন্ধুদের বাড়ি চলে যেতে বলে, আমাকে বাড়ির ভেতর টেনে আনলেন। তারপরেই শুরু হল আনতাবড়ি বোমাবাজি।  ঝোপজঙ্গল এবং কোনো জঞ্জালের স্তূপের ওপর ওঠা মানা ছিল। উঠলে আমিও তামান্না হয়ে যেতুম।

ঠেলা করে লাশ যাচ্ছে শীলে ঘাটে। দেখছি। মোরামের রাস্তা রক্তস্নাত। এইসব দেখেই আমার মধ্যে ঢুকে গেলো রক্তভীতি–হেমিআটোফোবিয়া। একদিন মায়ের হাত থেকে ডাক্তারি কারণে রক্ত নেওয়া হচ্ছে আর গা থেকে ঘাম ঝরতে লাগলো। তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলুম।

আর শীলেঘাট হয়ে গেলো (আমার ভূতের বাড়ির মতোই) ভূতের ঘাট। রাত্তিরে কেউ যেতো না। এখন প্রেমিক-প্রেমিকারা অনায়াসে তাদের অভয়ারণ্য বানিয়ে ফেলেছিলো বটে, কিন্তু রক্তে রাঙা সেই ঘাটে মরাল পুলিশরা প্রেমকে নিষিদ্ধ করেই ছাড়লো।

বিগত শতাব্দীর সাতের দশকে বরানগরে সচরাচর কেউ আসতে চাইতেন না। আমাদের বাড়িতে রক্তীয় আর বন্ধুরা কেউই প্রায় আসতেন না। এখন বরানগর বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়িতে ভরপুর এক ঘিঞ্জি বস্তি। আগুন লাগলে বা ভূমিকম্প হলে বেরোবার কোনো জায়গা নেই।

১৯৭২-এর বিধানসভা নির্বাচন। ভোটের আপিসি কাজ সেরে এসে বাবা বললেন, “ভোট হয়নি, আমাদের প্রত্যেকের টেবিলে ছোরা গোঁজা ছিলো।”

বরানগর বিধানসভায় কংগ্রেস আর সি পি আই-এর যৌথ উদ্যোগে হেরে গেলেন জ্যোতি বসু। জিতলেন সি পি আই-এর শিবপদ ভট্টাচার্য। এ জেতার মানে কী?

এরপর বছর তেরোচোদ্দো বয়সেই কানে বসে গেলো “Scientific Rigging” শব্দটা। তারও সাক্ষী বাবা আর প্রাপ্তবয়স্ক আমি– নির্বাচনিক আধিকারিকের কাজ করতে গিয়ে বুঝে গেলুম Scientific Rigging কেমনে সম্পন্ন হয়।

যাঁরা এই Scientific Rigging করতেন, তাঁরা দেখলুম পাড়ায় বেশ মাতব্বর হয়ে উঠেছেন–ওই কচুগাছ কাটতে কাটতে ডাকাত হওয়ার মতো আর কী! হামবড়া তেনারা কিই না করতে পারেন। ভাড়াটে-বাড়িওলা উচ্ছেদ থেকে প্রমোটারি, সুসংহত তোলাবাজি ইত্যাদি।

এবার হল কী, ১৯৯৮-৯৯ তে দমদম লোকসভা কেন্দ্রে পরপর দুবার  জিতে গেলেন ভা জ পা-র তপন শিকদার। Scientific Rigging-বাহিনির হত্তাকত্তারা গেলেন কোথায়? দলের কমরেড ক্যাডারদের loot-us প্রতীকে ছাপ দিতে বলে তেনারা নার্সিং হোমে চলে গেলেন।

দাঁড়ান মশাই। আরো একটু স্মৃতি ঘেঁটে নিই।

আমার #Testimony (আইনশাস্ত্র মোতাবেক, ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রে যারে কয় শব্দ প্রমাণ) বা স্মৃতিচারণঃ

১৯৯৮-এর লোকসভা নির্বাচনের পর দমদম লোকসভা কেন্দ্রের পরাজিত প্রার্থী সিপিআইএমের প্রাক্তন সাংসদ নির্মলদার (চ্যাটার্জি) সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। স্থানঃ বরানগর আই এস আই-এর সস্তা ক্যান্টিন।

তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে গেছিলেন বিজেপির তপন সিকদারের কাছে।

যদিও কারণটা জানতুম, তবু জিজ্ঞেস করলুম, ‘হারার কারণ কি নির্মলদা?’

নির্মলদা হেসে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘পার্টি ক্যাডারদের বিশ্বাসঘাতকতা।’

সে সময়ে সিপিআইএমের ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ যাঁরা পরিচালনা করতেন, তাঁদের অনেকেই নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই “অসুস্থ” (!?) হয়ে ঢুকে গেছিলেন প্রাইভেট নার্সিংহোমে।

স্বাভাবিক। এঁদের একজন নেতাকে তো আমি চোখের সামনে দেখেছি (১৯৯৪-৯৫) বরানগর জুটমিলে মালিকের হয়ে কাজ করতে, শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে ছুরি মারতে।

সে সময়ে আমাদের এই লোকসভা কেন্দ্রে একটি প্রবাদ চালু হয়েছিলো,

‘চুপচাপ, ফুলে ছাপ।’

পার্টির ক্যাডারদের কাজকম্মো সে সময়ে সাক্ষাৎ দেখেছিলুম। আজ বিশেষ কিছু টাটকা খবর পেয়ে তাদের সঙ্গে কথা বললুম, ব্যাপারটা ঝালিয়ে নিলুম।

(আমার testimony-তে বা স্মৃতিচারণায় কোনো গলদ থাকলে ধরিয়ে দেবেন প্লিজ।)

জয়প্রকাশের #Partyless_democracy / Partyless Society -র ধারণা যেমন একই ছাতার তলায় গান্ধীবাদী, সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে জনসংঘকে আনলেন এবং খাল কেটে কুমীর নিয়ে এলেন।

এই জনসংঘ আর আজকের ভাজপা প্রকাশ্য দিবালোকে পুকুর থুড়ি ভোট-চুরিই শুধু করেনি, ভোট ডাকাতি করেছে বজ্জাতগুলো। আর এখন যা হয়–চোরের মায়ের বড়ো গলা! এই ধর্ষক খুনে দলটা রাহুলকেই উলটে মিথ্যেবাদী বলছে।

তোলাবাজ তিনু ঘেসোদের কথাই বা কী বলি! সারা প: ব: আজ চোর-ছ্যাচোঁড়দের বোম-বোঝাই উপত্যকা হয়ে গেছে। অনিলায়ন পর্যায়ে দলানুগত্য যথেষ্ট ছিলো, আজ পহয়া উপুড় করে ঢেলে নোকরি, ডক্টরাল ডিগ্রি ইত্যাদি পেতে হয়। ব্যাপারটা আরো সাংঘাতিক। আগের ক্ষমতাসীন দল এবং তিনু-ঘেসোরা যা করতো/করে, তার হাজার গু-ন বেশি ভোট-ডাকাতি করে ভাজপা কোম্পানি। এই ধনীতম দলটার কেচ্ছা-কেলেংকারির খবর জনতার কাছে পৌঁছোতে পারে না। কারণ, গণতন্ত্রের চার নম্বর স্তম্ভ, “গণমাধ্যম” বিকিয়ে গেছে আদানি-আম্বানির মতো ক্রোনি ধনপতি শেঠেদের হাতে।

এই ইতিহাস জনগণতন্ত্রের ওপর বিশ্বাস হারানোর ইতিহাস। বন্ধ্যা, বেশ্যা (sexism অভিপ্রেত নয়; দ্র: গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’), কুতর্কের দোকান, শুয়োরের খোঁয়াড় সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বরূপ জানা হয়ে গেছে। বিপুল টাকাপয়হার বিশ্বাসঘাতক লীলে চলছে– লীলা/খেলা হোবে। এই ভানের জগতে থেকে কোন্ দেবতারে ভোট মোরা করি সমর্পণ?

বল মা তারা, (ট্যারাশশী মাগো), দাঁড়াই কোথা?

কমরেড সুভাষদার কাজকম্মো আমাকে নোতুন শ্লোগান দিয়েছেঃ “কাস্তে, হাতুড়ি, জয় মা তারা!”

CPIM NOW: THE DOUBLE STANDARDS OF THE “REDS” VIEW HERE ⤡

সংযোজন:

আঙুলে ভোটের কালি মোছার তরিকা শিখে যান শিখে যান!

একই ভোটার বারংবার ভোট দেয় কী করে বাপু? আঙুলের ওপর কালির ছাপ আছে তো?

স্টেপ বাই স্টেপ পদ্ধতি:

(এটা আমি বামফ্রন্ট আমলেই রপ্ত করেছিলুম)

১. আঙুলে গ্লিসারিন লাগিয়ে বুথে যাও;

২. (ক) কালির দাগ পড়লো। তুমি ঘরে ফিরে নেলপালিশ রিমুভার লাগাও; অন্যথায়

২. (খ) দেশলাই-এর কাঠির বারুদ-অংশটা জলে চুবিয়ে ঘসতে থাকো।

ব্যাস, কেল্লা ফতে।

পুন: ইদানীং দেখছি, ভোটের কালির গাঢ়তা আর নেই। কেমন যেন পাতলা হয়ে গেছে। low quality-র মাল। হয়তোবা,

১. cut money দিতে গিয়ে কালি কোং-কে compromise করতে হয়েছে;

নতুবা,

২. সহজেই যাতে মুছে ফেলা যায়, তার বন্দোবস্ত করার আদেশ পেয়েছিলো কালি কোম্পানি।

[আমার দুটো ফেসবুক পোস্ট মিলিয়েজুলিয়ে ওপরের বয়ান তয়ের করলুম। একটা ১১ই অগস্ট, ২০২৫-এ করা। আরেকটা ২৪ শে মার্চ, ২০১৯-এ পোস্টানো হয়েছিলো।]

EVMs and/or Ballots: Binary Dead-Ends? VIEW HERE ⤡

ঘ।। শোক থেকে গজিয়ে ওঠা শোলোকসকল

হাতে নিয়ে বসি সার্ত্রের Being and Nothingness আর Existentialism is a Humanism। পাশে পড়ে আছে সার্ত্র-বিরোধী উৎপল দত্তের “ঘুম নেই”। সেল ফোনে চলছে, “নিদ্রাহারা রাতের এ গান বাঁধব আমি কেমন সুরে।”

চেষ্টা করি সার্ত্রের Anguish (Angoisse; একরকম উদ্বিগ্ন যন্তরনা) আর হাইদেগারের Angst-এর তফাৎ বের করতে। কেননা এখন আমি নানান যন্তরনায় জ্বলছি যেমন, উদ্বিগ্ন হচ্ছি, তেমনি আতঙ্কিতও হচ্ছি…কিম্বা এই দুটোর মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায় আছি… সার্ত্র Angst বদলে করেছেন angoisse! কেন? কী ব্যাপার এটা?

আমি মনে হচ্ছে পড়ে যাবো অনেক নিচে। আমার মাথা ঘুরছে–acrophobia ধরেছে আমায় নাকি আমি falling (Verfallen) being? গ্রীক ভাষায় যারে কয় ptōsis (πτῶσις) আর লাতিনে casus! আমি পড়ে যাচ্ছি–আমার পতন হচ্ছে। এই পতনের সময় আমি আমার চিহ্নিত শত্রু “অপর”-এর নিপাত দেখে উল্লসিত হচ্ছি। Hell is the other people.

কানে ভাসছে এখনো “অরণ্যের দিনরাত্রি”-র অসীমের সেই সংলাপ, “যতো উঠবে, ততো নামবে।”

আমি ঘেরাটোপের মধ্যে উঁচু জায়গাতেই আছি–আমি লাফ দিতে পারি–সে স্ব-অধীনতা তো আছে। মরণের ভয়ে পারছি না। এই উদ্বিগ্ন হওয়াটাই আমার ফুটে বেরোনো angoisse

এই জুয়ার জগতে আমি আর জুয়ারি থাকবো না। শেয়ার বাজার বা মিউচুয়াল ফান্ডেও যাবো না। এমনকি ফিক্সড ডিপোজিটের আপাত নিরাপত্তাতেও মজবো না। আমি ইসলামপন্থীদের মতোই রিবা বা বসে-বসে সুদ খাওয়াকে হারাম বলেই মনে করি

Who are the Money-Mongers in India: Hindutvavadins or Muslims? VIEW HERE ⤡

কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের গ্যারেন্টি কী? কে দেয় সে গ্যারেন্টি? আমি নিজেই? নাকি অজান্তেই আমি বনে যাই তথাকথিত স্ব-রাট সিদ্ধান্ত-নেওয়া অ্যাক্টর থেকে কোনো বড়ো ভাইয়ের এজেন্ট? স্বরাট সিদ্ধান্ত-নেওয়া সত্তা কি আদৌ আছে? হ্যাঁ। I am condemned and constrained to be free। আমার স্ব-প্রদত্ত আজাদির পরিসর ক্রমশ-ক্রমাগত সঙ্কুচিত হতে হতে গলার মধ্যে দলা পাকাতে থাকে হয়তো বা…

আমার বমি পাচ্ছে। বমি করবার জায়গা কোথায়?

মুঠোফোনে আপনা হতেই বেজে উঠলো একটা গানঃ

“বিশ্ব যখন নিদ্রামগন, গগন অন্ধকার,

কে দেয় আমার বীণার তারে এমন ঝঙ্কার ॥

নয়নে ঘুম নিল কেড়ে,  উঠে বসি শয়ন ছেড়ে–

মেলে আঁখি চেয়ে থাকি, পাই নে দেখা তার ॥

গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া প্রাণ উঠিল পুরে,

জানি নে কোন্‌ বিপুল বাণী বাজে ব্যাকুল সুরে।

কোন্‌ বেদনায় বুঝি না রে   হৃদয়  ভরা অশ্রুভারে,

পরিয়ে দিতে চাই কাহারে আপন কণ্ঠহার॥”

হঠাৎ আমার বীণার তারে কে যেন ঝংকার জাগালো। মরণ অমোঘ মেনেও অ্যাবসার্ড কাজ করে ফেললুম।

“I say, in earnest, that I should probably have been able to discover even in that a peculiar sort of enjoyment—the enjoyment, of course, of despair; but in despair there are the most intense enjoyments, especially when one is very acutely conscious of the hopelessness of one’s position. And when one is slapped in the face—why then the consciousness of being rubbed into a pulp would positively overwhelm one.”

Robert Browning-এর “The Patriot”-আদ্যছেরাদ্দ করে, Jean-Paul Sartre- এর “Les Mouches” থেকে ঝেড়ে আর Foucault-র “Discipline and Punish” মগজে গুঁজে এই বয়ানটা নির্বাচন-প্রহসনের আগের দিনে লিখে ফেল্লুম। আমি তাই এইসমস্ত মিলিয়ে-মিশিয়ে একটা ঘণ্টপাক, চচ্চড়ি বা খিচুড়ি রান্না করেছি- চেখে দেখুন। শোক থেকে নাকি শোলোক হয়। এটা তা’ হল কিনা জানি না, কেননা আমি কবি নই, র‍্যাঁবোর কথা মোতাবেক “প্রথম দ্রষ্টা”ও নই। এলিয়ট তো কয়েছেনই কবিরা কুম্ভিলকে ওস্তাদ–plagiarists!

এক।।

পুরোটা পথ পদ্ম আর পদ্ম,

এই অমৃতকালের

সুরভিত পাগলা দুর্গন্ধে আমি একা দেশপ্রেমী,

ঢেকে রাখি যত পুতিগন্ধময় নোংরা

স্বচ্ছ ভারতের বাপুজি চশমায়,

যদিচ আমরাই খুন করেছি তাকে,

(হিপোক্রেসি কি ভি সীমা হোতি হ্যায়।)

ঘরের ছাদগুলো যেন দুলছে আনতাবড়ি,

বুলডোজার চালাবো আমি এদেরই ওপর।

রামমন্দিরের চুড়ো যেমন বজরঙ্গী প্রোজ্জ্বল পতাকা

(পত পত পতন!)

বিগত বারো বচ্ছরের ঠিক এই দিনে।

দুই।।

দমবন্ধ ধোঁয়াশা ফুসফুসে চেতাবনি ঘণ্টাবাজায়

বেনারসী সাঁঝের আরতি-পুণ্যতায়,

জনতার ভিড়ের চিৎকারে করেছিল জালিওয়ানাবাগের

রক্তাক্ত পুরোনো দেওয়ালগুলোকে সুন্দরী করে তুলি আমি,

মুছে যায় ২০০২-এর রাজধম্মো পালন।

আমি বলেছিলাম, “হে চাড্ডিগণ, মাতো মোচ্ছবে

এই আন্ধেরা নগরীর আকাশ ভরে যাক ফাটকা-বাজিতে”!

(কে আর মনে রাখে ভয়ংকর AQI হাহা…

চৌপাট নয় না-জৈব রাজা—আমি, আমি, আমি)

ভক্তরা অন্ধ ভক্তিতে কয়েছিলো, “এবং অবশেষে, আরো কিছু ?”

অযোধ্যার দেওয়ালি দীপের অবশেষ তেল

জোগাড় করে রান্না চালায়

যত্তোসব হাড়হাভাতের দল।

তিন।।

আমি যে সূর্যকে ডিঙিয়ে যেতে চেয়েছি, চাইছি, চাইবো…

অন্ধ ভক্ত আমার, এটাই আমার তোদের জন্য উপহার।

মানুষ যা করতে পারে না,

তা’ না-জৈব অবতার আমি করছি খতম।

তোমরা দেখেছো আমার ফসল, যা আমি আদৌ ফলাই নি,

ঠিক এই দিনে, এখন বারোটা বছর পার হয়েছে।

নিন্দুকেরা বলে নাকি বারোটা বেজেছে আমার।

বলুক গে যাক।

খ্যামতা কালা—শোনে না কিছুই।

চার।।

এখন কেউ নেই ছাদের ওপরে—

শুধু কয়েকজন কুষ্ঠরোগী বসে আছে জানলায় ;

আমিই বলি, সেরা দৃশ্য তো এখানেই,

গুজরাট, কাশ্মীর বা মণিপুরের কসাইখানায়—

অথবা আরও মধুর,

যেখানে ফাঁসির উঁচু মাঁচা দাঁড়িয়ে হাসে,

আমার ক্রোধের অটলয়মান সিংহাসন,

আমার প্রতিশোধ খোদাই করা আছে

তোদের ঠুনকো শরীরের হাড়েমাসরক্ত।

ঐ তোদের ভগ্ন শরীর তো আমারই ধুসর পাণ্ডুলিপির দফতর,

যেখানে আমি আগুন দিয়ে লিখি আমার খ্যামতার গান,

ক্লাইটেমনেস্ট্রা আর তার প্রেমিক ঈজিস্থাস মিলে

রাজা আগামেমননকে খুন করেছিলো।

জনতা করেনি কো প্রতিবাদ।

রক্তের এই চোখ ধাঁধানো মোচ্ছবে,

তাই আমজনতাকে প্রায়শ্চিত্তির করাতে বাধ্য করে দেবতারা—

শহরে মাছির ঝাঁক পাঠিয়ে তোদের রুগ্ন শরীরকে ধ্বস্ত করেন তাঁরা—আমার দেবতারা!

শাস্তিই তো নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার—

জানিস নাকি তোরা?

ভোগ তোরা নিশ্চুপ প্রতিবাদহীন-পাপের দরুন

অপরাধবোধ আর অনুশোচনায়,

মাছির কামড়ে মরগে যা,

করগে যা তোরা প্রায়শ্চিত্তিরের পুজোয়াচ্চা।

আমার গভীর ক্ষত সেরে উঠছে তোদের ছিন্ন দেহে,

তার আর্তনাদ আমার কানে আনে রম্যবীণার সুর,

রোম পুড়িতেছে আর আমি সম্রাট বাজাই ব্যায়লা।

আমার সিংহাসন ফের প্রতিষ্ঠিত হয়

তোদের সেকু-মাকু-আরবান নক্সালী চিলচিৎকারে।

কোনো লুকানো প্রকোষ্ঠের দরকার নেই আর,

আমিই প্যানঅপটিকন, প্রকাশ্য আলোয় সর্বদ্রষ্টা;

এখানে আমার খ্যামতা জ্বলে উঠুক রক্তিম মরীচিকা শিল্পে,

তোদের লোভাতুর নজর আনুক চোখের জলের জোয়ার,

আমি দেখি, আমি উপভোগ করি, আমি আনন্দ পাই।

শুধু এই হৃদয়ের নাটকে, এই রক্তাক্ত মঞ্চে

আমি ঘোষণা করি: “দেখো, আমিই আমি! আমিই সব!”

তোদের ভাঙা শরীরই প্রমাণ করে

আমার অপরাজেয় শক্তি—

ছায়ার মায়ায় লুকিয়ে রাখি আমি,

পুলোয়ামায় অথবা পহেলগাঁও-এর মারণলীলেয়,

বরং হাড়মাস উন্মুক্ত করে দিই সূর্যের নিচে,

দুপুরের অপলক আলোয়, যাতে সবাই দেখে,

সবাই ভয় পায়,

সবাই আমাকে ভালোবাসে।

আহা, কী আনন্দ!

এই দৃশ্য দেখে আমার রক্ত গরম হয়,

তোদের প্রতিটা ফোঁটা রক্তে

সার্বভৌম আমি কল্কি অবতার

নেত্য করি তাণ্ডবে দাঙ্গায়, হা হা—

নির্দয় ভোক্তা আমি,

আমি দেখছি,

আমি শাসন করছি,

আমি উপভোগ করছি রসাল রক্ত।

পাঁচ।।

আমি নকল যমুনার জলে ডুবকি মেরে পবিত্র হতে চেয়েছি,

দূষিত অম্লমধুর বরষায় কাজ নেই আমার

প্রয়োজনের চেয়েও বেশি।

কিন্তু, একি হলো!?

পিছনে দড়িতে বাধা কবজি ফেটে যাচ্ছে কেন?

কপাল থেকে রক্তই বা ঝরছে কেন আমার?

তোরা ছুঁড়ে মারছিস কেন পাথর আমার দিকে?

আমি করেছি কি কোনো অপকম্মো? না তো!

এভাবেই আমার আসা আর যাওয়া

জেনে রেখো – বিজয়াতেও মানুষ মরে!

নন্দিনী। আচ্ছা, থাক্‌ ও কথা। মা গো, তোমার হাতে ওটা কী?

নেপথ্যে। একটা মরা ব্যাঙ।

নন্দিনী। কী করবে ওকে নিয়ে?

নেপথ্যে। এই ব্যাঙ একদিন একটা পাথরের কোটরের মধ্যে ঢুকেছিল। তারই আড়ালে তিন হাজার বছর ছিল টিঁকে। এইভাবে কী করে টিঁকে থাকতে হয় তারই রহস্য ওর কাছ থেকে শিখছিলুম; কী করে বেঁচে থাকতে হয় তা ও জানে না। আজ আর ভালো লাগল না, পাথরের আড়াল ভেঙে ফেললুম, নিরন্তর টিঁকে-থাকার থেকে ওকে দিলুম মুক্তি। ভালো খবর নয়?

মুই বেড়াল না তুই বেড়াল!

১.

আমার দুটো বেড়াল ছিলো,

নাম রেখেছিলুম কৈশোরী চাপল্যে,

জীবনানন্দ আর বোদলেয়্যর।

তারা আমার কোলে বসে

আদর খেতে খেতে শুনতো

পাঁকের মধ্যে ফুল ফোটার গপ্পো।

তারপর জানলুম শ্রয়ডিঙ্গারের বেড়ালের কথা।

জীবু আর বোদু তখন আর নেই।

২.

আমি শ্রয়ডিঙ্গারের বেড়ালটাকে খুঁজছি বহুদিন।

সেকি বেঁচে আছে?

নাকি গেছে মরে?

অথবা জ্যান্তে মড়া?

বিষ কীটনাশক খেতে

সবুজ শহিদ হয়ে গেছে নাকি?

নাকি ধুঁকছে এখনো?

জীবুর গলা শুনতে পাই,

“একবার তাকে দেখা যায়,

একবার হারিয়ে যায় কোথায়।”

৩.

বাংলা ইস্কুলটা বন্ধ।

সেখানে পোলিং বুথের ম্যারাপ বেঁধেছে।

কেউ যেন হাঁক পাড়ে,

“ইস্কুলে আসুন দাদা।–

ভোট দিতে হবে যে।”

কোথায় সেই ইস্কুল?

নেই–ইস্কুল নেই।

৪.

আমার সামনে একটা যন্তর,

এই যন্তরটা সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।

শুধু এটুকুই জানি,

এই যন্তরটা প্রায় কোনো প্রযুক্তি-উন্নত দেশে ব্যবহার করা হয় না।

“ম্যাঁও”– একটা ক্ষীণ আওয়াজ শুনতে পেলুম বাস্কের ভেতর থেকে।

আরে এতো শ্রয়ডিঙ্গার–আমার আদরের শ্রডু!

“হ্যাঁরে, তুই এখনো জ্যান্ত?”

শ্রডু কয়, “আমি জ্যান্ত না অ-জ্যান্ত, তা’ আমি নিজেও জানি না, আমি ধুঁকছি।”

আমি কই, “তুই ওই যন্তরটার থেকে বেরিয়ে আয়।

খুপরির ভেতর হাঁপাচ্ছিস তো!”

উত্তর নেই শ্রয়ডিঙ্গারের বেড়ালের–

আমি জ্যান্ত না না-জ্যন্ত নাকি জ্যান্তে মড়া এক শিড়দাঁড়া আর মগজহীন!?

৫.

“আমি রাজার বাড়ির সরকার, আমার নাম মজন্তালী। তোরা যে আমাদের রাজার জায়গায় থাকিস, তার খাজনা কই? খাজনা দে।’

–একটা কুঁদো বেড়াল দেখি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।

হুম, সরকার– মজন্তালী সরকার। তোলা তুলতে বেরিয়েছে তখনই, যখন পার্টি-সরকার গুলিয়ে মুলিয়ে একাক্কার।

সে এখনো জ্যান্ত বটে, নিশ্চিত জানি মরবে কদিন বাদেই–মুসোলিনির মড়ার ওপর আমি মুতছি।

গণতন্ত্র মানে কি কেবল একদুদিনের ভোটের মোচ্ছব কেবল?

[ওপরের দুখানা লেখাই ফেসবুকে পোস্টানো হয়েছিলো দ্বিতীয় দফার ভোটের ঠিক আগেরদিন, অর্থাৎ ২৮শে এপ্রিল, ২০২৬-তারিখে।]

ভুলি কেমনে, আজো যে মনে…

মজন্তালী সরকার

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

এক গ্রামে দুটো বিড়াল ছিল। তার একটা থাকত গোয়ালাদের বাড়িতে, সে খেত দই, দুধ, ছানা, মাখন আর সর। আর একটা থাকত জেলেদের বাড়িতে, সে খেত খালি ঠেঙার বাড়ি আর লাথি। গোয়ালাদের বিড়ালটা খুব মোটা ছিল, আর সে বুক ফুলিয়ে চলত। জেলেদের বিড়ালটার গায় খালি চামড়া আর হাড় কখানি ছিল। সে চলতে গেলে টলত আর ভাবত, কেমন করে গোয়ালাদের বিড়ালের মত মোটা হব।

শেষে একদিন সে গোয়ালাদের বিড়ালকে বললে, ‘ভাই, আজ আমার বাড়িতে তোমার নিমন্ত্রণ।’

সব কিন্তু মিছে কথা। নিজেই খেতে পায় না, সে আবার নিমন্ত্রণ খাওয়াবে কোথা থেকে? সে ভেবেছে, ‘গোয়ালাদের বিড়াল আমাদের বাড়ি এলেই আমার মতন ঠেঙা খাবে তার মরে যাবে, তারপর আমি গোয়ালাদের বাড়িতে গিয়ে থাকব।’

আজ আমার বাড়িতে তোমার নিমন্ত্রণ।

যে কথা সেই কাজ। গোয়ালাদের বিড়াল জেলেদের বাড়িতে আসতেই জেলেরা বললে, ‘ঐ রে। গোয়ালাদের সেই দই-দুধ-খেকো চোর বিড়ালটা এসেছে, আমাদের মাছ খেয়ে শেষ করবে। মার বেটাকে!’

বলে তারা তাকে এমনি ঠেঙান ঠেঙালে যে, বেচারা তাতে মরেই গেল। রোগা বিড়াল তো জানতই যে, এমনি হবে। সে তার আগেই গোয়ালাদের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। সেখানে খুব করে ক্ষীর-সর খেয়ে, দেখতে-দেখতে সে মোটা হয়ে গেল। তখন আর সে অন্য বিড়ালদের সঙ্গে কথা কয় না, আর নাম জিগগেস করলে বলে, ‘মজন্তালী সরকার।’

এইয়ো! খাজনা দে!’

একদিন মজন্তালী সরকার কাগজ কলম নিয়ে বেড়াতে বেরুল। বেড়াতে-বেড়াতে সে বনের ভিতরে গিয়ে দেখল যে তিনটি বাঘের ছানা খেলা করছে। সে তাদের তিন তাড়া লাগিয়ে বলল, ‘এইয়ো! খাজনা দে!’ বাঘের ছানাগুলো তার কাগজ কলম দেখে আর ধমক খেয়ে বড্ড ভয় পেল। তাই তারা তাড়াতাড়ি তাদের মায়ের কাছে গিয়ে বললে, ‘ও মা, শীগগির এস! দেখ এটা কি এসেছে, আর কি বলছে!’

বাঘিনী তাদের কথা শুনে এসে বললে, ‘তুমি কে বাছা? কোত্থেকে এলে? কি চাও?’

মজন্তালী বললে, ‘আমি রাজার বাড়ির সরকার, আমার নাম মজন্তালী। তোরা যে আমাদের রাজার জায়গায় থাকিস, তার খাজনা কই? খাজনা দে।’

বাঘিনী বললে, ‘খাজনা কাকে বলে তা তো আমি জানিনে! আমরা খালি বনে থাকি, তার কেউ এলে তাকে ধরে খাই। তুমি না হয় একটু বস, বাঘ আসুক।’

এসেছি।’

বাঘিনী আর তার ছানাগুলো ছুটে গিয়ে দেখলে, সত্যি মস্ত এক মোষ পড়ে আছে। তারা চারজনে মিলে অনেক কষ্টে সেটাকে টেনে আনলে, আর ভাবলে, ‘ঈস! মজন্তালী মশাইয়ের গায়ে কি ভয়ানক জোর!’

আর একদিন তারা মজন্তালীকে বললে, ‘মজন্তালী মশাই, এ বনে বড়-বড় হাতি আর গণ্ডার আছে। চলুন একদিন সেইগুলো মারতে যাই।’

একথা শুনে মজন্তালী বললে, ‘তাই তো, হাতি গণ্ডার মারব না তো মারব কি? চল আজই যাই।’

বলে সে তখুনি সকলকে নিয়ে হাতি আর গণ্ডার মারতে চলল। যেতে যেতে বাঘিনী তাকে জিগগেস করলে, ‘মজন্তালী মশাই, আপনি খাপে থাকবেন না, ঝাঁপে থাকবেন?’ খাপে থাকবার মানে কি? না—জন্তু এলে তাকে ধরে মারবার জন্যে চুপ করে গুঁড়ি মেরে বসে থাকা। আর ঝাঁপে থাকার মানে হচ্ছে, বনের ভিতরে গিয়ে ঝাঁপাঝাঁপি করে জন্তু তাড়িয়ে আনা।

মজন্তালী ভাবলে, ‘আমার তাড়ায় আর কোন জন্তু ভয় পাবে?’ তাই সে বললে, ‘আমি ঝাপিয়ে যে সব জস্তু পাঠাব, তা কি তোরা মারতে পারিস? তোরা ঝাঁপে যা, আমি খাপে থাকি।’

বাঘিনী বললে, ‘তাই তো, সে সব ভয়ানক জন্তু কি আমরা মারতে পারব। চল বাছারা, আমরা ঝাঁপে যাই।’

এই বলে বাঘিনী তার ছানাগুলোকে নিয়ে বনের অন্য ধারে গিয়ে, ভয়ানক ‘হাল্লুম-হাল্লুম’ করে জানোয়ারদের তাড়াতে লাগল। মজন্তালী জানোয়ারদের ডাক শুনে, একটা গাছের তলায় বসে ভয়ে কাঁপতে লাগল।

খানিক বাদে একটা সজারু সড়-সড় করে সেই দিক পানে ছুটে এসেছে, আর মজন্তালী তাকে দেখে ‘মাগো’ বলে সেই গাছের একটা শিকড়ের তলায় হাসতে হাসতে আমার পেটই ফেতে গিয়েছে!’ গিয়ে লুকিয়েছে, এমন সময় একটা হাতি সেইখান দিয়ে চলে গেল। সেই হাতির একটা পায়ের এক পাশ সেই শিকড়ের উপরে পড়েছিল, তাতেই মজন্তালীর পেট ফেটে গিয়ে, বেচারার প্রাণ যায় তার কি!

অনেকক্ষণ ঝাঁপাঝাঁপি করে বাঘেরা ভাবলে, ‘মজন্তালী মশাই না জানি এতক্ষণে কত জন্তু মেরেছেন, চল একবার দেখে আসি।’ তারা এসে মজন্তালীর দশা দেখে বললে, ‘হায়-হায়! মজন্তালী মশায়ের এ কি হল?’

মজন্তালী বললে, ‘আর কি হবে? তোরা যে সব ছোট-ছোট জানোয়ার পাঠিয়েছিলি! দেখে হাসতে-হাসতে আমার পেটই ফেটে গিয়েছে!’

এই বলে মজন্তালী মরে গেল।

বিড়াল

জীবনানন্দ দাশ

সারাদিন একটা বিড়ালের সঙ্গে ঘুরে-ফিরে কেবলই আমার দেখা হয়

গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামী পাতার ভিড়ে;

কোথাও কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতার পর

তারপর শাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর

নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির মতে নিমগ্ন হ’য়ে আছে দেখি;

কিন্তু তবুও তারপর কৃষ্ণচূড়ার গায়ে নখ আঁচড়াচ্ছে,

সারাদিন সূর্যের পিছনে-পিছনে চলছে সে।

একবার তাকে দেখা যায়,

একবার হারিয়ে যায় কোথায়।

হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরান-রং-এর সূর্যের নরম শরীরে

শাদা থাবা বুলিয়ে-বুলিয়ে খেলা করতে দেখলাম তাকে;

তারপর অন্ধকারকে ছোটো-ছোটো বলের মতে থাবা দিয়ে লুফে আনলো সে,

সমস্ত পৃথিবীর ভিতর ছড়িয়ে দিলো।

বিড়াল

শার্ল বোদলেয়র (অনুবাদঃ বুদ্ধদেব বসু)

আমার কামুক বুকে উঠে আয়, বিড়ালসুন্দরী,

বক্র নখ থেকে নে থাবায়, মেলে দে, মোহন চক্ষে, রত্ন আর ধাতুর মঞ্জরি-

ডুবে যাই অদ্ভুত আভায়।

নমনীয় পিঠে, ঘাড়ে, ঘুরে মরে অঙ্গুলি আমার

সোহাগের সুদীর্ঘ মন্থনে,

পুলকে মাতাল হাত গলে যায় তোর তনিমার স্পর্শময় বিদ্যুৎ-কম্পনে—

তখন তাকেই দেখি, অন্ধকার অন্তরতমারে।

তার চোখে, বর্শার ফলকে, তোরই মতো,

ছিন্ন করে হিম, গুঢ়, গম্ভীর অমারে,

আর তার আপাদমস্তক

শ্যামল শরীর ভরে ঝরে পড়ে অঙ্গের নিশ্বাস,

মারাত্মক মদগন্ধ, আর এক কুটিল বাতাস।

Leave a Comment