খাওয়া-দাওয়ার রাজনীতি আর ইয়াং বেঙ্গল

Posted on 9th September, 2026 (GMT 10:15 hrs)

আখর বন্দ্যোপাধ্যায়⤡

দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়

“He who will not reason is a bigot; he who cannot is a fool; and he who dares not is a slave.”

(sexism unintended)

— William Drummond of Logiealmond-এর উক্তি,

ডিরোজিয়ান রামগোপাল ঘোষের প্রিয় লাইন

এবং ডিরোজিও-র “অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন”-এর মূলমন্ত্র

এহি জ্ঞানঃ মনুষ্যাণামজ্ঞানতিমিরং হরঃ।

দাসত্যঞ্চ সংস্থাপ্য শঠতামপি সংহর।।

— ডিরোজিয়ান দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়েরজ্ঞানান্বেষণ পত্রিকার মূলমন্ত্র

যেদিন থেকে আপনি কী খাচ্ছেন, কী পরছেন, কার সঙ্গে মিশছেন অথবা মিশছেন না — এইসব বিষয় নিয়ে “ওরা” (সেই বিষম “অপর” রাষ্ট্রযন্তর) বেজায় নাক গলাতে শুরু করে দেবে, জানবেন সেদিন ফ্যাসিবাদ আপনার ঘরের মধ্যে এসে সেঁধিয়েচে।

নিজের মনে বলি: খাওয়া-দাওয়া এবং পোশাকের রাজনীতির পরিসরগুলো এমনিতেই বেশ ঘাঁটা। এখানে “চয়ন” (choice)-এর একটা প্রশ্ন তো থেকেই যায়। ভাবুন তো দেখি একবার তলিয়ে— চয়ন-করার ব্যাপারখানা (choice-making act) কি সত্যিই “আমার” নিজের, না কি “অন্য” কেউ আমার এই চয়ন নির্ধারিত করে দেয়, অথচ আমরা বেমালুম সেটা দেখেও দেখতে পারি না?

বটেই তো। পোশাক বা খাওয়ারের চয়ন-সিদ্ধান্ত অব্দি পৌঁছনোর পেছনে কাজ করে চলা বহুনির্ধারিত ব্যাপার-স্যাপার বেশ খানিকটা ধোঁয়াটে অবস্থায় চলে-ফিরে বেড়ায় বলে সহজে নজরে আসতে চায় না। তখন “অন্য”-এর চয়নকে নিজের স্বরাট “স্বাভাবিক” সিদ্ধান্ত হিসেবে বোধ হতে শুরু করে। এও শাসন-ত্রাসন কায়েম করবার একটা অংশ বৈকি!

তবু, এই খাওয়ার-দাওয়ারের ব্যাপারটা এখন তো আরো বিশেষ করে বোঝবার দরকার হয়ে পড়েছে।

কেন? গরুর মাংস খাওয়া, মদ্যপান এবং সার্বিকভাবে “আমিষ” খাওয়ারের ক্ষেত্রে হরেক বিধি-নিষেধ আজকাল জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আমাদের থালার ওপর রাষ্ট্রযন্ত্র সরাসরি এসে গেঁড়ে বসেছে।

রান্নার হাঁড়ির ভেতর উঁকি মারছে অযাচিত সঙ্ঘী সেন্সর।

ফ্রিজ খুলে দেখে নেওয়া হচ্ছে ভিতরে কী মাংস আছে — আর সেই মাংসের “গন্ধ-বিচার” করেই ঠিক হয়ে যাচ্ছে কে বাঁচবে, আর কাকে স্রেফ পিটিয়ে মেরে দেওয়া হবে।

এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই কতগুলো মুছে যাওয়া নাম ভেসে ওঠে মনের ভেতরে—

দাদরির মহম্মদ আখলাক (২০১৫),

নাগৌরের আবদুল গফ্ফার কোরেশি (২০১৫),

উধমপুরের জাহিদ আহমদ ভট (২০১৫),

লাটেহারের মজলুম আনসারি ও ইমতিয়াজ খান (২০১৬),

কুরুক্ষেত্রের মুস্তাইন আব্বাস (২০১৬),

আলওয়ারের পেহলু খান (২০১৭),

রামগড়ের আলিমুদ্দিন আনসারি (২০১৭),

আলওয়ারের উমর খান (২০১৭),

আলওয়ারের রকবর খান (২০১৮),

হাপুরের মহম্মদ কাসিম (২০১৮),

ঝাড়খণ্ডের তবরেজ আনসারি (২০১৯),

ভিওয়ানির নসির ও জুনাইদ (২০২৩)

………………….. আরো কতো! কতো! কতো!……………..

তথাকথিত “গোরক্ষা”-র নামে ক্রমাগত চলতে থাকা এই নরমেধযজ্ঞের ধোঁয়া আজ তাই ছেয়ে ফেলেছে গোটা উপমহাদেশের আকাশ-বাতাস। দুর্গন্ধে ঢেকেছে স্বভূমি-উপত্যকা…

এই গো-বলয়ের গোঁ-ধরা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদী অলাতচক্রের অংশ বনে গেছি আমরাও।

গোদি মিডিয়াকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এতশত “ট্রেন্ডিং” খবর পড়তে বসে আমার বারবার মনে পড়ে যায় হেনরি ডিরোজিও এবং তাঁর ইয়াং বেঙ্গলের কথা

ঠিক যেমনটা খেয়াল হয় ভগৎ সিংয়ের কথা… ফুলে, সূর্য সেন, রোকেয়া, পেরিয়ার, আম্বেদকর-দের কথা!

হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯–১৮৩১)।

তবে… কোন পরিচয়ে চিনবো তাঁকে?

ইংরেজ? পর্তুগিজ? ইউরেশিয়? অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান? ভারতীয়? বাঙালি? এন্টালি-মৌলালিতে জন্মানো একজন মানুষ?

এর প্রতিটা-ই হয়তো আংশিকভাবে তিনি। আবার সবকটাকে যোগ দিয়ে হিসেব মিলিয়ে দিলেই যে “তাঁকে” পেয়ে যাওয়া যাবে, এমনটাও নয়।

ধুস! এসমস্ত বাইরে থেকে দেওয়া যা-ইচ্ছে-তাই পরিচয়ের বেড়াজাল পেরিয়ে তিনি একজন প্রবলভাবে আন্তর্জাতিক মানুষ, যিনি রাজনৈতিক ভূগোলের গণ্ডি ছাড়িয়ে “মননে স্বরাজ”-এর কথা ভেবেছেন, কয়েছেন, শিখিয়েছেন। দেখিয়েছেন কীভাবে বাইরে থেকে চাপানো তুচ্ছ আচারের স্বৈরতন্ত্রকে রোখা যেতে পারে।

একাধারে চিন্তক, বক্তা, শিক্ষক এবং কবি হওয়ার দরুন তাঁর কাছে চিন্তার বিপ্লব তথা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। রাজনৈতিক রকমফেরই যথেষ্ট নয় – যেমনটা বলেছিলেন কান্ট, জন স্টুয়ার্ট মিল, পরবর্তীতে মানব রায় – সেই পথেই হেঁটেছিলেন আমাদের ঝড়ের পাখি (stormy petrel) ডিরোজিও।

আমার নিরাশ চিত্ত, খানিকটা শিথিল, খানিক চঞ্চল – মতিস্থির নেই মোটেও।

সেই চিত্তেই এবার উদয় হয় একাধিক ছবি-প্রতিচ্ছবি, ছায়া-প্রচ্ছায়া…

তারা নিরেট নয়, তবু যেন আমি যেন চাইলেই ছুঁতে পারি তাদের!

ওইতো…

হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও একেবারে সীমান্তের ডগায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁর পাশে তাঁরই জনা-১৫ সহযোদ্ধা-ছাত্রের ব্রিগেড হাজির। তাঁরা ভিড় করেছেন একদম কার্নিশ-বরাবর। এগোলেই সাক্ষাত মরণ। মরণের মরণ। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি। আবছা অবয়ব, তবু মাঝে মাঝে দপ করে জ্বলে উঠে নিজেদের পষ্টাপষ্টি হাজির করে ফেলতে চাইছেন…

সেই ছায়াদের দলের সঙ্গী হই এবার।

ইতিহাস-বিস্মৃত, আত্ম-বিস্মৃত জাতিকে খানিক মনে করিয়ে দিই না’হয়।

হিন্দু কলেজের ক্লাসঘরকে তিনি বানিয়ে ফেলেছিলেন প্রতিরোধ-শিল্পের জ্যান্ত ক্ষেত্র।

এতেই বেজায় চটে গেসলেন যতো গোঁড়া, যতো অন্ধ, যতো কু-বিশ্বাসী, যতো খ্যামতাধারী…

তাঁর বয়স তখন মোটে সতেরো-আঠেরো। তবু এই “রুটিনভাঙা” কিশোর শিক্ষক থামতে শেখেননি একদিনের জন্যেও। আপোষ করা তো বহুদূরের ব্যাপার। সব-পক্ষ-ধরে তক্কো চালানোর ক্ষমতার সাহায্যে অনায়াসে বাদ-মূলক পরিপ্রশ্ন করে গেছেন শেষ অব্দি।

তাই তিনি এবং তাঁর ছাত্ররা একত্রে কলকাতার হেজে যাওয়া বাবু-সমাজের বুকের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিলেন একখানা পেল্লায় রোলার। মুক্ত, সমালোচনামূলক, প্রশ্নে ভরপুর রোলার। সংলাপ গুঁড়িয়ে দেওয়া, জীবিকা মুছে দেওয়া বুলডোজার নয়।

বেকন। হিউম। লক। ডুগাল্ড স্টুয়ার্ট। টম পেইন। ভলত্যের। আর… অবশ্যই, ফরাসি বিপ্লব।

আবার তারই সঙ্গে বেতাল পঞ্চবিংশতি। শেক্সপিয়র। বায়রন। তাসো। রবার্ট বার্নস।

মাত্র বাইশ বছর বয়স। ১৮৩১-এর ডিসেম্বর মাস। কলেরায় চলে যাওয়া।

কোনো মানে হয়?

তবু… রেখে গেলেন বিরাট এক অধ্যয়ন-সংস্কৃতির ঐতিহ্য – একটা গোটা আন্দোলন।

নব্যবঙ্গ। Young Bengal

স্ফুলিঙ্গ থেকে অগ্নিশিখা… a single spark that started a prairie fire…

কারা ছিলেন সেই ব্রিগেডে?

নামগুলো বলে নিই।

কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়। রসিককৃষ্ণ মল্লিক। রামগোপাল ঘোষ। রামতনু লাহিড়ী। প্যারীচাঁদ মিত্র। শিবচন্দ্র দেব। রাধানাথ শিকদার। হরচন্দ্র ঘোষ। মাধবচন্দ্র মল্লিক। তারাচাঁদ চক্রবর্তী। মহেশচন্দ্র ঘোষ। গোবিন্দচন্দ্র বসাক। অমৃতলাল মিত্র। উমাচরণ বসু…

একঝাঁক তরুণ তুর্কি। রক্ত টগবগ। যুক্তির গণরাজ্য গড়ে তোলবার জন্য দৃঢ় সংকল্প।

এই ডিরোজিয়ানদের হাতিয়ার— প্রশ্ন, সংশয়… এবং প্ররোচনা। প্রশ্নহীন আনুগত্যের মানেটাই হল সামগ্রিক সত্তার দাসত্ব। ও ব্যাপারটা তাই এনাদের মোটেও পছন্দ ছিল না। ডিরোজিও দেকার্তেকে স্মরণ করে বলে উঠতেন—

De omnibus dubitandum est.

Doubt Everything.

তাই ইতিহাসকে জলজ্যান্ত বয়ান হিসেবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ফিরে “পড়ে” দেখবার সময় এসেছে।

এই পড়বার ব্যাপারটা ঘটবে একটু অন্য ধাঁচে।

সেই ১৯ শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকে এই ইয়াং বেঙ্গল ব্রিগেড যেসব কীর্তিকলাপ করেছিলেন, তার কয়েকটার উল্লেখ করবো। তার মাধ্যমেই পাঠ চলতে থাকবে।

কী করতো জানেন এই ছেলেপিলেগুলো?

ঠাকুরঘরে ধর্মগ্রন্থ না পড়ে হোমার পড়তেন।

ইলিয়াড-ওডিসি থেকে মুখস্থ উদ্ধৃতি ছুঁড়ে দিতেন সন্ধ্যারতি চলাকালীন!

সাহস দেখুন!

দেবদেবীকে প্রণাম করতে বললে হাসি মুখে বলে উঠতেন — “Good morning, Madam!” (সম্ভবত দক্ষিণারঞ্জন ঘটিয়েছিলেন এমন কান্ড!)

তাঁরা মাংস-রুটি খেতেন। লোকজনকে দেখিয়ে দেখিয়ে।

তার মধ্যে কম-খরচে-পুষ্টি-জোগানো গরুর মাংস তো ছিলোই। আর “মুসলমান” দোকানের রুটি-বিস্কুট। (পেটের খিদে কিংবা খাওয়ারের জাত-ধম্মো হয় নাকি?)

শোনা যায়, আশেপাশে কোনো ব্রাহ্মণ-ঠাকুর গোছের কাউকে দেখতে পেলেই তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে ডেকে উঠতেন — আমরা গরু খাই গো!” (যদিচ অ্যানেকডোট, তবে গুরুত্বপূর্ণ)

বাউনতন্ত্রের ধারক-বাহক “পৈতে”-নামক বস্তুটাকে ছিঁড়ে ফেলতে বলতেন তাঁরা-ই।

অক্টোবর ১৮৫১। পুজোর ছুটিতে রামতনু লাহিড়ী গাজিপুর যাচ্ছেন নৌকোয় চেপে, বন্ধু-সহযোদ্ধা রামগোপাল ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে। মাঝির হাতে রান্না খাচ্ছেন—মুসলমানের রান্না। কেউ ঠাট্টা করে বললে: এসব খাবার খাচ্চু, তবু গলায় পৈতে? কপটতা নয় কি? রামতনু তখনই পৈতে খুলে ফেললেন। আর পরেননি— কোনোদিনও।

রসিককৃষ্ণ মল্লিক, ছাত্র থাকতে কলকাতার কোর্টে সাক্ষী হিসেবে গেছেন। হিন্দু সাক্ষীর নিয়ম: তামা + তুলসী + গঙ্গাজল ছুঁয়ে শপথ। তিনি রাজি হননি। বাংলায় যা বললেন, দোভাষীর ইংরেজিতে দাঁড়াল:

“I do not believe in the sacredness of the Ganges.”

গঙ্গাজলের “পবিত্রতা”-কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রসিককৃষ্ণ মল্লিক হয়তো বলতে চেয়েছিলেন— এই জল আর পাঁচটা H₂O-র থেকে আলাদা কীসে?

আরেকটু ফিরে যাই চলুন। আমাদের মূল “ফোকাস” থাকবে যে ঘটনার ওপর, সেই ঘটনায়…

সালটা ১৮৩১। আগস্ট মাস।

জায়গাটা কলকাতার একখানা হিঁদু-পাড়া– গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেন। সেখানে মাতামহ রামজয় বিদ্যাভূষণের বাড়িতে থাকতেন ডিরোজিয়ান কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। কুলীন বাউন ঘর। বাড়ি তাঁর নিজের নয়।

শিবনাথ শাস্ত্রী বলেন যে দিনটা ছিল ২১ তারিখ। রামচন্দ্র ঘোষ, কৃষ্ণমোহনের পরবর্তী সহযোগী, লিখছেন ২৩শে আগস্ট। সেদিন কৃষ্ণমোহন বাড়িতে ছিলেন না। ১৮২৯-এ হিন্দু কলেজ থেকে প্রথম হয়ে বেরিয়ে পটলডাঙ্গা স্কুলে (পরে হেয়ার স্কুল) সহকারী শিক্ষক। সেখানেই কাজ সারছিলেন।

বন্ধুরা এল আলোচনায়—“dissidents from idolatry” (পুতুলপুজো-বিরোধী বিদ্রোহী)। ডিরোজিওর ছেলেরা। শিক্ষক তখন কলেজের কাজে আর নিযুক্ত নেই। ২৫শে এপ্রিল পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে তাঁকে। দোষ? ঠিক যা যা বলা হয়েছিল সক্রাতিসকে, মূলত সেই অভিযোগগুলোই ফিরে-ফিরে বলা হল তাঁকে— যুবসমাজকে বিপথে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া (আদপে প্রশ্ন করতে শেখানো!), প্রচলিত ঈশ্বরের ধারণায় আঘাত হানা (ডিরোজিও নিজেকে অজ্ঞেয়বাদী হিসেবেই দেখতেন), ভাই-বোনের মধ্যে “অ”-“বৈধ” সম্পর্কের প্রচার (আদতে ইতিহাসের আলোচনায় এ প্রসঙ্গ আলোচনা করেছিলেন)… এইসব।

আগুন তবু নেবেনা, নিবেও নেবেনা।

মে মাসেই কৃষ্ণমোহন বের করে ফেলেছেন সাপ্তাহিক পত্রিকা দ্য এনকোয়ারার। ১৫ই মে—ইতিহাসের খাতায় সে তারিখ। অর্বাচীন হিঁদু রীতি-নীতিতে আঘাত দেওয়ার পর্ব সেই তখন থেকেই। এছাড়া ডিরোজিওর “অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন” স্লোগান তুলে বলেছিল— হিঁদুধর্ম নিপাত যাক! তাঁরা আলোচনা চালিয়েছিলেন, প্রতর্ক চলেছিল নানান বিষয় নিয়ে– অধিবিদ্যা, ধর্মতত্ত্ব, শাসনব্যবস্থা… ইত্যাদি।

সেরকমই একটা দিন- ১৮৩১-এর ২৩শে আগস্ট।

সেদিন খাবারটা বাজার থেকে আনানো হয়। মুসলমান বেকারির রুটি আর কসাইয়ের পোড়া গোমাংস। রোস্ট বিফ। দোকান থেকে গোমাংস এনে টেবিলে রাখা হল, সবাই একটু-একটু করে খেল।

খাওয়ার কাজটা লুকিয়ে-লুকিয়ে নয়। দেখিয়ে দেখিয়ে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার: কুসংস্কারকে ধাক্কা দেওয়া, হিঁদু-শাসনের প্রতি অবজ্ঞা, প্রত্যাখ্যানের জবানি।

খাওয়া শেষ। একজন “over-enthusiastic boy” (শাস্ত্রীর ভাষায়) অবশিষ্ট হাড়-মাংস ছুঁড়ে দেয় পাশের উঠোনে। ভৈরবচন্দ্র আর শম্ভুচন্দ্র চক্রবর্তীর বাড়ির উঠোন। বড়জন বাড়িতে ছিলেন না। ছোটজন ক্ষেপে উঠে কৃষ্ণমোহনের বাড়িতে ঢোকেন প্রতিশোধ নিতে। চিৎকার-চেঁচামিচি শুরু হয়।

কীরকম চিৎকার?

“গো-হাড়! গো-হাড়!”
“There is beef! There is beef!”
“This is beef, nothing but beef.”

এই “বিফ”-কেন্দ্রিক নেতীকরণটাই যেন হিঁদুত্বের একটা আস্ত রূপকীয় সঙ্কোচন হয়ে উঠল, তাতে আঘাত এসে লাগল জাত-পাতে, এবং জাত-পাত সংশ্লিষ্ট খাওয়ার-দাওয়ারে।

পাড়া উত্তাল। ছেলেরা পালায়। প্রতিবেশীরা যায় রামজয় বিদ্যাভূষণের কাছে। হুমকি: নাতিকে এখনই বের করো। না হলে জাত যাবে। পরিবার হবে সমাজচ্যুত।

কৃষ্ণমোহন ফিরলেন সোন্ধেবেলা, “usual hour” (শাস্ত্রী)-এ। বিপুল ঝাড় খান। মধ্যরাতের দিকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন; রাস্তায় ক্ষুব্ধ ভিড়। এনকোয়ারার-এ তিনি নিজে লেখেন: “Persecution has burst upon us so vehemently, that on Wednesday last at 12 o’clock we were left without a roof to cover our head.” তারপর দুই বন্ধুর সাহায্যে রাত কাবার করবার একটা আস্তানা জোটে… সম্ভবত সহযোদ্ধা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে। ২৮শে সেপ্টেম্বর বিরোধীরা সে বাড়িও ঘেরাও করে তাঁকে তাড়ায়। মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়।

ডিরোজিওর নিজের যদিও এ ব্যাপারে সমর্থন আদৌ হয়ত ছিলনা।

কেমন যেন আজকের সঙ্গে মিলে-মিশে যায়, তাই না?

নভেম্বরে একটা জ্বালাময়ী নাটক লিখে ফেলেন কৃষ্ণমোহন। নাম: The Persecuted, or Dramatic Scenes Illustrative of the Present State of Hindoo Society, in Calcutta। ছাপে A. Moreiro & Co., East Indian Press, ১৩ লালবাজার। ৩৭ পাতা। দাম: মূল্য দুই টাকা। সমাচার দর্পণ, ৩ ডিসেম্বর ১৮৩১, বই বেরোনোর খবর ছাপায়। মঞ্চস্থ হয়নি। অনেক গবেষক একে কোনো ভারতীয়ের লেখা প্রথম ইংরেজি নাটক বলেন। নাটকের ছেলে বনিলাল—বাড়িতে গোমাংস ও মদ। তাঁর বাবা মহাদেবকে সমাজ প্রবল চাপ দেয়: প্রায়শ্চিত্ত না করালে ছেলেকে তাড়াও। ছেলে মানে না। বাড়ি ছাড়ে। জীবন আর নাটক মিলেমিশে যায়।

১৭ই অক্টোবর, ১৮৩২। ডাফের হাত ধরে ব্যাপ্টাইজড হন কৃষ্ণমোহন (কোথাও তো একটা নোঙর ফেলতে হবে!)। স্ত্রী বিন্দুবাসিনীকে পরিবার আটকে রাখে; প্রায় তিন বছর তিনি যেন বিধবার জীবন কাটান। কলকাতায় হইচই। “ঘর ভাঙানো কৃষ্ট/কিষ্টো”—এই গালি খেতে হয়েছিল তাঁকে!

তবে – এই যে ধম্মো পাল্টানোর ব্যাপারটা, বা সার্বিকভাবে হিঁদু ধর্মের বিরুদ্ধে ডিরোজিয়ানদের এই খাওয়ারের পালটা-রাজনীতি—এ কী শুধুই “বিফ অ্যান্ড ব্র্যান্ডি”-র টানে, যেমনটা তখন ডিরোজিয়ানদের রটানো হত রক্ষণশীলদের তরফে?

শুধুই কি হাড়… না কি আরো কিছু?

হাড়টা তাহলে শুধু হাড় ছিল না। এক বেলার খাবার। একজোট চিৎকার। একখানা উঠোন। তার ফলাফল? বাড়িছাড়া, কাগজ, নাটক, ধর্মান্তর।

এখন প্রশ্নটা এই। এগুলো কি শুধু ছেলেমানুষি? মাথা গরম তরুণের শখ? অপূর্ণ মস্তিষ্কের বালখিল্যতা—infantile disorder?

আজকের “সনাতন হিন্দুত্ব”-এর বাড়াবাড়ির কালে এই কাজগুলোর মানে বুঝতে হবে।

ওই ছোঁড়া হাড়টুকু নিঃসন্দেহেই একটা প্রেক্ষিত-কে দর্শায়। রাজনৈতিক বিবৃতি। শরীর দিয়ে বলে-ওঠা কথা।

খাওয়ার-দাওয়ারের শরীর-গ্রন্থন নিজেই একটা ভাষা, চিহ্নতাত্ত্বিক ব্যবস্থা। সেই ব্যাকরণ দিয়ে সমাজ ঠিক করে দেয় কে ভেতরে থাকতে পারবে, কে বাইরে। কে “শুদ্ধ”, কে “অশুদ্ধ”। কার সঙ্গে এক পঙ্‌ক্তিতে বসা যায়। কার ছোঁয়া লাগলে চান করতে হয়। মঞ্চে “শুদ্ধিকরণ” নামতে হয় (হায় রে!)।

নৃতত্ত্ববিদ মেরি ডগলাস Purity and Danger (১৯৬৬)-এ দেখিয়েছেন—“নোংরা” বলে আলাদা কোনো পদার্থ নেই। নোংরা মানে matter out of place। সাংস্কৃতিক চাউনি-মাফিক “ভুল” জায়গায় পড়ে থাকা বস্তু। জুতো দরজার পাশের র‍্যাকে থাকলে ঠিক। সেই জুতো খাবার টেবিলে উঠলেই “নোংরা”। ঠিক তেমনই—গোমাংস মুসলমানের হেঁশেলে এক কথা। ব্রাহ্মণের উঠোনে সেটাই প্রলয়। ইয়াং বেঙ্গল এই প্রাক-নির্ধারিত ব্যাকরণটাই ভাঙছিল। ইচ্ছে করে বস্তুকে “ভুল জায়গায়” ফেলছিল, যাতে শুদ্ধতার ভড়ংটা খসে পড়ে।

এ যেন অন্য জায়গার জন্ম। স্বপ্নের দেশ নয়। আসল ঘর। আসল দোকান। আসল উঠোন। কিন্তু নিয়মটা ভিন্ন। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া গোঁড়ামির ভেতরেই অন্তর্ঘাত, প্রতিস্পর্ধী স্বর।

কলকাতার মানচিত্র তখন পরিষ্কার। ঠাকুরঘর আলাদা। ব্রাহ্মণের উঠোন আলাদা। মুসলমানের দোকান আলাদা। কে কোথায় খাবে, সেটা অলিখিতভাবে লেখা। ইয়াং বেঙ্গল সেই মানচিত্রে ছেদ বানিয়ে তাতে আঘাত হানে। যে দুটো দুনিয়া পাশাপাশি থাকার কথা নয়, ক্ষণকালের জন্য তারা জুড়ে যায়।

“হেটেরোটোপিয়া” বাইরের দুনিয়াকে একদিক থেকে নকল করে, আরেকদিক থেকে উল্টে-পাল্টে দেখায়। বাইরে রয়েছে শুদ্ধতা-র নির্মাণের চোটে দমবন্ধ শহর। ভেতরে নিষিদ্ধ থালা। বাইরে প্রণাম। ভেতরে “Good morning, Madam!” জায়গাটা ছোট। কাজটা বড়। তাই হাড়-ফেলা একটা স্থানিক বিবৃতি (statement)। “পবিত্র” ঘরের ভেতরে অন্য এক ঘর খুলে-মেলে দেওয়া। মুক্ত-স্বাধীন চিন্তা-ভাবনার ঘরদোর।

সমকালীন খ্যামতাতন্ত্র আদপে তলোয়ার হাতে বসে থাকে না। খ্যামতা গিয়ে সেঁধিয়ে যায় শরীরের ভেতর। BiopowerBiopolitics। রাষ্ট্র-সমাজ-রাজনীতি মিলে ঠিক করে তুমি কী খাবে, কখন খাবে, কার হাতে খাবে। এই হল খাদ্য-শাসন—dietetics। থালার শাসন মানে শরীরের শাসন। শরীরের শাসন মানে সত্তার শাসন। যে জিভকে বশ মানাল, সে মানুষটাকেই মুঠোয় ধরতে পারল।

ইয়াং বেঙ্গল সেই মুঠোটাকেই ছাড়াচ্ছিল। ওনাদের গোমাংস-ভক্ষণ ছিল বায়োপাওয়ারের বিরুদ্ধে শরীর দিয়ে লেখা প্রতিবাদপত্র।

যাঁরা নিজেরাই বাউন—তাঁদের হাতেই জাত-ব্যবস্থা ভাঙছিল সবচেয়ে তীব্রভাবে। কারণ বাইরের মানুষের আমিষ-ভক্ষণকে সমাজ “অশুদ্ধের স্বভাব” বলে উড়িয়ে দিতে পারে; কুলীন ঘরের ছেলের থালায় গোমাংস উঠলে পূর্ব-নির্ধারিত ব্যাকরণটাই ভেঙে যায়। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় কুলীন ব্রাহ্মণ। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ও ব্রাহ্মণ ঘরের। রামতনু লাহিড়ী ব্রাহ্মণ। তারাচাঁদ চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ। তবু তাঁরা তাঁদের এইসমস্ত “অ্যাক্ট”-এর মাধ্যমে জাত-পাতকে দিলেন ভেঙে।

আজকের গোভক্ত যে গপ্পো বেচে—“সনাতন কাল থেকে হিন্দু গরুকে মা বলে পুজো করেছে, গরু কোনোদিন খাওয়া হয়নি”—এটা স্রেফ কুলুজির খোয়াব (genealogical fantasy)।

বাবাসাহেব আম্বেদকর তাঁর বই The Untouchables: Who Were They and Why They Became Untouchables? (১৯৪৮)-এ যুক্তি-পরম্পরা সাজান। “বৈদিক” যুগে গোমাংস স্বাভাবিক ছিল। অতিথি-সৎকারের অঙ্গও ছিল। অতিথিকে বলা হতো গোঘ্ন—যার জন্য গরু কাটা হয়। যজ্ঞে গোমেধ। অশ্বমেধ। আম্বেদকরের প্রশ্ন—গোহত্যা যদি চিরকাল পাপই হতো, তবে অস্পৃশ্যতার জন্ম হলো কীভাবে?

তাঁর নিজের উত্তর ছিল খানিকটা এরকম: ব্রাহ্মণ্যবাদ বৌদ্ধ অহিংসার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামলে গরুকে “মা” বানিয়ে গোমাংস-ভোজীদের একঘরে করা হয়। গরুর পবিত্রতা এখানে রাজনৈতিক অস্ত্র: Constitutive exclusion। সেই বাদ দেওয়ার মাধ্যমে দলিতকে অস্পৃশ্য বানানো হয়। প্রশ্নটা তবু রয়ে যায়: পবিত্র গরু আর অস্পৃশ্য মানুষ কী এক্কেবারে আলাদা গল্প, না একই মন্তর-তন্তর-যন্তরের অংশমাত্র?

ঐতিহাসিক ডি. এন. ঝা The Myth of the Holy Cow (২০০১)-এ বৈদিক-পরবর্তী সূত্র গুছিয়ে সেই গো-আহারের খাদ্য-ইতিহাস দেখান। পুরস্কার? বই নিষেধের হুমকি। আদালতের নোটিস। খুনের হুমকি। হায়দ্রাবাদে প্রতীকী দাহ। সত্যি বলার এই তো “সনাতন” শাস্তি!

আর বিবেকানন্দ? মানে আজকাল যাকে আত্মীকৃত করে হিন্দুত্বের পোস্টার-বয় বানানো হয়… তিনি কী বলেছেন? তিনি সাফ বলেছেন…মাদুরাই স্বাগত-ভাষণে (Complete Works, খণ্ড ৩): এই ভারতেই এককালে গোমাংস না খেলে ব্রাহ্মণ আদৌ ব্রাহ্মণ থাকতেই পারত না। বেদে পড়া যায়—সন্ন্যাসী, রাজা, বড় মানুষ এলে ঘরের সেরা বলদ কাটা হতো।

পাসাডেনায় “Buddhistic India” বক্তৃতায় আরও সোজা-সাপ্টাভাবে বলেন স্বামীজি: পুরনো আচার-অনুষ্ঠান অনুসারে যে হিন্দু গোমাংস খায় না, সে ভালো হিন্দু নয়; কোনো কোনো উপলক্ষে ষাঁড় বলি দিয়ে খেতেই হয়। (Complete Works, খণ্ড ৩।) ইতিহাসের এই বেয়াদপ সত্যি আজকের রাষ্ট্রীয় ফেকু-গপ্পোকে ধ্বস্ত করে ফেলে।

ইয়াং বেঙ্গল সেই কাঁটাটাকেই খুঁচিয়ে ঘা করতে চেয়েছিল। প্রায় একশো পঁচানব্বই বছর আগে। কলকাতার একটা আন্ধা গলিতে হাড় ছুঁড়ে।

সেদিন নিন্দা-বান্দা শুধু কানে-মুখের হুমকিতেই থেমে থাকেনি।

সংবাদ প্রভাকর (ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, ২৮ জানুয়ারি ১৮৩১ থেকে সাপ্তাহিক) আর সমাচার চন্দ্রিকা (ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৮২২; ধর্মসভার কাছাকাছি সুর)—এই দুই রক্ষণশীল কাগজ ডিরোজিও ও তাঁর ছাত্রদের ওপর টানা আক্রমণ চালায়। পোশাক, জুতো, খোলা মাথা, গলায় সুতো পেঁচানো না থাকা—“ফিরিঙ্গির মতো” যত্তোসব অভ্যাস। নাস্তিকতা। বিদ্যার সঙ্গে ধর্মনাশ। হেনরি মেরেডিথ পার্কারের কবিতা Young India: A Bengal Eclogue (১৮৩১) সেই তরুণদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাষা করা হয়। এমত ভাষার সুরটা বড্ড চেনা: পশু। নাস্তিক। বিদেশির নকল। ধম্মো বিপন্ন। ধম্মো ‘খতরে মে হ্যায়’।

এই শব্দভাণ্ডার আজও বদলায়নি। হোয়াটসঅ্যাপ-বাহিনী, গোদি-মিডিয়া, ট্রোল-আর্মি একই বুলি আউড়ায়—“আরবান নকশাল”, “দেশদ্রোহী”, “দিমাগি নকশাল”, “খান মার্কেট গ্যাঙ”, “টুকড়ে-টুকড়ে গ্যাং”, “হিন্দু খতরে মেঁ হ্যায়”, “হিন্দুফোবিয়া”… ইত্যাদি, ইত্যাদি। ১৮৩১ আর ২০২৬। চিত্রনাট্যটা এক-ই রয়ে গেছে। মাধ্যমটা কেবল কাগজ থেকে স্ক্রিনে সরে গেছে।

শুদ্ধতা কখনো নিরেট ধর্ম নয়। শুদ্ধতা একটা সীমানা-আঁকার কাজ। কে খাবে, কে খাবে না—সেই রেখা দিয়ে জাত তৈরি হয়, রাষ্ট্র তৈরি হয়, ভয় তৈরি হয়। ইয়াং বেঙ্গল সেই রেখা মাড়িয়েছিল হাসিমুখে। তাই ওদের হাড় আজও মাটিতে পড়ে না। ওটা প্রশ্ন। প্রশ্ন ঘুরে ঘুরে আসে।

ফের ফিরে দেখা…

বাংলা — এই একটা ভূখণ্ড যার হেঁশেল বরাবরই ছিল একটা মিলনক্ষেত্র। এখানে হিন্দু বাড়িতে ইলিশ, মুসলমান বাড়িতে ইলিশ; এখানে ভেটকি-চিংড়ি-পাঁঠা-মুরগি-হাঁস সবই চলে; এখানে বহু সম্প্রদায়ের মানুষ অবলীলায় গোমাংস (গরীব মানুষের সস্তায় পুষ্টিকর খাওয়ার-দাওয়ার) খায়, বহু মানুষ শুয়োর খায়, আর এই খাওয়া নিয়ে কেউ কোনোদিন কারও থালায় উঁকি মারতে যায়নি। বাঙালির (মোটেও সমসত্ব বর্গ নয়), এবং বিশেষকরে ইয়াং বেঙ্গলের রান্না-খাওয়ার ঘর তাই যেন একটা ছোটখাটো সংশ্লেষণাত্মক, সেক্যুলার গণরাজ্য।

তবু…

“গোমাতা” এখন নির্বাচনী ইস্তেহার। গোরক্ষার নামে গড়ে উঠেছে স্বঘোষিত বাহিনী, যারা হাইওয়েতে ট্রাক থামিয়ে গরু “উদ্ধার” করে আর মানুষকে বেধড়ক পিটিয়ে পিটিয়ে মারে। ফ্রিজে কী মাংস আছে সেটা এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। কে কার সঙ্গে খাচ্ছে, কে কাকে বিয়ে করছে — “লাভ জিহাদ” বা “ল্যান্ড জিহাদ”-এর নামে সেটাও এখন রাষ্ট্রের, তথা বজরং দলের (discharged jailbirds) নজরদারির বিষয়। সঙ্গে জুড়েছে মদ-নিষেধের নীতিপুলিশি, “নিরামিষ” আবাসনের বিজ্ঞাপন, স্কুলের মিড-ডে মিল থেকে ডিম সরানোর তরজা…

আর এই গোটা প্রকল্পটার একটা নিখুঁত ব্যাকরণ আছে, যাকে বলা চলে impunity loop — দায়মুক্তির চক্র। প্রথমে খাদ্যকে “reclassify” করা হয় (গরু আর নিছক গবাদি নয়, “মাতা”)। তারপর ধর্মীয় আবেগ দিয়ে সম্মতি “manufacture” করা হয়। তারপর বিশেষজ্ঞ-বৃত্ত (গোবিজ্ঞান, গোমূত্রের “ঔষধি গুণ”, এই যেমন “বাগেশ্বর কুচকুচে” বলে থাকেন) দিয়ে সেটাকে বৈধতা দেওয়া হয়। দায় চাপানো হয় সবচেয়ে দুর্বলের ঘাড়ে — মুসলমান, দলিত, গরিব, প্রান্তিক মানুষজন। তারপর দ্রুত-বিচার আর রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে দোষীরা ছাড় পেয়ে যায়। খুনি মালা পরে ঘুরে বেড়ায়, লাশের পরিবার আদালত-চত্বরের চক্কর দিতে থাকে– তারিখ পে তারিখ।

এই লুপটাকে ভাঙতে গেলে যা কিছু লাগে, সেটাই ইয়াং বেঙ্গল আমাদের রেখে গেছে — refusal-এর একটা শরীরী ব্যাকরণ। “না” বলার সাহস। প্রকাশ্যে “না” বলার সাহস।

দেরিদা তাঁর Specters of Marx-এ একটা অদ্ভুত শব্দ চালু করেছিলেন — hauntology (hantologie)। ভাব করুন ontology (সত্তাতত্ত্ব) আর haunting (ভূতুড়ে ফিরে-আসা) মিলে গেছে। কিছু জিনিস কোনোদিন পুরোপুরি “থাকে”ও না, আবার পুরোপুরি “মরে”ও যায় না। সেগুলো ফিরে ফিরে আসে — revenant, যে-বারবার-ফেরে। ভূত মানে স্রেফ অতীত নয়; ভূত হলো একটা অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ, একটা না-মেটা দাবি, একটা বকেয়া বিচার। দেরিদা বলেছিলেন — “il faut apprendre à vivre enfin” — শেষমেশ বাঁচতে শিখতে হবে; আর বাঁচতে শেখা মানে ভূতের সঙ্গে বাঁচতে শেখা, learning to live with ghosts

ডিরোজিও ও ডিরোজিয়ানরা হলেন আমাদের এমনই revenant, spectre, ghost।

লক্ষ্য করুন কী অদ্ভুত সমাপতন। ডিরোজিও নিজেই একটা সীমান্ত-সত্তা ছিলেন — না পুরো সাহেব, না পুরো “দেশি”; জ্যান্ত অবস্থাতেই একরকম প্রেতাত্মা, একরকম in-between। মরে গিয়ে তিনি আরও নিখাদ ভূত হয়ে গেলেন। আর ঠিক সেই কারণেই তাঁকে আর মারা যায় না, বহিষ্কারও করা যায় না, রুল ঘুরিয়ে ধরে-বেঁধে রাখা যায় না। কেন জানেন? ভূতেরা কখনো মরে না।

আজও যখন কোনো ছাত্র-ছাত্রী গোরক্ষকের চোখে চোখ রেখে রুখে দাঁড়ায় — ডিরোজিও এবং ডিরোজিয়ানরা ফিরে আসেন। যখন কোনো হেঁশেল জেদের সঙ্গে তার মিশ্র, (অ-)শুদ্ধ, বেয়াদপ, বহুস্বরের চরিত্রটা আঁকড়ে থাকে — নব্যবঙ্গের প্রেতাত্মা Gen-Z তেলাপোকা হয়ে সেই উনুনের ঠিক পাশে এসে বসে।

না। আমরা ডিরোজিওকে ফুল-মালা দিয়ে মূর্তি বানিয়ে ঠাকুরঘরে তুলে রাখতে চাই না — সেটা করলে ওঁকে আরেকবার খুন করা হবে, ওঁকে ওই “পবিত্রতা”-র খাঁচাতেই পোরা হবে যেটার বিরুদ্ধে ওনার ছাত্র-সহযোদ্ধারা হাড় ছুঁড়েছিলেন। আমরা বরং চাই ওঁকে জ্যান্ত ভূত হিসেবে ঘরে ঢুকতে দিতে — প্ররোচক, প্রশ্নবাণে বিদ্ধ-করা এক মেহমান, যিনি এসে টেবিলে বসে বলবেন: “প্রশ্ন করতে শেখো, নিজের মতো ভাবতে শেখো।”

লেখাটা যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেখানেই ফিরা যাক। ডিরোজিওর অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনের নীতিবাক্য:

“He who will not reason is a bigot; he who cannot is a fool; and he who dares not is a slave.”

আজকের খাওয়ারের ফ্যাসিবাদ আমাদের ঠিক এই তিন নম্বর দলের দিকে ঠেলে দিতে চায় — ভয়ে-চুপ-করে-থাকা ক্রীতদাসের দলে। ফ্রিজ খুলতে ভয়, রান্না করতে ভয়, রান্নার গন্ধে ভয়, প্রশ্ন করতে ভয়, রেস্তোরাঁতে খাওয়ার পরিবেষণে ভয়। খাওয়ারের এই রাজনীতি আসলে ভয়ের রাজনীতি — জিভকে বশে এনে গোটা মানুষ-সত্তাটাকে বশ মানানোর প্রকল্প।

ইয়াং বেঙ্গল আমাদের শিখিয়েছিল— প্রকাশ্যে, হাসিমুখে, নির্লজ্জভাবে বেয়াদপ হওয়ার পাঠক্রম। থালাকে রাজনৈতিক করে তোলা, তবে উল্টো দিক থেকে — শাসনের হাতিয়ার হিসেবে নয়, স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে।

দুশো বছর আগে একদল বাইশ-চব্বিশ বছরের ছোঁড়া বউবাজারের গলিতে গরুর হাড় ছুঁড়ে সেই কথাটাই বলেছিল। হাড়টা এখনও হাওয়ায় ঝুলে আছে। মাধ্যাকর্ষণ ওটাকে মাটিতে ফেলতে পারেনি — কারণ ওটা হাড় নয়, ওটা একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

আর… প্রশ্নের দল কেবলই ফিরে ফিরে আসে।

ভূতে মারে ঠেলা: মৃতদিগের বৌদ্ধিক মজলিশ

১.

মৌলালির বাড়িতে রাত্তিরবেলা বোমা-গুলির আওয়াজ শুনে ঘুম ভাঙলো হেনরির। তিনি শুনতে পেলেন একদিকে “জয় শ্রী রাম” আর আরেকদিকে “আল্লা হো আকবর”-এর নাড়া। রামতনু লাহিড়ী আর রামগোপাল ঘোষ কাছেই ছিলেন। হেনরি তাঁদের জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের নাম নিয়ে এরা কী বলছে?” প্রত্যুত্তরে দুই “রাম”-ই এক কথা বললেনঃ “আমাদের নামে নয়। বউকে দু-দুবার জ্বলন্ত আগুনে ফেলে দেওয়া রামের কথা এরা বলছে।”

হেনরি চকিতে উঠে দাঁড়ালেন। বললেনঃ “চলো বেরিয়ে পড়ি। এই দাঙ্গাকে থামাতেই হবে।” মা আর বোন হেনরিকে আটকাতে পারলেন না। সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।

ভাগ্যিস এনারা “ভূত”! দাঙ্গাবাজেরা এঁদের দেখতে পাচ্ছেন না, তাই অনায়াসে তাঁরা চললেন বউবাজারের দিকে। সেখানে কালীমন্দিরের সামনে একটা গরুকে কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। আরো খবর পাওয়া গেলো যে নাখোদা মসজিদের সামনে শুয়োর কেটে ফেলে রেখে গেছে কেউ।

হেনরি অবশ্য জানেন, দাঙ্গা হয় না, বানানো হয়। দাঙ্গা বাঁধাতে গেলেও খরচা আছে। কে এই খরচা দিচ্ছে? কে বা কারা সেই Event Managers? এমত সময়েই তাঁর ভীষ্ম সাহানির “তমস”-এর কথা মনে এলো।

কৃষ্ণমোহন বললেনঃ “চলো, আমরা শুয়োর আর গরুর মাংস খেয়ে সেসবের হাড়মাসের টুকরো হিন্দু আর মুসলমানদের বাড়িতে বাড়িতে ফেলে দিয়ে আসি।”

জবাবে হেনরি বললেনঃ “হঠকারিতা কোরো না। ওগুলো আমাদেরই সরাতে হবে।”

গোপাল পাঁঠার দল তখন নতুন বাজার থেকে তুলে এনেছে খাঁড়া, ত্রিশূল, তলোয়ার। সেগুলো মজুত করে রাখা হয়েছে “বাঙালি পাঁঠার দোকান”-এ। ইয়াং বেঙ্গলের ছেলেপুলেরা হাড়কাটা গলির পাশের কালীবাড়ির সামনে পড়ে থাকা কাটা গরুকে পৌঁছে দিলেন ভবানী দত্ত লেনের এক গোমাংস বিক্রয়কারীর দোকানে। ও, হ্যাঁ, দখিনা কিন্ত সব কালী প্রতিমাকেই “Good morning madam” বলতে ভোলেন নি।

ফ্যাৎ ফ্যাৎ ফ্যাতারুর মতো তাঁরা পৌঁছে গেলেন নাখোদা মসজিদে। দ্রুত গতিতে মৃত শুয়োরের বাচ্চা পৌঁছে গেলো হগ সাহেবের বাজারের শুয়োরের দোকানে। এবার তাঁরা বাঁক নিলেন প্রেসিডেন্সি য়্যুনিভার্সিটির দিকে। সামনেই পড়লো সংঘ পরিবারের দফতর। এই ভূতেরাই ভাগোয়া পতাকাগুলোতে দিলেন আগুন ধরিয়ে। তারপর হেনরি বলে উঠলেনঃ “তোমাদের নামগুলোতে রাম আর কেষ্ট, আর তোমাদের নাম নিয়ে এরকম হুজ্জতি করছে?”

হিন্দু কালেজের সামনে গিয়ে তাঁরা দেখলেন এবিভিপির পোস্টার ছিঁড়ছে একদল ছেলে মেয়ে। হেনরি হাঁক পাড়তেই আরো অনেক ছাত্র-ছাত্রী এগিয়ে এলো তাঁর পাশে। তারা কিন্তু, সমমানস-নির্মাণে দেখতে পাচ্ছে হেনরি এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের। হেনরি হাঁক পাড়লেনঃ “চলো পটলডাঙার হাসপাতালে।” ওখানে ফেল-ফেল্টু-ফেলু টেনিদা এবং বাকি তিন মূর্তি অপেক্ষা করছে। কেননা মুখ্যমন্ত্রীর শুট-অ্যাট-সাইট নির্দেশে আনতাবড়ি গোলাগুলি চলছে। প্রচুর জ্যান্তে মড়া লোকজন ঢুকছে পটলডাঙার হাসপাতালে। ওদিকে পটলডাঙার ইস্কুলের মাঠে গুয়ের গন্ধ তীব্রতর হচ্ছে।

টেনিদা হেনরিকে দেখা মাত্রই চেঁচিয়ে বললোঃ “হেনরি! আমাদের এখন রক্ত দিতে হবে! মানুষকে বাঁচাতে হবে!” পটলডাঙা ইস্কুলে অধিবিদ্যা-বিষয়ক বক্তিমে দেওয়ার সময় হেনরির বক্তব্য যারা শুনেছিলেন, সেই ১৫০+ মানুষ রক্ত দেওয়ার জন্য তখন প্রস্তুত।

২.

এবার সোন্ধে হয়ে এসেছে। য়্যুনিভার্সিটি ইন্সটিটিউটে অভিনীত হচ্ছে ‘সধবার একাদশী’ নাটক। ডেকাডেন্ট (“মেকলের বিষবৃক্ষের ফল” – সমর সেন) আঁতেল এবং মোদো মাতাল নিমে দত্তের সংলাপে শোনা যাচ্ছে হাহাকার ধ্বনি। খেয়াল হয় যে এখনকার আঁতেলরা কেউ আর KT (খালাসি-টোলা)-তে ম্যাকলে, থুড়ি মাকালীর আগমার্কা “আমার সোনার বাংলা” পান করতে যান না। তাঁরা এখন মালের সাগর পাড়ি দিয়ে গ্লোবট্রটারস!

ওদিকে কাপ্তেনবাবু সেদিন মদ খেয়ে এস্টেজে উঠেছিলেন। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গিয়ে বললেনঃ

“উঠোনে নাচবার বায়না নিয়েছে… ওই বড়োলোকের দল মুজরো দিয়ে নিয়ে গেছে ব্রাত্যযুগের উঠোনে নাচবার জন্যে… নিমচাঁদ নিমচাঁদ, কোথায় নেমেছো? Canst thou not minister to a mind diseased, Pluck from the memory a rooted sorrow!”

হেনরির পাশেই বসে ছিলো ইয়ং এক বাঙালিঃ প্রিয়নাথ। সে এস্টেজের দিকে ছুটে যায়। চিৎকার করে বলে ওঠেঃ “তিতুমীর! তিতুমীর! ওস্তাদ তিতুমীর বাজাও!”

অবক্ষয়ী মোদো মাতাল নিমে দত্ত ততক্ষণে হয়ে উঠেছেন তিতুমীর। বেরিয়ে পড়ে টিনের তরবারী। তিতুমীর আঙুল তুলে দৃপ্ত ভঙ্গিতে বলেঃ “সাহেব! তোমরা আমাদের দেশে এলে কেনে? আমরা তো তোমাদের কোনো ক্ষেতি করি নি? আমরা তো ছিলাম ভায়ে-বোনে গলাগলি কর‍্যে, হিন্দু-মুসলমানে প্রীতির বাহু বেঁধে, বাংলা মায়ের শ্যামল অঞ্চলে মুখ ঢেকে। হাজার হাজার ক্রোশ দূরে এদেশে এসে কেনে ওই বুট জোড়ায় মাড়গে দিলে মোদের স্বাধীনতা?”

হেনরি বোঝে, প্রিয়নাথেরা এখনো বেঁচে আছে। তাঁর পাশেও আছে, এস্টেজেও আছে।

বটুকদা এসবের মধ্যেই চিৎকার করে বলে ওঠেনঃ

“তাই নিরঙ্কুশ, পবিত্র, নির্মমন অস্তিত্বের পৌরাণিক সুরে,

বাইরেকে ভুলি, ঘরকে ডাকি

একটা বিশুদ্ধ বিশ্রম্ভালাপের ডিকাডেন্ট সুরেঃ

শোনো,

তুমি কোনো,

বরযাত্রার মিছিলে কখনো

বাঁশী-পতাকায় আলোতে মাখানো

নবযাত্রার মিছিলে দেখেছ রূঢ় বিধাতার হাসি!”

একটু থেমে আবার বলে চলেনঃ

“শ্লোগানমুখী মন শানানো সঙীনের মতো ঝলক দিয়ে ওঠে,

ফ্যাসিস্ট – বিরোধী সঙ্ঘে যোগ দেয়,

মুখে মুখে ফোটে বিদ্রোহের দস্তর হাসি,

আর, বুকে সামাজিক যক্ষার কাশি।”

নাটক শেষ হয়। হেনরি এগিয়ে চলেন তাঁর কালেজের দিকে। এই কালেজে তাঁকে আর ক্লাস নিতে দেওয়া হয় না–তিনি বিতাড়িত, বাতিল। তাই সেই কালেজের উঠোনে এক সারমেয়র পাশে বসে পড়লেন। জান মহম্মদের দোকানের চা খেতে খেতে তিনি ফের পড়ানো শুরু করলেন। মেঝেতে চক দিয়ে লিখলেনঃ

“Doubt Everything”

কেশরী রঙের আধিপত্যে, অঘোষিত জরুরি অবস্থায় কী করিতে হইবে ভাবিয়া পাইতেছিলুম না। যৎপরোনাস্তি ব্যাকুল হইয়া আমি আর আমার ছেলে মিলিয়া ঠিক করিলুম কয়েকজন politically correct ব্যক্তির সহিত কথা কহিব। আমাদেরই নিতান্ত অপারঙ্গতায়ায় আশপাশে জ্যান্ত কাহাকেও খুঁজিয়া পাইলুম না। সবাই যেন নিজেরাই নিজেদের টুটি ধরিয়া আপন ঘরে সেঁধিয়া গিয়াছে। খুবই claustrophobic পর্যাবরণ।

“হাঁচ্ছোঃ ! –ভয় কী দেখাচ্ছ।

ধরি টিপে টুঁটি, মুখে মারি মুঠি–

বলো দেখি কী আরাম পাচ্ছ।

হাঁচ্ছো। হাঁচ্ছো।”

অতএব ঠিক করিলুম কয়েকজন ভূতের সহিত সংলাপী আর্ষজ্ঞান যাচিয়া লহিব। সেই সকলকে আপ্ত মানিয়া প্রতিরোধের বয়ান তয়ের করিব। প্রাজ্ঞ ভূতদিগের লিস্টি বানাইয়া লইলুম।

অতএব, আমার Gen Z সন্তান সমবিভ্যাহারে মরণ মাড়কলীলার মাইল মাইল অশান্তিকল্যানের ভিতরে থাকিয়া গোরস্তান আর শ্মশানের দিকে পাড়ি দিলুম।

অতএব, “অনুপ্রেরিত” হওয়ার তাগিদে কালীঘাটে না গিয়ে স্রেফ পৌঁছে গেলুম South Park Street Cemetery-তে ডিরোজিওর কবরের সামনে। ডিরোজিও বললেন, “চলো, আরেকটু হেঁটে দত্ত সাহেবের সঙ্গে কথা কয়ে আসি। আমাদের মজলিস তৈরি করতে হবে। আমরা একা নই–এই কথাটা জানান দেওয়া জরুরি। “

দ্রজু সাহেব মৌলালির বাসায় একটু সময় কাটালেন। তারপর খানিক্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম শ্রীমধুসূদনের সমাধিস্থলে, অর্থাৎ, lower circular road cemetery-তে। এই সেই শ্রীমধুসূদন, যিনি বলেছিলেন, “I despise Ram and his rabble”। ভীতু লক্ষ্মণের হাতে নিহত মেঘনাদের মধ্যে দিয়েই তৈরি হয়ে উঠেছিলো এক রাম-বিরোধী স্বর। আর আজ?

সে সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা পেয়ে পেলুম শ্রীমধুসূদনকে। আমার মধ্যে আপনা থেকেই বেরিয়ে এলো এক অ-কাব্য– অ-মিত্র-অক্ষরে লেখা নয়, এমনকি গৈরিশ ছন্দেও লেখা নয়, বরং সুকুমারি প্রভাবে তয়ের হয়ে উঠলো আনতাবড়ি “দৈবিক” ছন্দে [দেব(প্রসাদ)+ষ্ণিক্] লিখে ফেল্লুম নিচের এই বয়ান। উৎপলীয় ভঙ্গিতে আবৃত্তি করে ফেললুম।

“হে শ্রীমধুসূদন.

সম্মুখসমরে পড়ি তব রোষানলে বজরংদল,

“জয় শ্রীরাম”‘ হুলাহুলি ভুলি

করে পশ্চাৎ পলায়ন,

গড়াগড়ি খায় পাঁকে জন্মানো পদ্ম(ইয়ে Loot-us)গুলি মদকলমত্ত করী সম বজরঙ

মুষিক বনিয়া নাককান মুলি

গোমূত্র-সুরা ককটেল পানিয়া ছড়াইতেছে মল।

মেস হয়ে গেলো মেসির ফুটবল।

না ছুটিলো খবর ঘাসে ঘাসে

তারা বরাদ্দ তোলা পায় যে মাসে মাসে।”

সেদিন, তখন মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল নীলসাদা জার্সি পরা মেসির হেলিকপ্টার।

গণ হিস্টিরিয়ায় মেতে মেসির দর্শনপ্রার্থীদের মগজে ধরেছিলো প্যারালিসিস।

সন্তান কইলো, “চলো এবার আমহার্স্ট স্ট্রিট, মানে এখন যার নাম রাজা রামমোহন রায় সরণী। রাজার বাড়ি পৌঁছে যাই। এদের ছাড়া তুমি মোকাবিলা করতে পারবে না আজকের দ্বিজাতিক হিংস্রতা, মৌলবাদ ইত্যাদির।”

আমি সন্তানে বললুম, ‘হ্যাঁরে, তুই তো ক’দিন আগে ব্রিস্টলে রামমোহনের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলি “গুরু, তুমি ছিলে বলেই আমরা আছি।” নজরুলের অনুসরণে কইলুম, “চল পানসি বেলঘরিয়া!’

আমরা রামমোহনের বাড়ি পৌঁছলাম। বিশালদেহী রামমোহন আমাদের ডেকে বললেন: ‘এসব কী হচ্ছে! এরা না জানে শাস্তর, না জানে যুক্তি।’

আমার সন্তান কিছুদিন আগে কার্ল মার্ক্সের সমাধিও ঘুরে এসেছে। এমনকি পুরোনো মার্ক্সের কবরটাও ঢুঁড়ে বের করেছিলো। এনাদের মতো ভূতের অস্তিতা না থাকলে আজকের দিনের নানান ধম্মের ভেকধরা বাজারি মৌলবাদকে ঠেকানো যাবেনা। এঁদের ভূতগুলো আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

আমরা হাঁটা লাগালুম। গন্তব্য কাছেই: ৩৬, বৃন্দাবন মল্লিক লেন। এই রাস্তার এখনকার নাম বিদ্যাসাগর স্ট্রিট। কশুরে যই বাড়ির ভেতর থেকে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এলেন। তিনি সবকথা শুনে বললেন, ‘রাজা, মধু, দ্রজু…আমরা এবার বরং নিমতলা ঘাটের দিকে পা বাড়াই। এখানে থেকে কাজ নেই। সেখানেই আমাদের সংলাপ জম্পেশ হবে।’

এবার আমরা হাঁটতে থাকলুম শ্মশানের দিকে। সেখানে দেখি এক আলখাল্লা পরা দাড়িওলা বুড়ো যেন আমাদের অপেক্ষাতেই ঘাটে বসে আছেন আনমনা। তাঁর পিঠ বেঁকে গেলেও শিরদাঁড়া সোজা। তিনি এবার ধীর, স্থির, শান্তভাবে আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘চলো ঘাটেই বসা যাক। কেননা, যেতেছে বহিয়া দু:সময়। পৃথ্বী মরে গেছে কমার্শিয়াল ম্যানেদের দাপটে। আমার মতো না-নেশনের বাসিন্দে অসীমে দিয়েছে পাড়ি। আমি যে কোনো নেশাতেই বিশ্বাস করিনে।’

আমার সন্তান গেয়ে উঠলো লেননের “ইম্যাজিন”।

ডুবে গেলো দেশ-কাল।

আমরা গিয়ে বসলুম ভূতনাথ মন্দিরের পাশের কংক্রিট নির্মিত ঢালে। সেখানে জোরালো বহস চললো ধর্মমূঢ়দের নিয়ে।

আমাদের হারা-জেতাহীন সংলাপ শুরু হলো। সংলাপের ভার্বাটিম এখুনি জানাচ্ছিনা। ক্রমশ প্রকাশ্য।

এমন সংলাপের মাঝখানে বাধা দিলো নবদ্বীপ হালদারের কণ্ঠস্বর। শোনা গেলো: ‘বাবু, গাঁজা লাগবে নাকি গাঁজা?’

আমার ছেলে বলে উঠলো, ‘হাইগেটের গোরস্থানে আমার সামনে এসেছিলেন কার্ল। বলেছিলেন, ‘মত্ত হয়োনা জনতার আফিমে।’

কৃতজ্ঞতা: শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায়

সূত্রনির্দেশ

১. ডিরোজিও, হেনরি. (২০০১). The Complete Works of Henry Louis Vivian Derozio. সম্পাদনা: আবিরলাল মুখোপাধ্যায়, অমর দত্ত, অধীর কুমার ও শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায়. প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স (ডিরোজিও স্মরণ কমিটির সহযোগিতায়).

২. ডিরোজিও, হেনরি. (২০২২). জঙ্গীরা পাহাড়ের ফকির: একটি গাথাকাব্য. অনুবাদ: শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায়. অক্ষরবৃত্ত প্রকাশন.

৩. ঘোষ, বিনয়. (১৯৮০). বিদ্রোহী ডিরোজিও. অয়ন.

৪. মৈত্র, সুরেশচন্দ্র. (১৯৫৮). অশান্ত কাল জিজ্ঞাসু যুবক. পুঁথিপত্র.

৫. মুখোপাধ্যায়, শক্তিসাধন. (২০২২). ডিরোজিও: রুটিনভাঙা এক মাস্টার. পুনশ্চ.

৬. মুখোপাধ্যায়, শক্তিসাধন. (২০২৩) রেনেসাঁসের আলোকে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও. ভিরাসত.

৬. রায়চৌধুরী, সুবীর. (১৯৯৩). হেনরি ডিরোজিও: তাঁর জীবন ও সময়. ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট.

৭. সেনগুপ্ত, পল্লব. (১৯৭৯). ঝড়ের পাখি: কবি ডিরোজিও. পুস্তক বিপণি.

৮. বাগল, যোগেশচন্দ্র. (১৯৪১). ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা. কলকাতা: রঞ্জন পাবলিশিং হাউস.

৯. শাস্ত্রী, শিবনাথ. (১৯০৩). রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ. কলকাতা. (নিউ এজ, ২য় সংস্করণ, ১৯৫৭). ইংরেজি তর্জমা: Ramtanu Lahiri, Brahman and Reformer: A History of the Renaissance in Bengal.

আরো দেখুন:

পত্র-আঘাত: এক স্ব-ঘোষিত সনাতনীর তরফে

প্রাপক: আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, গোরক্ষা মহাসভা, দুর্গাবাহিনী ও ভাজপা সমীপেষু।

বিষয়: সমস্ত হিন্দু-দেবস্থানে আমিষ-নৈবেদ্য, পশুবলি, মৎস্য ও মদিরা-উৎসর্গ চিরতরে নিষিদ্ধ করিয়া এক “অভিন্ন সাত্ত্বিক-নিরামিষ সনাতন খাদ্যবিধি” প্রবর্তনের সবিনয় যাঞ্চা।

সবিনয়নিবেদনমিদং,

আমরা, নিম্নস্বাক্ষরকারিগণ, সমরূপীকৃত (homogenized), পাস্তুরিত, প্রমিতকৃত সনাতন-ব্র্যান্ডের বিশুদ্ধ নিরামিষভোজী (ভেগান) ভক্তবৃন্দ — যাঁহারা প্যাকেটজাত পবিত্র গোদুগ্ধের ন্যায় এক অভিন্ন, সমসত্ত্ব ও দোষমুক্ত হিন্দুধর্ম কামনা করি — নিম্নলিখিত কারণে বঙ্গপ্রদেশে ও অন্যত্র সর্বপ্রকার আমিষ-উপাচার নিষিদ্ধ করিবার যাঞ্চা জানাইতেছি।

মন্দিরের গর্ভগৃহে জীবন্ত আমিষভোজী দেব-দেবীর দর্শনমাত্রেই আমাদিগের রসনা কম্পিত হয়, আমিষ প্রসাদের আঁশটে গন্ধে বমনোদ্রেক ঘটে। তথাপি বিধিবাম — যতই শাস্ত্র অনুধাবন করি, ততই দেখি সমগ্র “সনাতন” পরম্পরাটিই রক্ত, মাংস, মৎস্য ও মদিরায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। নিবেদন করি:

১। বেদেই আমিষ, বেদেই গোহত্যা — “গোঘ্ন” অর্থাৎ অতিথি

স্বয়ং পাণিনি অষ্টাধ্যায়ীতে (৩.৪.৭৩, “দাশগোঘ্নৌ সম্প্রদানে”) “গোঘ্ন” পদটি নিষ্পন্ন করিয়াছেন, যাহার আভিধানিক অর্থ — ‘যে অতিথির নিমিত্ত গোহত্যা করা হয়’। কাশিকাবৃত্তি ইহাকে সরাসরি “অতিথি” বলিয়া গ্লস করিয়াছে। অর্থাৎ, সনাতন গৃহে অতিথিসৎকারের প্রকৃষ্ট উপাচারই ছিল গোমাংস! মধুপর্কে সম্মানিত অভ্যাগত, আচার্য, স্নাতক, রাজা ও বরকে গো-নিধন করিয়া মাংস পরিবেশনের বিধান গৃহ্যসূত্রসমূহে বিধৃত। শতপথ ব্রাহ্মণে (৩.১.২.২১) মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য সদর্পে ঘোষণা করেন — গোমাংস “কোমল (অংসল)” হইলে তিনি অবশ্যই তাহা ভক্ষণ করিবেন! এমত অকাট্য শাস্ত্রপ্রমাণে আমরা লজ্জিত, কুণ্ঠিত ও ম্রিয়মাণ।

[যে অর্বাচীন ইতিহাসবিদ এই গোমাংসের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন — যথা রামশরণ শর্মা কি দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ ঝা (The Myth of the Holy Cow) — তাঁহাকে আমরা ‘আরবান নকশাল’, “দিমাগি নকশাল” তথা ‘সেকু-মাকু’ আখ্যায় ভূষিত করিয়া তাঁহার জাতীয়তাবিরোধী পাণ্ডিত্যের তীব্র নিন্দা জানাই। এইরূপ দেশদ্রোহীদের মুণ্ডচ্ছদন করা হৌক।গভ]

২। যজ্ঞের সোম, অশ্বমেধ ও গোমেধ

বৈদিক যজ্ঞের প্রাণভোমরা সোমরস — নিরঙ্কুশ এক নেশাদ্রব্য (Wasson প্রমুখ যাহাকে ছত্রাকজাত মাদক অনুমান করিয়াছেন)। অশ্বমেধ, গোমেধ, এমনকি নরমেধের সংকল্প পর্যন্ত ব্রাহ্মণসাহিত্যে উল্লিখিত। যে যজ্ঞকে আমরা “সনাতন”-এর মেরুদণ্ড বলিয়া গর্ব করি, তাহাই কিনা মদিরা ও পশুরক্তে অভিষিক্ত! হায়, কোন্‌ মুখে ইহাকে নিরামিষ কহিব?

৩। স্মৃতি ও আয়ুর্বেদের সাক্ষ্য

মনু স্বয়ং (মনুস্মৃতি, পঞ্চম অধ্যায়) মধুপর্ক, শ্রাদ্ধ ও যজ্ঞে মাংসভক্ষণে কোনো দোষ দেখেন নাই। চরক ও সুশ্রুত দুর্বল, ক্ষীণ ও আরোগ্যকামী রোগীকে “মাংসরস” পথ্যরূপে ব্যবস্থাপত্র দিয়াছেন। অতএব, আমাদিগের পরমপূজ্য ঋষি-বৈদ্যকুলও নিঃসংশয় আমিষপন্থী।

৪। শাক্ত পঞ্চ-ম-কার — মদ্য-মাংস-মৎস্য-মুদ্রা-মৈথুন

এইখানে আমাদিগের গাত্রদাহ পরাকাষ্ঠায় পৌঁছায়। বঙ্গ-আসাম-মিথিলার শাক্ত-তান্ত্রিক কৌলাচারে দেবীর আরাধনাই অসম্পূর্ণ — পঞ্চতত্ত্ব (মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন) ব্যতিরেকে। প্রমাণ:

  • কালীঘাটে “নিরামিষ মাংস” — কী বিরাট বিরোধাভাস (oxymoron)! পেঁয়াজ-রসুন-বর্জিত বলির মাংসকে ‘নিরামিষ’ আখ্যা — এ যেন শুষ্ক জলে অবগাহন, বন্ধ্যাপুত্রের বিবাহ।
  • তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যায় মা তারাকে প্রসাদী কাতলা-রুই নিবেদিত হয়; সেই আঁশটে সৌরভে আমরা মূর্ছাপ্রায়।
  • কামাখ্যায় মহিষ-হাঁস-ছাগ বলি; আসামের সিংহভাগ (আনুমানিক ৮০%) অধিবাসীই আমিষাশী।

এই মেছো-শাক্ত অপধর্ম অবিলম্বে নিষিদ্ধ হউক।

[প্রসঙ্গত — গরু ও মহিষ উভয়েই তো Bovinae উপপরিবারের একই Bos taurus গণভুক্ত খুরওয়ালা গবাদি; তবে “গোহত্যা” মহাপাপ আর “মহিষবলি” পুণ্যকর্ম হয় কোন্‌ শাস্ত্রযুক্তিতে? এই সূক্ষ্ম ভেদজ্ঞান আমাদিগের অল্পবুদ্ধিতে কুলায় না।]

৫। বৈষ্ণবও নিরাপদ নহে — বৈকুণ্ঠেও কাঁটা

আমরা ভাবিয়াছিলাম, প্রসাদের বৈষ্ণবীকরণেই বুঝি পরিত্রাণ। কিন্তু হায়! বঙ্গ-আসাম-মণিপুরের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বৈষ্ণবগণ মৎস্য এমনকি মাংসও আহার করেন; বঙ্গের এক বৈষ্ণব-প্রাঙ্গণে রীতিমতো মৎস্যমেলা বসে; পুরীর জগন্নাথধামে অধিষ্ঠাত্রী বিমলাদেবীকে অন্তরালে মৎস্য ও বলি নিবেদিত হয়। যে বৈকুণ্ঠকে শেষ আশ্রয় ভাবিয়াছিলাম, তথায়ও মৎস্যকণ্টক!

৬। ভৈরবের সুরা

উজ্জয়িনীর কালভৈরবকে খোদ সুরা (দেশি মদ) উপাচারে নিবেদিত হয় — মন্দিরদ্বারে সুরার বোতল বিকাইবার দোকান পর্যন্ত সজ্জিত। দুগ্ধ-ঘৃত ও মদিরার এই অসমঞ্জস সংস্থাপনগত (syntagmatic) সহাবস্থান নিরীক্ষণে আমাদিগের মস্তক ঘূর্ণিত।

৭। স্বয়ং ব্রাহ্মণ্যেই আমিষ — “সাত্ত্বিক” আসলে বেনে-বামুনের আঞ্চলিক শ্রেণীভোজন

শীর্ষ বর্ণও যে আঞ্চলিকভাবে ঘোরতর আমিষাশী, ইহা অনস্বীকার্য: কাশ্মীরী পণ্ডিত রোগন-জোশ ব্যতীত অচল; সারস্বত, মৈথিল ও বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ মৎস্য ব্যতিরেকে শ্রাদ্ধ-বিবাহ কল্পনাও করিতে পারেন না (“মাছে-ভাতে বাঙালি”)। তবে “সাত্ত্বিক নিরামিষ” আদতে কী? উহা এক গুজরাটি-মারোয়াড়ি বেনে ও উত্তরভারতীয় একশ্রেণীর বামুনের আঞ্চলিক পাকপ্রণালীমাত্র, যাহাকে সমগ্র “সনাতন”-এর গ্রীবায় চাপাইয়া দেওয়া হইতেছে। ভারতীয় হিন্দু-জনসংখ্যার সিংহভাগ (আনুমানিক ৮০ শতাংশ) যখন আমিষভোজী, তখন এই নিরামিষ-বিধি প্রকৃতপক্ষে বহুজন-বর্জনের এক পরিপাটি সংস্কৃত-আবরণ। ভোটব্যাঙ্ক তাহা হইলে সমৃদ্ধ হইবে কী প্রকারে, প্রভু?

৮। খোদ সংঘেরই রন্ধনশালায় স্ববিরোধ

আমাদিগের পরমপ্রিয় নিরামিষ-বাহিনী আরএসএস-এর কতিপয় সরসংঘচালক নাকি একদা মুরগি-মটনে রসনাতৃপ্তি করিতেন; প্রায় তিন সহস্র স্বয়ংসেবক গোমাংসভোজী, ও সংঘ তাহাতে আপত্তি করে না — খোদ বরিষ্ঠ নেতা মনমোহন বৈদ্য কহিয়াছেন, গোমাংসভোজীও নির্দ্বিধায় স্বয়ংসেবক হইতে পারেন।

[এদিকে “গোমাতা” রক্ষার জিগির তুলিয়া রাত্রিকালে যাঁহারা লিঞ্চিং করেন, দিবালোকে সেই রাষ্ট্রই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মহিষমাংস (carabeef) রপ্তানিকারক; সনাতনী ভাণ্ডার ভরে কর্পোরেট ‘রস’-এ, যাহাকে মাকুরা কহে crony capitalism। হিপোক্রেসি কি ভি সীমা হোতি হ্যায়!]

সারণী — “ঘোষিত নিরামিষ” বনাম “নিবেদিত আমিষ”

দেবস্থান / আচারঅধিষ্ঠাতাযাহা “সনাতনী” ঘোষিত/প্রত্যাশিতবাস্তবে নিবেদিত/গৃহীতসম্প্রদায়
কালীঘাট (কলকাতা)মা কালী“নিরামিষ” প্রসাদপেঁয়াজ-রসুন-বর্জিত বলির মাংস (“নিরামিষ মাংস”)শাক্ত
তারাপীঠ (বীরভূম)মা তারাপবিত্র প্রসাদপ্রসাদী কাতলা-রুই মৎস্য, বলির মাংসশাক্ত
কামাখ্যা (গুয়াহাটি)মা কামাখ্যাদেবীপূজামহিষ, হাঁস, ছাগ, পায়রা বলিশাক্ত-তান্ত্রিক
কালভৈরব (উজ্জয়িনী)কালভৈরবদুগ্ধ-ঘৃত উপাচারসুরা (দেশি মদ)শৈব/ভৈরব
জগন্নাথ ধাম (পুরী)বিমলাদেবী“নিরামিষ মহাপ্রসাদ”(অন্তরালে) মৎস্য ও বলির মাংসবৈষ্ণব + শাক্ত
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কৌম (বঙ্গ-আসাম-মণিপুর)বৈষ্ণব দেবতানিরামিষ বৈষ্ণবাচারমৎস্য, এমনকি মাংসবৈষ্ণব
মধুপর্ক / অতিথিসৎকারসাত্ত্বিক আপ্যায়নগোমাংস (“গোঘ্ন” = অতিথি)স্মার্ত-বৈদিক
বৈদিক যজ্ঞপবিত্র হোমসোমরস (নেশা), অশ্বমেধ, গোমেধবৈদিক

উপসংহার: উপরের সারণীতে “ঘোষিত” ও “নিবেদিত” স্তম্ভ দুইটি কোথাও মিলে না। অভিন্নতা যাঁহারা খোঁজেন, তাঁহাদের জন্য ইহাই মহতী সুসংবাদ (কিংবা দুঃসংবাদ)।

প্রার্থনা

এই অগণিত বিরোধাভাস, দ্বৈত-ত্রৈত-বহুবিধ মানদণ্ড দূরীকরণার্থে আমরা বিনম্র বিয়োজক (disjunctive) প্রস্তাব রাখি —

হয় সমগ্র বেদ-স্মৃতি-তন্ত্র-উপপুরাণ হইতে আমিষ, মৎস্য, মদিরা ও বলির যাবতীয় অংশ সযত্নে ছাঁটিয়া এক “পাস্তুরিত, সমসত্ত্বীকৃত সনাতন” সংস্করণ পুনঃপ্রকাশিত হউক;

অথবা — যেহেতু তাহা অসম্ভব — সবিনয়ে স্বীকার করিয়া লওয়া হউক যে “হিন্দু” নামক ছত্রটির নিচে কোনো অভিন্ন খাদ্যবিধি কোনোকালে ছিল না, নাই, থাকিবেও না।

ইতি,

আপনাদের একান্ত অনুগত,

সমরূপীকৃত (homogenized), পাস্তুরিত, প্রমিতকৃত সনাতন-ব্র্যান্ডের নিরামিষ ভক্তবৃন্দ

জয় শাকম্ভরী মাতা কি জয়! জয় বাঞ্ছারামের যাঞ্চা॥

পুন:

সংস্কৃতে “আমিষ” (āmiṣa) শব্দের অর্থ কেবল ‘মাংস’ নহে — ‘টোপ, প্রলোভন, লোভনীয় বস্তু’ও (দ্র: Monier-Williams)। সুতরাং “নি:-আমিষ” = নিঃপ্রলোভন, নির্লোভ।

আমরা রসনা ও জিহ্বা আগেভাগেই আপনাদিগের চরণে নিবেদন করিয়া ‘নিরামিষভক্ত’ আখ্যা লাভ করিয়াছি। তথাপি শাস্ত্র কহে — যজ্ঞের সোমও নেশা, ভৈরবের সুরাও নেশা, আর গোমাংস-রফতানির মুনাফাও এক প্রকার ‘রস’। এই ত্রিবিধ আমিষ (প্রলোভন) হইতে আমরা মুক্তি চাহি না; কেবল বঙ্গের ঐ মেছো শাক্তদিগের মৎস্য-রস হইতেই যা একটু মুক্তি চাই।

ওরে, আমার লোভী রসনাখানি বন্ধ করিয়া দে — কিন্তু কর্পোরেট প্রণামীর থালাটি যেন খোলা থাকে॥

“UNIFORM VEGETARIAN FOOD CODE” FOR ALL THE “HINDUS”??? VIEW HERE ⤡

বিফ-বাফ নিয়ে যতো বাড়াবাড়ি— ভারতের “নিষিদ্ধ” মাংস রপ্তানি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি

বিষয়বিস্তারিত তথ্যতারিখ / বছরযাচাইকৃত সূত্র
মহিষ মাংস রপ্তানি ২০২৩-২৪৩.৭৪ বিলিয়ন USD, ~১২.৯৬ লাখ মেট্রিক টনএপ্রিল ২০২৩ – মার্চ ২০২৪APEDA / DGCIS (Statista মাধ্যমে, জুন ২০২৫)
মহিষ মাংস রপ্তানি ২০২৪-২৫ (রেকর্ড)৪.০৬ বিলিয়ন USD — হিমায়িত হাড়-ছাড়া মাংস। ২০১৮-র পর সর্বোচ্চ। মোট প্রাণীজ পণ্য রপ্তানির ৭৯.৪% অংশ।এপ্রিল ২০২৪ – মার্চ ২০২৫APEDA / DGCIS; iref.net (অক্টোবর ২০২৫); Scroll.in (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
মহিষ মাংস রপ্তানি ২০২৫-২৬ (আংশিক)এপ্রিল–আগস্ট ২০২৫-২৬: মহিষ মাংস, দুগ্ধজাত ও পোল্ট্রি মিলিয়ে ২.১৭ বিলিয়ন USD — বার্ষিক ~২০% বৃদ্ধি। পূর্ণ বর্ষের তথ্য এখনও অপ্রকাশিত।এপ্রিল–আগস্ট ২০২৫APEDA শিল্প সূত্র; iref.net (অক্টোবর ২০২৫)
প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ২০২৪-২৫ভিয়েতনাম, মিশর, মালয়েশিয়া, ইরাক, সৌদি আরব। মিশর ও মালয়েশিয়ায় রপ্তানি ২০১৭-১৮ তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ১.২ বিলিয়ন USD।২০২৪-২৫APEDA / DGCIS (আনুষ্ঠানিক); Scroll.in
রপ্তানি প্রবণতা: ২০১৪-২০২৫২০১৪-১৫ সালে সর্বোচ্চ পরিমাণ (১৪.৭৫ লাখ মেট্রিক টন)। ২০১৯-পরবর্তী দীর্ঘ পতন। ২০২৪-২৫ সালে ৪+ বিলিয়ন USD মূল্যে ২০১৮-র পর প্রথম পুনরুদ্ধার।২০১৪-২০২৫APEDA; The Print (মার্চ ২০১৯); Scroll.in (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
বৈশ্বিক অবস্থান ২০২৪-২৫ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহিষ মাংস রপ্তানিকারক। APEDA-তে নথিভুক্ত প্রায় ৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। APEDA-র রপ্তানি তালিকায় বাসমতি চালের পরেই দ্বিতীয় স্থান।২০২৪-২৫APEDA (অক্টোবর ২০২৫); iref.net
বিষয়বিস্তারিত তথ্যতারিখ / বছরযাচাইকৃত সূত্র
Allana Group-এর BJP-কে দান ২০২৪-২৫৩০ কোটি টাকা — গোষ্ঠীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২৩-২৪ সালে ছিল ২ কোটি → ১৫ গুণ বৃদ্ধি। চারটি সংস্থার মাধ্যমে: Allanasons Pvt. Ltd., Frigerio Conserva Allana, Frigorifico Allana, Indagro Foods.২০২৪-২৫ অর্থবছরনির্বাচন কমিশন (ECI) প্রকাশ; Scroll.in (আয়ুষ তেওয়ারি, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬); The News Minute; Siasat Daily
Allana Group-এর দানের সম্পূর্ণ ইতিহাস২০১৩-১৪: ২ কোটি (সরাসরি) → ২০১৪-১৫: ৫০ লাখ → ২০১৯: BJP-কে ২ কোটি + Shiv Sena-কে ৫ কোটি (ইলেক্টোরাল বন্ড) → ২০২৩-২৪: ২ কোটি → ২০২৪-২৫: ৩০ কোটি২০১৩-২০২৫ECI প্রকাশ; SBI ইলেক্টোরাল বন্ড তথ্য; Scroll.in; The Quint (মার্চ ২০২৪)
Allana Group-এর রাজস্ব ২০২৪-২৫Allanasons Pvt. Ltd.-এর রাজস্ব ১০,৩২০ কোটি টাকা — ২০১৮-র পর প্রথমবার ১০,০০০ কোটি ছাড়িয়েছে। BJP সরকারের মিশর, তুরস্ক, সিঙ্গাপুরে বাজার সম্প্রসারণ সহায়তার সাথে সমাপতি।২০২৪-২৫রেজিস্ট্রার অব কোম্পানিজ দাখিল; Scroll.in (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
২০১৯ সালে IT বিভাগের অভিযানআয়কর বিভাগ ১০০+ প্রাঙ্গণে তল্লাশি, ~২০০০ কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ। ওই বছরই গোষ্ঠী ইলেক্টোরাল বন্ড কিনতে শুরু করে।২০১৯Scroll.in; The Quint
বিষয়বিস্তারিত তথ্যতারিখ / বছরযাচাইকৃত সূত্র
Al Kabeer Exports-এর মালিকানা ও পরিচালনা১৯৭০-এর দশকে Subberwal ও Ghulam Shaikh পরিবারের ৫০:৫০ অংশীদারিত্বে প্রতিষ্ঠা। বর্তমান পরিচালক পর্ষদ (MCA, ২০২৫): Asif Ghulamuddin Shaikh, Shabbir Amir Shaikh, Altaf Ghulamuddin Shaikh, Arshad Salar Siddiqui, Kuldip Singh Brar।প্রতিষ্ঠা ১৯৭৯; সর্বশেষ AGM ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫MCA; Factly fact-check; Tracxn; thecompanycheck.com (২০২৬)
সংশোধনী: হিন্দু মালিকানার দাবি‘সম্পূর্ণ হিন্দু মালিকানা’ দাবি সোশ্যাল মিডিয়া-উৎসারিত ও MCA রেকর্ডে অসমর্থিত। ভারতীয় রপ্তানি শাখার পরিচালকরা Shaikh পরিবার-ভুক্ত। পেপারে এই দাবি ব্যবহার না করাই নিরাপদ।MCA (CIN: U51900MH1979PTC020951); Factly
Allana Group পরিচয়১৬০ বছরের পুরনো গোষ্ঠী (প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৬৫)। নেতৃত্বে Irfan Allana। ভারতের বৃহত্তম মহিষ মাংস রপ্তানিকারক।১৮৬৫ থেকে সক্রিয়Scroll.in; APEDA; রেজিস্ট্রার অব কোম্পানিজ
বিষয়বিস্তারিত তথ্যতারিখ / বছরযাচাইকৃত সূত্র
গো-রক্ষক সহিংসতায় নিহতকমপক্ষে ৪৪ জন নিহত, যাদের মধ্যে ৩৬ জন মুসলিম। ২০টি রাজ্যে শতাধিক ঘটনায় ~২৮০ জন আহত। ৯০% হামলা BJP ক্ষমতায় আসার পর।মে ২০১৫ – ডিসেম্বর ২০১৮Human Rights Watch: ‘Violent Cow Protection in India: Vigilante Groups Attack Minorities’, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ (১০৪ পৃষ্ঠা)
আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর বিভাজন৫০% মুসলিম, ১০% দলিত, ৯% হিন্দু, ৩% আদিবাসী। পুলিশ বহু ক্ষেত্রে তদন্ত বিলম্বিত করেছে। BJP নেতারা একাধিক হামলা সমর্থন করেছেন।২০১৪-২০১৮HRW রিপোর্ট (ফেব্রুয়ারি ২০১৯); IndiaSpend ডেটা-সাংবাদিকতা

  বিভাগ ৫ — ধর্মীয় সমালোচনা

বিষয়বিস্তারিত তথ্যতারিখ / বছরযাচাইকৃত সূত্র
অবিমুক্তেশ্বরানন্দের BJP-বিরোধী অবস্থান (চলমান)‘এক দিকে মোদী বলছেন দল গো-রক্ষার পক্ষে, অন্যদিকে গোমাংস রপ্তানি বাড়ছে — এটা অত্যন্ত মর্মান্তিক।’ ‘গৌ ধ্বজ স্থাপনা ভারত যাত্রা’ (মার্চ ২০২৫) ও ‘গৌ রক্ষা সংকল্প যাত্রা’ (সেপ্টেম্বর ২০২৫) — মে ২০২৬-তেও সক্রিয়।২০২৪-২০২৬ (চলমান)The Print (মার্চ ২০২৫); Zee News (সেপ্টেম্বর ২০২৫); Navbharat Live (মে ২০২৬); Tribune India; Deccan Herald
অবিমুক্তেশ্বরানন্দের সাথে BJP-র সংঘর্ষজানুয়ারি ১৮, ২০২৬: প্রয়াগরাজ মাঘ মেলায় পালকি-তে যেতে বাধা ও কথিত লাঞ্ছনা। UP সরকার ‘শঙ্করাচার্য’ উপাধি ব্যবহার নিয়ে নোটিশ প্রেরণ।জানুয়ারি ২০২৬The Wire (জানুয়ারি ২০২৬); The Federal; Congress বিবৃতি
স্বরূপানন্দ সরস্বতীর সমালোচনা (দ্বারকা পীঠ)‘BJP দুমুখো — তাদের নেতারাই সবচেয়ে বড় গোমাংস রপ্তানিকারক।’ BJP-র গো-রক্ষা বক্তৃতা বনাম রপ্তানি বাস্তবতার দ্বৈততার দীর্ঘ ধারাবাহিক সমালোচনার অংশ।২০১৮Siasat Daily আর্কাইভ; India Today

Leave a Comment