Posted on 12th June, 2026 (GMT 07:45 hrs)
- License: CC BY 4.0
ABSTRACT
This work is a deliberate act of counter-propaganda — a sustained, repetitive, and self-consciously plagiaristic agit-prop by two melancholy Kolkata Bandyopadhyays who describe themselves as residents of a “non-nation.” Written in a deliberately hybrid register that mixes formal Sadhu Bangla with colloquial Chalit, code-switching, Sanskrit citation, and street humour, the text performs its own central argument: that the imposition of linguistic and cultural uniformity is itself a form of violence. The book’s governing question is the political and civilisational fate of Bengali identity under Hindutva’s ascendant national project. The argument unfolds across seven chapters and proceeds on several interlocking planes. It opens by mapping the deep genealogy of anti-Bengal prejudice within Brahmanical Sanskrit literature — from the Ṛgveda and Aitareya Āraṇyaka to the Baudhāyana Dharmasūtra — showing how the term vāyaṃsi (birds, creatures of unstable motion) was deployed to mark the peoples of Bengal and the eastern territories as ritually impure, geographically ungovernable, and socially excludable. This ancient ideology of exclusion is read as the structural antecedent of contemporary Hindutva’s hostility toward Bengal. The book then interrogates the ideological apparatus of nationalism itself. The concepts of mātr̥bhūmi (motherland) and mātr̥bhāṣā (mother tongue) are traced to their origins in Christian ecclesiastical vocabulary — adopted into Bengali and Indian nationalist discourse during the colonial period — rather than to any ancient Sanskritic or “Sanatan” tradition. Through a close reading of Bankimchandra’s “Bande Mataram” and Rabindranath’s Ghare Baire — particularly the counter-nationalist voice of Nikhilesh — the authors argue that the nationalist invocation of the “mother” is a manufactured intoxication (nesha) that substitutes enchantment for genuine political freedom. The category of “Hindu” identity is subjected to rigorous historical disaggregation. Drawing on Rajataraṅgiṇī, Chola-period inscriptions, and the long record of Shaiva-Vaishnava conflict, the book demonstrates that the “one religion, one nation” claim of the Sangh Parivar has no historical foundation: what existed was a complex, internally contested plurality of sects, practices, and cosmologies — a plurality that colonial administration and contemporary Hindutva alike have violently flattened. A substantial chapter examines the political economy of language. Grierson’s own admission of the impossibility of distinguishing language from dialect is mobilised to expose the census-driven erasure of Odia, Assamese, and other eastern linguistic identities in the service of a Hindi-dominated national demography. The historical construction of Bengali geographic identity — from Pundra, Gauda, and Banga through the Mughal Suba-e-Bangla to the colonial Bengal Presidency — is traced to show that “Bengal” itself is a layered historical formation rather than an eternal essence. The chapter ends with a detailed empirical treatment of what the authors call the carabeef paradox: the coexistence of cow-vigilante violence and lynching with India’s status as the world’s largest exporter of bovine meat under Hindutva governance — complete with data on the Allana Group’s political donations and the corporate structures behind the trade. The critique of Bengali identity is turned inward as well. Drawing on Nirad C. Chaudhuri’s Ātmaghātī Bāṅālī while contesting his Eurocentric prescription, the authors indict the Bengali bhadralok’s chronic self-deception, selective memory, and hypocritical Islamophobia — the same community that produced Derozio, Vidyasagar, and Nazrul now reaches for saffron affiliation or comfortable silence. The book closes with a rereading of the Sanskrit tarpaṇa (ancestral water-offering) ritual as a philosophical statement of radical solidarity — one that extends water and recognition even to enemies, to serpents, to trees, to the dispossessed. The “I” (ayam) is asked to journey toward “we” (vayam), a movement the authors align with the Bantu concept of ubuntu. The final aspiration, voiced through Nazim Hikmet, John Lennon, Juan Ramón Jiménez, and Carl Sagan, is not for a better nation but for the dissolution of the nation-statist form itself — a trans-planetary, non-violent dwelling in the (other-than-)human species-condition, from Kolkata to the pale blue dot.
সূচিপত্র
শূন্য।। অবতরণিকাঃ টুকলিবাজি আর পুনরুক্তি
এক।। ডানার শেকড়, শেকড়ের ডানাঃ না-নেশনের তল্লাশে… (কৃতজ্ঞতাঃ হিমেনেথ)
দুই।। “জোরকা ঝটকা হায় জোরোসে লাগা, হাঁ লাগা…”
— দুই (ক)।। বঙ্গ-বিদ্বেষঃ “সনাতন” শাস্তরে আর কাব্যে
— দুই (খ)।। “আমরা”— “ব্রাত্য, মন্ত্রহীন”
— দুই (গ)।। “পাঁচটি অ-পবিত্র অঞ্চল”-এর বামনাই কাঠামো
— দুই (ঘ)।। সমকালে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ বিষয়ক ঘেন্নাভরা কথাবার্তা
— দুই (ঙ)।। সাম্প্রতিক বাঙালি হেনস্থার হিসেব-নিকেশঃ এক নজরে
তিন।। নেশনের নেশার কিসসা
— তিন (ক)।। “আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ…”
— তিন (খ)।। “দেবভাষা” সমোস্কৃতের গপ্পো
চার।। “হিঁদু” কে বে? কে বে “সনাতন”?
পাঁচ।। বাঙালি— আপুনার মুখ আপুনি দেখো!
ছয়।। নানান চলে-চালে “ভাষা”
— ছয় (ক)।। পথিক, তুমি কি ম্যাপ হারাইয়াছো? (কৃতজ্ঞতাঃ কেতকী কুশারী ডাইসন)
— ছয় (খ)।। খেলার নানান লীলেখেলা
— ছয় (গ-১)।। “আমি যে তোর ভাষা বুঝি নে…”
— ছয় (গ-২)।। “রামরাজ্য” আর রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে
— ছয় (গ-৩)।। বাংলার সজ্ঞান সংস্কৃতায়ন, বৈদিকীকরণ ও আর্যীকরণ
— ছয় (ঘ)।। পোশাকের রাজনীতি
— ছয় (ঙ)।। “যত কিছু খাওয়া লেখে বাঙালির ভাষাতে…”
গরু নিয়ে গো-এষণাঃ
।। ক-অক্ষর গোমাংসের আমলে “বিফ” (??) রফতানির বাড়বাড়ন্ত ।।
।। গরুর আত্মকথা ।।
১। হিঁদু ভারতে মোষ-মাংস (Carabeef) রফতানির তামামি
২। Allana Group ও রাজনৈতিক অর্থনীতি
৩। প্রধান রফতানিকারক ও মালিকানা কাঠামো
৪। গো-রক্ষক হিংস্রতা: তথ্য ও ঘটনা
৫। স্বয়ং শঙ্করাচার্য-এর সমালোচনা ও বিজেপির দু’মুখো চেহারা
সাত।। আমাদের তর্পণের ইন্তেকাল
শূন্য।। অবতরণিকাঃ টুকলিবাজি আর পুনরুক্তি
“কে জানে মহিমা তব এ ভবমণ্ডলে?
নরাধম আছিল যে নর নরকুলে
চৌর্য্যে রত, হইল সে তোমার প্রসাদে,
মৃত্যুঞ্জয়, যথা মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি!
হে বরদে, তব বরে চোর রত্নাকর
কাব্যরত্নাকর কবি!”
— শ্রীমধুসূদন
“Immature poets imitate; mature poets steal; bad poets deface what they take, and good poets make it into something better, or at least something different. The good poet welds his theft into a whole of feeling which is unique, utterly different from that from which it was torn.”
— টি এস এলিয়ট, The Sacred Wood: Essays on Poetry and Criticism (১৯২০)
যে দুই তস্কর এখন এই লেখাটি লিখিতে বসিয়াছেন, তাঁরা দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় (দেপ্রব) নামক ব্যক্তির ঝাড়া লেখা হইতে ফের ঝাড়িতেছেন। দেপ্রব এবং আখর বন্দ্যোপাধ্যায় (আব) আত্ম-কুম্ভিলকে (self-plagiarists) পরিণত হইয়াছেন। সেই আমরাই হলুম গিয়ে গিয়ে কোলকাতার বাঁড়ুজ্জ্যে – দেবু বাঁড়ুজ্জে আর আখর বাঁড়ুজ্জে – মহাজাগতিক আন্তর্জাতিকতায় আস্থা রেখে মানবগোত্রে থিতু থেকে (আপাতত) না-নেশনের বাসিন্দে। লেখকদের তাই “Earthlings” হিসেবেই চিহ্নিত করিতে হইবে।

আমাদের অবস্থাটা একটু বুঝিয়ে বলা যাক বরং। আমরা এই মুহুর্তে পরম বিষাদগ্রস্ত। অর্থাৎ, চারিদিকে বোকারাম, হাঁদাগঙ্গারাম, রামছাগলদের আর ডাফারদিগের দাপটে নিতান্ত বিরক্ত হইয়া এই পুনরুক্তিমূলক বয়ানটি আপুনাদের সামনে পেশ করিতেছি।
আমরা এমত বক্তব্য রাখিবা মাত্রই একটি উক্তি আমাদের ইস্ক্রিনে ভাসিয়া উঠিলোঃ

এমত উক্তি নেহাতই অ্যান্টি-ন্যাশানাল। “রাম” লইয়া এরকম ছ্যাবলামি করা হিঁদু বলয়ের নয়া কলোনি এই বঙ্গদেশে অতীব ঘেন্নাজনক (হাসি পাচ্ছে)। রাম বলে রাম? রামের নাম করিলে ভূত পলাইয়া যায়। ইদানিংকার রামরাজ্যে ডাবল ইঞ্জিন সরকার বুধমণ্ডলীর প্রেতাত্মাদিগকে ঝাঁটা মারিয়া বিদেয় করিতে চান। পরবর্তীতে আমরা এই “হন্টোলজি” নিয়া কথা পাড়িব।
যাকগে যাহাঁ বলিতেছিলাম। হ্যাঁ, বর্তমান এই পুনরুক্তিমূলক বয়ান, বরং একে কোটেশন-কলঙ্কিত সংকলন বলিলেই এর সার্বিক মূল্যায়ন ঘটে বলিয়াই আমাদের ধারণা। তবে এই পুনরুক্তিতে যদি দোষ দেখিয়া থাকেন কেউ, তাহলে আমরা শ্রীশ্রীমদ্ভগবৎ গীতার ভাষ্য হইতে উদ্বৃতি দিয়া আত্মরক্ষা করিব। যখন কেষ্ট ঠাকুর বিষণ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখাইতেছিলেন, তখন বিষণ্ণ অর্জুন ঘাবড়াইয়া গিয়া বারংবার একই কথা কহিতেছিলেন। এই প্রসঙ্গে ভাষ্যকার শ্রীবলদেব বলিতেছেনঃ “অর্জ্জুনের বাক্যে কোনকোন স্থলে তাহার বিস্ময়াবিষ্টত্বহেতু পুনরুক্তি (দেখা যায়)। ইহা দোষের নহে। যাহা বলা হইতেছে— ‘প্রমাদে, বিস্ময়ে, হর্ষে, দুইবার বা তিনবার উক্তিতে কোনো দোষ হয় না।’ ইতি, গীতা ১১শ অধ্যায়ের ১৯ নম্বর শোলোকের ভাষ্য।
এই তস্কর বিদ্যে আমরা শিখিয়াছি আমাদিগের শাসকদিগের কাছ থেকেই। SIR হ্যাজ নামাইয়া, পুং পেশি ও বিপুল টাকার গরম দেখাইয়া, অথবা ব্যাপকভাবে EVM নাড়াচাড়া করিয়া তেনারা এন্তার রাজ্যে-কেন্দ্রে ভোট-চুরি করিবেন, আমরা বসিয়া বসিয়া আঙুল চুসিবো— তাহা হয় কেমনে? VVPAT, থুড়ি, VVIP (Vওটের সময় Iহাদের Pওয়া যায়) মহাজনরা যাহা করিবেন তাহাই তো অনুসরণযোগ্য! নাকি বটে?
কিন্তু একই কথা বারংবার বলিয়া বিষণ্ণ আমরা এই কাজ করিতেছি স্রেফ কাউন্টার-প্রোপাগাণ্ডার তাগিদে। তাই এই লেখা আমাদের অ্যাজিট-প্রপ— বিস্মৃতের পুনঃস্মরণ!
তাও…ইয়াং বেঙ্গলের উত্তরসূরি কেরেশচান মাইকেল-প্রণীত মেঘনাদবধ কাব্যারম্ভে যে সরস্বতী বন্দনা ঠাঁই পাইয়াছে, তাহা হইতে কেন উদ্বৃত করিতেছি? দেপ্রব তো ২০০৩ সাল নাগাদ সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউট ফর ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গোয়েজেজ-এর একটি সভায় সরস্বতী বন্দনা হইতে দেখিয়া অশোকস্তম্ভ-মার্কা সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেহাতই রাগান্বিত হইয়া পোতিবাদ করিয়াছিলেন। এখন কি তিনি অনেকেরই মতো পাল্টি খাইবেন? এমনকি ২০১৬-র গুজরাতি এক পেরাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে “ভারতমাতা কি জয়” বলিতে অস্বীকার শুধু করেন নাই, তাঁহার এসলামধর্মী ছাত্রদিগকেও তোল্লাই দিয়াছিলেন। তাহা লইয়া হেব্বি ক্যাঁচাল উপস্থিত হয়।
যে মহাকবি রচেছিলেন মেঘনাদ বধের চাতুরি কিসসা, সেই কিতাব কি নিষিদ্ধ করবে না তথাকথিত হিঁদুত্ববাদীরা? তিনি বলেছিলেন, “I despise Rama and his rabels”। তাহলে তো তাতাদার রামকে নিয়ে ছ্যাবলামিমারা (সদর্থে কইছি) “লক্ষ্মণের শক্তিশেল”-ও ব্যান করিতে হয়!
লক্ষ্য করিবেন, আমাদের জবানিতে “গুরু”(সাধু) আর “চণ্ডাল” (চলিত) পাশাপাশি বসিয়া আছে/থাকিবে— শবপোড়া আর মড়াদাহ আমরা করিবোই। কেননা, হিঁদুদিগের জঘন্য জাতপাতের অ-ব্যবস্থাটা আমাদের ভাঙিতেই হবে, এমনকি ভাষারও। আমাদের পূর্বসুরী খ্যাতনামা চার বাঁড়ুজ্জ্যেরা তাঁদের লেখাপত্তরে তাই করিয়াছেন।
যাহাই হৌক, আপাতত কলকাতার বাঁড়ুজ্জেরা তাহাঁদিগের বিষয়ী-অনুভবের কথা নিম্নে ব্যক্ত করিতেছেন। অর্থাৎ, দক্ষিণ-পূর্ব আশিয়ার দর্শনের দস্তুর না মানিয়াই আগে আমাদের উত্তরপক্ষ পেশ করিয়া, তাহার পর পূর্বপক্ষকে (উপ-)স্থাপিত করিয়া তাহাকেও ছিন্নভিন্ন করিবো।
এক।। ডানার শেকড়, শেকড়ের ডানাঃ না-নেশনের তল্লাশে… (কৃতজ্ঞতাঃ হিমেনেথ)
লেখকেরা নিজেদের শেকড়ের অনুসন্ধানে নামতে চান, আবার একই সঙ্গে চান আকাশে-বাতাসে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর উদ্বৃত্ত অবসর। সেটাই বা কিরকম?
সেই প্রয়োজন মেটাতে এবার এই দুইজন তস্কর, পুনরুক্তি-প্রবণ লেখকের ঘরের মধ্যে ঢোকা হচ্ছে।
ঠিক যেমনটা ঘরের মধ্যে, শরীরের মধ্যে এসে সেঁধিয়েছে Digital Data Privacy Act, IT Rules, সঞ্চার সাথী (যদিও সে প্রকল্প আপাতত পাবলিকের প্রবল চাপে বিফল হয়েছে, ঠিক যেমন ড্রেকোনিয় কৃষক আইন পাশ করা যায়নি) অথবা পেগাসাস-মার্কা অন্য কোনো সফট্যয়ার।
আমরা বিছানায় শুয়ে রয়েছি। বিছানায় আমাদের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে একগাদা কিতাব। তার কয়েকটা নাম উল্লেখ করা যাকঃ ভগৎ সিংয়ের Why I am an Atheist?, বার্ট্রান্ড রাসেলের Why I am not a Christian?, কাঞ্চা ইলাইহার Why I am not a Hindu?, ইবন ওয়াররকের Why I am not a Muslim?, জ্যোতিবা ফুলের গুলামগিরি, বাবাসাহেবের Annihilation of Caste এবং কার্ল সেগানের Cosmos ও Pale Blue Dot। এইসব “অ্যান্টি-ন্যাশানাল” বইপত্তরগুলো পড়তে গিয়ে কখন যে প্রায় একইসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছি, তা নিজেরাও বিশেষ টের পাইনি।
আধো জাগরিত তন্দ্রার ঘোরে দেখি কিনা, এক ভদ্দরলোক আতসকাচ হাতে নিয়ে কৃষ্ণনগরের মাটির ওপর কী যেন খুঁজছেন। আমি বার-তিনেক “কী খুঁজছেন?” প্রশ্ন করবার পর তিনি খেঁচিয়ে-মেঁচিয়ে উত্তর দিলেন, “কর্কটক্রান্তিরেখা। জ্বালাবেন না তো!”
ঘুম ভেঙে গেলো। এই ছোট্ট পৃথিবী গ্রহের নানান সীমারেখা কেবল কল্পিতই নয়, বরং আত্মহনক যুদ্ধব্যবসা (যা আদতে মৃত্যু-শিল্পেরই নির্মাণ), নেশন-রক্ষা তদুপরি অস্ত্রবেওসা ইত্যাদি কাজে এই সীমান্তগুলোকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। যত্তোসব বাড়তি ঝক্কি আর গচ্চা! এই গচ্চা কেবল “টাকা-চিহ্ন” দিয়ে মাপা যায় না। গচ্চা মানুষ, না-মানুষ, প্রকৃতি-পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্রের…
মনে পড়লো শিমলার Viceregal Lodge-এ বসে থাকা এক কার্টোগ্রাফারের কথা। সাহেবসুবোরা বসে আরাম করে মানচিত্র ভাগ করছেন, আর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে সেই মানচিত্রবিদকেঃ “পঞ্জাব আর বাংলার এইখান এইখান দিয়ে লাইন টেনে দাও।” পঞ্জাব আর বাংলা? এই দুটো প্রদেশই সবচেয়ে বেশি লড়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধে। এদের সুপরিকল্পিতভাবে ভাগাভাগি করে কোমর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
সু-পরিকল্পিত? কার যে রান্নাঘর পড়বে পাকিস্তানে, আর উঠোন পড়বে হিন্দুস্তানে – তা কেউ জানেনা। এই যা-ইচ্ছে-তাই লাইন টানতে গিয়ে অনবরত আকণ্ঠ মদ্যপান করে যাচ্ছেন সেই কার্টোগ্রাফার। নিজেকে সামলে রাখতে পারছেন না। কেঁদে চলেছেন, মদ খেয়ে যাচ্ছেন তিনি, তবু প্রভুদের আদেশ মোতাবেক তাঁকে দাগ টেনেই যেতে হচ্ছে।
আমরা আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কমলাকান্তের মতোই আমরা আফিমের বদলে জয়েন্ট ফুঁকেছি। উনি খেতেন আফিম, আর আমি গঞ্জিকার জ্ঞানযোগে থিতু। ঘুমের মধ্যে দেখি, আমাদের অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু চার্লি দ্য কিড মেহিকো এবং আমেরিকার বর্ডার-লাইনের এক পা এদিক, আরেক পা ওদিক দিয়ে হাঁটছেন। দুই সীমানাতেই হুলিগানদের দাপট। চ্যাপলিনের হাতে তুচ্ছ ফুলের গোছা। তাঁর এই “দ্য পিল্গ্রিম” (১৯২৩) ছবিটা আমরা অনেকবার দেখেছি।
আ্মরা এই যুদ্ধবিদ্ধস্ত পৃথিবীকে দেখছি…বোবায় ধরেছে আমাদের… ঘুমের মধ্যে বকে চলেছি, অথচ আমরা বোবা— ঘুমের মধ্যে কথা বলাকে “বোবায় ধরা” বলে কেন তবে? এটুকু জানি যে এই অঘোষিত জরুরি অবস্থায় আমাদের মুখ বন্ধ। নিজেই নিজের মুখ বন্ধ করে দিচ্ছি না তো, যাকে বলে self-censorship? আমরা তাই আওড়াচ্ছি—
যেদিকে তাকাই,
সেদিকেই দেখছি আগুন—
বিপ্লবের নয়,
প্রতিহিংসা আর দখলদারির
আদিম রিপুতে!
মানে নেই এসবের জানি
তবু কান্না ভেসে আসে—
ও: তুমি বুঝি গাজা থেকে?
নাকি ইউক্রেন?
অথবা মণিপুর কি?
ইরান থেকে এসেছো বুঝি?
লেবানন?
গুজরাট ২০০২?
— গুজরাটের কসাইটা তোমার কী করেছে?
কী আবার করবে! নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোলাকুলি!
তুমি কে বলো দেখি?
মেরিকার মৃত সৈনিক?
কিংবা এই ভারতের
সাগরতীরের ইসলামহীন হিঁদু বাংলা ?
**
এতো আগুন রাখি কোন উনুনে?
তোমাদের কান্নার জলে রাঁধবো আমি
কালাহাণ্ডি রেসিপিতে মাংসল হাণ্ডি বিরিয়ানি ।
**
এইসব হিংসক আগুন দিয়ে,
পাতি বুর্জোয়া আমি,
আমার বারবিকিউতে তা দিই।
Most Oldest বদ সনাতনী অভ্যেসে,
বৈদিক কবি-ঋষিদের আদত মনে রেখে
গোমাংস সেঁকতে থাকি।
এই অকালমৃত গরুটা
বারংবার প্রসব দিতে দিতে
পুজোর বিনষ্ট দুধ জুগিয়ে গেছে হায়!
মুখে আমার বৈদিক কবিতা মন্তর:
অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্ ।
হোতারং রত্নধাতমম্ ॥
স্বপ্নে যা হয়, একটার ঘাড়ে আরেকটা এসে চাপে। এ সময়েই একটা গান ভেসে এলোঃ
“তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা…প্রিয়তমা
ভয় নেই এমন দিন এনে দেব
দেখ সেনাবাহিনীর বন্দুক নয়, শুধু গোলাপের তোড়া হাতে
কুচকাওয়াজ করবে তোমার সামনে,
শুধু তোমাকেই তোমাকেই স্যালুট করবে তারা দিনরাত।”
(শহিদ কাদরির কবিতা অবলম্বনে কবীর সুমনের গান)
আমাদের মনে হলো, কতগুলি বয়ানের পুনঃপাঠ জরুরি। তাই সরাসরি সেইসব কিতাব থেকে কিছু উদ্বৃতির পুনঃস্মরণ ঘটানো যাক এবার।
সেরকম একটা উদ্দেশ্য নিয়েই আপাতত আমি রবি ঠাকুরের ন্যাশানালিজম বক্তিমে ফের পড়ছি। তার পাশেই রয়েছে তাঁর পার্সোনালিটি আর সাধনা বক্তিমে। কী বলছেন তিনি এইসব লেখাপত্তরে?
“… [w]here the spirit of the Western nationalism prevails, the whole people is being taught from boyhood to foster hatreds and ambitions by all kinds of means—by the manufacture of half-truths and untruths in history, by persistent misrepresentation of other races and the culture of unfavourable sentiments towards them, by setting up memorials of events, very often false, which for the sake of humanity should be speedily forgotten, thus continually brewing evil menace towards neighbours and nations other than their own. This is poisoning the very fountainhead of humanity. It is discrediting the ideals, which were born of the lives of men who were our greatest and best. It is holding up gigantic selfishness as the one universal religion for all nations of the world.” [Rabindranath Tagore, Nationalism, “Nationalism in the West” (Chapter I). Macmillan, New York, 1917; নজরটান সংযোজিত]
একি কইছেন রবি ঠাকুর? আজকের ভারতবর্ষের সঙ্গে খাপে খাপ মিলে যাচ্ছে তো! যাঁরা এই হিঁদু ন্যাশানালিজমের ধ্বজা ওড়াচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে তো তোপ দাগা হলো। কল্পিত সীমানা নিয়ে এতো গর্ব, অপর-ঘেন্না, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা আমাদের আরো বিষণ্ণ করছে। এই বিষাদযোগে আমরা বারবার পড়ে যাচ্ছি এইসব অ-সাধারণ লাইনগুলো।
আরো পড়ে চলি।
“…[n]ationalism is a cruel epidemic of evil that is sweeping over the human world of the present age.” (Rabindranath Tagore, Nationalism, “Nationalism in Japan” (Chapter II). Macmillan, New York, 1917.)
নেশন ক্রুড়! P(L)andemic— planned epidemic== পরিকল্পিত মহামারি…!!! সব্বোনাশের মাথায় বাড়ি!
“I have seen in Japan the voluntary submission of the whole people to the trimming of their minds and clipping of their freedom by their government, which through various educational agencies regulates their thoughts, manufactures their feelings, becomes suspiciously watchful when they show signs of inclining toward the spiritual, leading them through a narrow path not toward what is true but what is necessary for the complete welding of them into one uniform mass according to its own recipe. The people accept this all-pervading mental slavery with cheerfulness and pride because of their nervous desire to turn themselves into a machine of power, called the Nation, and emulate other machines in their collective worldliness.” (Rabindranath Tagore, Nationalism, “Nationalism in Japan” (Chapter II). Macmillan, New York, 1917; নজরটান সংযোজিত)
এই কথাগুলো পড়তে গিয়ে মনে হলো এতো খুবই সাম্প্রতিক কথা! গাজা, কাশ্মীর, ইউক্রেইন, ইরাণ, মণিপুর ইত্যাদি জায়গায় যা যা চলছে, যেভাবে মগজধোলাই করা চলছে শাসকের তরফে, তাতে সত্যিই কারফিউ লেগে যায় মগজে। হীরক রাজার মগজ ধোলাই যন্তরে নেশনের নাগরিকদের পুরে দেওয়া চলছে। ওটা যেন এক ডিটেনশন থুড়ি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। আমরা কী ডিটেনশন ক্যাম্পের ভেতরে আছি, নাকি বাইরে আছি? ঠাহর হয় না। মনে পড়ছে, রবীন্দ্রনাথ পার্সোনালিটি বক্তৃতায় বলেছিলেন এই না-নেশনের কথা।
এই আন্তর্জাতিকতাকে পাত্তা দিয়ে, মহাবিশ্বের একটা অংশ হয়ে, আমরা কি কোনোভাবে পলিটিকালি কারেক্ট হতে চাইছি? আমাদের পথটাই ঠিক, না কি জুমলাবাজ ধর্ষকদের গ্যাংকে মালা পরিয়ে, মণ্ডামিঠাই খাইয়ে যখন অখণ্ড হিন্দু ভারতের কথা বলা হচ্ছে, বড়োলোক স্বেচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা দিব্য আছেন বিদেশে— সেই তাঁদের পথটাই শ্রেয়?
তখনই আমার গলার ভেতরে দলা পাকিয়ে ওঠে। বিশ্বজগতের বাসিন্দে হওয়ার চেষ্টাতে আমরা আমাদের শেকড়কে ভুলে যাচ্ছি কি? এই শেকড়ের ডানা গজাবে না কখনো? (হিমেনেথের এক দু’লাইনি পদ্য থেকে শঙ্খ ঘোষের তর্জমা থেকে ঝাড়লুম)
চলতে থাকে পড়াঃ
“Neither the colourless vagueness of cosmopolitanism, nor the fierce self-idolatry of nation-worship, is the goal of human history. And India has been trying to accomplish her task through social regulation of differences, on the one hand, and the spiritual recognition of unity on the other. She has made grave errors in setting up the boundary walls too rigidly between races, in perpetuating in her classifications the results of inferiority; often she has crippled her children’s minds and narrowed their lives in order to fit them into her social forms; but for centuries new experiments have been made and adjustments carried out.” (Rabindranath Tagore, Nationalism, “Nationalism in India” (Chapter III). Macmillan, New York, 1917; নজরটান সংযোজিত)
“The Nation, with all its paraphernalia of power and prosperity…cannot hide the fact that the Nation is the greatest evil for the Nation.” [Rabindranath Tagore, Nationalism, “Nationalism in the West” (Chapter I). Macmillan, New York, 1917; নজরটান সংযোজিত]
“Patriotism cannot be our final spiritual shelter; my refuge is humanity. I will not buy glass for the price of diamonds, and I will never allow patriotism to triumph over humanity as long as I live.” [Rabindranath Tagore, Letter to Aurobindo Mohan Bose (A. M. Bose), 19 November 1908. Published in Selected Letters of Rabindranath Tagore, ed. Krishna Dutta and Andrew Robinson (Cambridge University Press, 1997), p. 72. Also cited in Amartya Sen, “Tagore and His India,” Nobel Prize.org, and in Lit: Literature Interpretation Theory, Vol. 36, No. 2 (2025).]
এ কেমন কথা? Nationalism আর patriotism-কে স্বদেশিয়ানার যুগে নস্যাৎ করছেন? দেশভক্ত্ আর অন্ধভক্ত্-রা তো তাঁকে নির্ঘাৎ Urban Naxal কইবেন!
একটা ব্যাপার খেয়াল করা দরকার। রবি ঠাকুর পরিভাষা তৈরিতে ওস্তাদ হলেও, “নেশন”-নামক এই আজব চিজটিকে তিনি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেননি। আজকে যখন আমরা আশিস নন্দির Illegitimacy of Nationalism পড়তে বসি, তখনও সেই রবি ঠাকুরে আশ্রয় নিতেই হয়। সুমন বলেছেন, বাঙালি বড়ো অসহায়, রবি ঠাকুর বিনে। তারপর বেনেডিক্ট অ্যান্ডার্সন যখন “কল্পিত কৌম”-এর কথা পাড়েন ছাপাখানার পুঁজিবাদের সাপেক্ষে, তখন এই না-নেশনের বাসিন্দেদের মনে হতেই পারে, তাহলে কী তাদের নিজস্ব কোনো কল্পনাই নেই? এমন প্রশ্ন তুলেছেন পার্থ চাটুজ্যে। কাজেই, ইয়োরোপ এবং সামচাচার দেশ থেকে আহৃত ও বিকল্পিত নির্মাণ এই “নেশন”-এর ধারণা।
নেশনকে কল্পিত কৌম হিসেবে দেখবার প্রসঙ্গটা বেন অ্যান্ডারসনের ১৯৮৩-তে লেখা Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism কিতাব-মোতাবেক স্রেফ ছাপাখানার পুঁজিবাদে এখন আর সীমাবদ্ধ নেই। এখন নেটিজেনদের যুগ। ১৯৯৯ নাগাদ একেই দেপ্রব বলেছিলেন “Electronic Capitalism”। আজ Cyber-capitalism-এর আধারে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে Linguistic Cyber-Colonization (দেপ্রব-র এই লেখাটা ২০০৬-সালে বেরিয়েছিলো সেই Vicegral Palace-থেকেই, অর্থাৎ যা এখন The Indian Institute of Advanced Study যেখানে আরামকেদারায় বসে নিমেষে দেশভাগ করেছিলেন “মানিগণ্যিরা”)।
নেশন-নির্মাণের ভেতরেই ঢুকে আছে মড্যুল-কেন্দ্রিক (অ্যান্ডারসন যাকে বলছেন “modular forms”) কল্পনা। কখন যে জাত-পাত-ধম্মো-ভাষা-রঙ প্রমুখিত হয়ে নেশন দৈত্যের জন্ম দেবে, সেই মর্জিই বা কে তৈরি করবে, সেটা নিয়েই এখন ভাববার সময় এসেছে।
বুলডোজার চালিয়ে এক ভাষা-এক ধম্মো-এক দেশ নির্ভর হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের পরিকল্পনা চলছে, বড়ো পুঁজির স্বার্থে ভাজপার এটা দরকারই ছিলো। গরীব হকার, খুচরো আর পাইকারি দোকানদারদের পেটে লাথি মেরে আম্বানি-আদানিদের (আম আর আদা! other ব্যাপারির তো রমরমা।) একচেটিয়া (বা বলা ভালো duopoly) “এসো আমার ঘরে এসো” বলাটাই এখনকার দস্তুর। ক্রোনি ভারতের ডবল ইঞ্জিন সরকারের পার্টি ফান্ডে মোটা তোলা ঢোকাতে হবে যে—“চান্দা দেও, ধান্ধা লও”- নীতিই হল একে-অন্যের পিঠ চুলকে দেওয়া quid pro quo cronyism!
আমরা কি হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের কলোনি হয়ে উঠছি?
দুই।। “জোরকা ঝটকা হায় জোরোসে লাগা, হাঁ লাগা…”
বিশ্বজাগতিক মনভূমির বিস্তারে পৌঁছে গিয়েও কোনো এক নামহীন অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে পারছিনা কিছুতেই।
বিষণ্ণ আমরা এখনো বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছি। লেখা-লিখি-বক্তিমে কিসসু সম্ভব হচ্ছে না আমাদের দ্বারা। তাই স্কিৎজো বনে গিয়ে ঘুমপাড়ানি গান শুনছিঃ
খোকা ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো
বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেবো কিসে? ধান ফুরোলো,
পান ফুরোলো খাজনার উপায় কী?
আর ক’টা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি।
এই বর্গি কারা? তাদের ন্যাতা কে? ভাস্কর পণ্ডিত— পাক্কা হিঁদু বাউন। এই জাত-ধম্মোপরিচয় খোঁজা বৃথা, কেননা ইনভেডারস আর ইনভেডারস। সে চেঙ্গিস খাঁই হোন, কিংবা ভাস্কর পণ্ডিতই হোন। আদতে রাজায়-রাজায় যুদ্ধু হয়, উলুখাগড়ার পরাণ যায়। অবিশ্যি রবি ঠাকুর অন্য কথা বলবেন। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলেও উলুখাগড়াদের গায় হাত পড়েনি। এটাকেই পার্থ চ্যাটার্জি বলছেন খণ্ড খণ্ড ভারতের “ইনার ডোমেইন”। যদিও এতো সারসত্তাবাদী বক্তব্যে আমাদের সম্মতি নেই। তাই যদি হতো, তাহলে এই ঘুমপাড়ানি গান লেখাই হতো না। আসতো না “খাজনা” দেওয়ার কথা। এখানে নজরকাড়া শব্দটি হচ্ছে “রসুন”। রসুন কারা বেশি খায়, তা আন্দাজ করে নেবেন পাঠক।
এই “রসুন”-সংস্কৃতির (আমরা আবার ছ্যাবলামি মেরে “রসুন-কে” মুণ্ডমাল শব্দ ধরে বলতুম পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল সোন্ধে) প্রসঙ্গেই মনে পড়ে গেলো মাইকেল সাহেবের একটা প্রহসনের কথাঃ “বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ” (১৮৬০)।
নাটকের মূল চরিত্র ভক্তপ্রসাদ একজন বুড়ো ও কিপটে জমিদার। তিনি বাইরে নিজেকে অত্যন্ত ধার্মিক ও পরম বৈষ্ণব হিসেবে জাহির করলেও, মনে মনে অত্যন্ত কামুক এবং লোভী। তাঁর এক দরিদ্র মুসলিম প্রজা হানিফ গাজী খাজনা দিতে না পারায় ভক্তবাবু হানিফের সুন্দরী তরুণী স্ত্রী ফাতেমাকে “কল” দিয়ে লোক পাঠান। ফাতেমা এবং হানিফ একজোট হয়ে বুদ্ধি খাটিয়ে ভক্তবাবুকে ফাঁদে ফেলে এবং তাঁর এই গুপচুপ ভণ্ডামি সবার সামনে ফাঁস করে দেয়।
বলাই বাহুল্য, ১৬৬ বছর আগেকার এই নাটক আজও একইভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই কিছু সংলাপ উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারলুম নাঃ
“ভক্ত। (চিন্তা করিয়া) মুসলমান মাগীদের মুখ দিয়ে যে প্যাঁজের গন্ধ-ভকভক করে বেরোয় তা মনে হল্যে বমি এসে।
গদা। কত্তাবাবু, সে তেমন নয়।
ভক্ত। (চিন্তা করিয়া) মুসলমান! যবন! ম্লেচ্ছ! পরকালটাও কি নষ্ট করবো?
গদা। মশায়, মুসলমান হলো তো বয়ে গেল কি? আপনি না আমাকে কতবার বলেছেন যে শ্রীকৃষ্ণ ব্রজে গোয়ালাদের মেয়েদের নিয়ে কেলি কত্যেন।
ভক্ত। দীনবন্ধো, তুমিই যাই করো। হাঁ, স্ত্রীলোক—তাদের আবার জাত কি? তারা তো সাক্ষাৎ প্রকৃতিস্বরূপা, এমন তো আমাদের শাস্ত্রেও প্রমাণ পাওয়া যাচ্যে! বড়ো সুন্দরী বটে, আঁ?” (বানান যথাযথ; নজরটান সংযোজিত)
হিঁদু শাস্তরে কয়, “বিষাদপ্যমৃতং গ্রাহ্যমমেধ্যাদপি কাঞ্চনম। নীচাদপ্যুত্তমা বিদ্যা স্ত্রীরত্নং দুস্কুলাদপি”; অর্থাৎ স্ত্রীরত্ন দুস্কুলে জম্মালেও তাকে অনায়াসে “গ্রহণ” (?) করা যায়। আরো একটা তথ্য জানাই। শুরুতে এই প্রহসনের নাম রাখা হয়েছিল ‘ভগ্ন শিব মন্দির’। ভগ্ন শিব মন্দির? হ্যাঁ, এই ধাম্মিক অকুস্থলেই ভক্ত ডেকেছিলো ফাতেমাকে—স্রেফ সম্ভোগের তাগিদে।
আজকাল আবার হিঁদুত্ববাদীরা খাড়া কিছু দেখলেই তাকে বোমভোলের বাঁ* (এবার থেকে খাঁড়া কিছুকে শিবলিঙ্গ হিসেবে চালানোর আগে তার তলায় সতীর যোনীটি আছে কি না একবার দেখে নেবেন!) বানিয়ে দিচ্ছে। আর স্তনাকার গোলাকৃতি গম্বুজ দেখলেই বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এসব দেখে-শুনে ফ্রয়েদ সাহেবকে পেরিয়ে এমন উপকল্প (hypothesis) হয়তো বা গড়ে ফেলা যায়ঃ penis envy vs. breast envy!
ওদিকে এতোক্ষণে ঘুমপাড়ানি গানের ঝিমুনি গেলো ঘুচে গব্বরের হুমকিতে—। দেখি গব্বর সিং বলছেঃ “ইহাঁ সে পচাস-পচাস কোস দূর গাঁও মে যব বাচ্চা রাত কো রোতা হ্যায়, তো মা কহতি হ্যায় — বেটা সো যা, সো যা, নাহিঁ তো গব্বর সিং আ জায়েগা।”
এতোক্ষণ পর্যন্ত নেশনের ইম্যাজি-নেশনকে নানান দিক থেকে কিছুটা সম-আলোচনা করা হলো। বারবার ফিরে যাওয়ার চেষ্টা হলো সেই বিশ্ব-নাগরিকত্বের জায়গায়।
তবে…
ঠিক এই মূহুর্তেই আমাদের বাড়ির বাইরে কলকলনিনাদে “জয় শ্রী রাম”, “বন্দেমাতরম”, “ভারত মাতা কি জয়” ধ্বণি শুনতে পাচ্ছি। কতগুলো অবুঝ রামপাঁঠা হিন্দি ভাষায় কথা কইতে কইতে আমাদের বাড়ির সামনে বিশালাকার ভাগোয়া ঝাণ্ডা লাগিয়ে দিয়ে চলে গেলো। রাস্তায় বেরিয়েও শুনতে পেলুম চাদ্দিকে হিন্দিতে কথা-বার্তা চলছে। আমাদের কথা যেন কেউ শুনতেই চাইছে না আর। শুনলেও, বুঝতে চাইছেনা।
এই সময়েই আমরা এক চরম ধাক্কা খেলুম।
আমাদের হাড়গোড় ভেঙে চৌচির—মগজ কাজ করছে না।
আমাদের বিবমিষা প্রবল হল।
ডিজে বাক্সে বেজে চলা একটা গান আমাদের কানে এলোঃ
“জোরকা ঝটকা হায় জোরোসে লাগা, হাঁ লাগা…”
একি! আমরা-ও পপ হিন্দি গানের সঙ্গে গুন গুন করছি কেন?
এমন একটা ধাক্কা খেয়েই আপাতত বিশ্বনাগরিকত্বের জায়গাটাকে মুলতুবি রেখে আমরা আমাদের স্বভূমির শেকড়টাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করলুম।
তখন দেখি, চাদ্দিকে আরো খিস্তি-খেউড় চলছে আমাদের “বাঙালিপনা”কে নিয়ে।
ব্যাপারটা একদমই নোতুন নয়। আদ্দিকাল (“সনাতন”?) থেকে এই গালি খাচ্ছে জম্বুদ্বীপের প্রাচ্যের লোকজন—মানে “আমরা”।
দুই (ক)।। বঙ্গ-বিদ্বেষঃ “সনাতন” শাস্তরে আর কাব্যে
সংস্কৃত ধর্মশাস্ত্র, মহাকাব্য ও পুরাণে বঙ্গ, পুণ্ড্র, অঙ্গসহ পূর্বদেশের জনপদগুলোর বিরুদ্ধে প্রচুর বিদ্বেষমূলক উক্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এগুলো আদতে মধ্যদেশীয় কুরু-পঞ্চাল গোবলয়ের আধিপত্যের প্রকাশ। সেটা আবার শুধু জাতিগত বিদ্বেষ নয়, বরং সমুদ্রবাণিজ্য, তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান এবং বৈদিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বঙ্গের স্বাধীনচেতা মনোভাবকে ঠেকানোর নানানরকমের ভাবাদর্শগত হাতিয়ার।
কয়েকটা উদাহরণ একটু আউড়ে, চেখে দেখে নেওয়া যাক। এসবও অনেক ক্ষেত্রেই গালিগালাজ, তবে কিনা “প্রাচীন” সমোস্কৃতে!
১. ঋগ্বেদ ৮.১০১.১৪
প্রজা হ তিস্রো অত্যায়মীয়ুর্ ন্য অন্যা অর্কম্ অভিতো বিবিশ্রে।
বৃহদ্ধ তস্থৌ ভুবনেষ্ব অন্তঃ পবমানো হরিত আ বিবেশ॥
“তিন শ্রেণীর প্রজা অতিক্রম করে চলে গেছে; অন্যরা চারদিক থেকে উজ্জ্বল স্তবমন্ত্রকে আশ্রয় করেছে। বৃহৎ সত্তা সমস্ত ভুবনের মধ্যে স্থির; পবমান সোম সবুজ আলোকধারায় প্রবিষ্ট।”
এই মন্তরটা পবমান সোমের পবিত্রীকরণ নিয়ে — “তিস্রো প্রজাঃ” মানে যজ্ঞের পথ অতিক্রম করে-যাওয়া তিন শ্রেণী। পরবর্তীকালে ঐতরেয় আরণ্যক (বিশেষত ২.১৯) এই “তিস্রো প্রজাঃ”-কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলে যে এরা হলো দেবতা, পিতৃপুরুষ, ও মনুষ্য — কিন্তু তারপরে একটি তালিকা আসে যারা এই তিন শ্রেণীর বাইরে অবস্থিত, যাদের মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠীর উল্লেখ থাকে।
২. ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.১
প্রজা হ তিস্রো অত্যায়মীয়ুরিতি —
যা বৈ তা ইমাঃ প্রজাস্তিস্রো অত্যায়মায়ংস্
তানীমানি বয়াংসি বঙ্গাবগধাশ্চেরপাদাঃ ইতি।
“সেই তিন শ্রেণী যারা ধর্মের পথ অতিক্রম করে গেছে, তারাই এখন এই রূপে বিদ্যমান — পাখিসমূহ (বয়াংসি), বঙ্গ ও অবগধ জনগোষ্ঠী (বঙ্গাবগধাঃ), এবং চেরপাদরা।”
এই কিতাবখানা ঋগ্বেদের শাকল-শাখার উত্তর-বৈদিক ব্যাখ্যামূলক রচনা, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম-ষষ্ঠ শতাব্দী। তিনটি পদের মানে হলো —
• বয়াংসি/বায়াংসি — পাখিসমূহ; বৈদিক চাউনিতে বন্য ও অনিয়ন্ত্রিত সত্তার প্রতীক। আদি/ব্রহ্মপুরাণে বঙ্গীয়দের বিরুদ্ধে এই নিন্দাপদ ব্যবহৃত হয়েছে। “বায়ংসি” মানে হল বঙ্গীয়রা অগ্নিহোত্রাদি কম্মে অপটু আর অবিশ্বস্ত;
• বঙ্গাবগধাঃ — বঙ্গ ও বগধের মানুষ; প্রাচীন বাংলা ও সংলগ্ন পূর্বাঞ্চল;
• চেরপাদাঃ — পাখির পা-বিশিষ্ট টোটেমিক বর্ণনা, অথবা চের দেশের অধিবাসী; এ ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত।
ব্যাপারটা হলো, বৈদিক কেন্দ্রভূমির বাইরে যারা যজ্ঞকর্মে অংশ নিত না, তাদের পাখির সাথে তুলনা করে “অপর” বানানোর মতাদর্শগত চালটা এখানে স্পষ্ট। পণ্ডিতরা এটাকে হয় বঙ্গীয় জনগোষ্ঠীর পাখি-টোটেমের চিহ্ন, অথবা ব্রাহ্মণ্য সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অস্ত্র — এই দুইভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন।
৩. বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.২.১৩–১৫
১.২.১৩: অবন্তয়োঽঙ্গমগধাঃ সুরাষ্ট্রা দক্ষিণাপথাঃ উপাবৃৎ-সিন্ধু-সৌবীরাঃ এতে সংকীর্ণযোনয়ঃ।
১.২.১৪: আরট্টান্ কারস্করান্ পুণ্ড্রান্ সৌবীরান্ বঙ্গান্ কলিঙ্গান্ প্রানূনান্ ইতি চ গত্বা পুনস্তোমেন যজেত সর্বপৃষ্ঠয়া বা।
১.২.১৫: অথাপ্যুদাহরন্তি — পদ্ভ্যাং স কুরুতে পাপং যঃ কলিঙ্গান্ প্রপদ্যতে। ঋষয়ো নিষ্কৃতিং তস্য প্রাহুর্বৈশ্বানরং হবিঃ।।
অর্থাৎ,
১.২.১৩: অবন্তী, অঙ্গ, মগধ, সুরাষ্ট্র, দক্ষিণাপথ, উপাবৃৎ, সিন্ধু ও সৌবীরের লোকেরা সংকর বা মিশ্র উৎসের।
১.২.১৪: আরট্ট, কারস্কর, পুণ্ড্র, সৌবীর, বঙ্গ, কলিঙ্গ, প্রানূন — এই দেশগুলো থেকে ফিরলে পুনস্তোম যজ্ঞ অথবা সর্বপৃষ্ঠা ইষ্টি করতে হবে।
১.২.১৫: যে কলিঙ্গে যায় সে পায়ে পাপ বহন করে — ঋষিরা বলেন মুক্তির উপায় বৈশ্বানর হবি।
বঙ্গের উল্লেখ মূলত ১.২.১৪-তে — প্রায়শ্চিত্তযোগ্য দেশের তালিকায়। Georg Bühler-এর টীকায় স্পষ্ট হয়ে যায়: “The Pundras…and the Vangas belong to Bengal.” প্রায়শ্চিত্তের বিধানটাই বলে দিচ্ছে, এই অঞ্চলগুলোকে ব্রাহ্মণ্য কাঠামোর বাইরে বলে ধরা হত।
৪. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৮.১৮
এতে বা অত্র বহবোঽন্ধ্রাঃ পুণ্ড্রাঃ শবরাঃ পুলিন্দা মূতিবা
ইতি ভরতস্য বিশ্বামিত্রস্য অপসদা অভবন্।
“এই বহুসংখ্যক অন্ধ্র, পুণ্ড্র, শবর, পুলিন্দ ও মূতিব — এরাই ভরতের বিশ্বামিত্রের পরিত্যক্ত পুত্রদের অধঃপতিত বংশধর হয়ে উঠেছিল।”
‘অপসদ’ মানে তথাকথিত অধঃপতিত, নীচ (“উঁচু” জাতের নজরমাফিক) বর্ণের। বিশ্বামিত্রের অভিশাপে বড় ছেলেরা পুণ্ড্র-শবর প্রভৃতি জনজাতিতে পরিণত হয়েছে — এই গল্পটা দিয়ে পুণ্ড্রদের ব্রাহ্মণ্য কাঠামো থেকে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে। বৌধায়নের টীকায়ও (১.২.১৪) এই সূত্র-উল্লেখ করা আছে।
৫. মহাভারত, কর্ণপর্ব ৮.২২ ও ৮.৪৪
৮.২২—অঙ্গাশ্চ বঙ্গাশ্চ পুণ্ড্রাশ্চ মাগধাস্তাম্রলিপ্তকাঃ।
মেকলাঃ কোশলাশ্চৈব মদ্রাশ্চ দশার্ণকাঃ।।
“অঙ্গ, বঙ্গ, পুণ্ড্র, মগধ, তাম্রলিপ্তক, মেকল, কোশল, মদ্র ও দশার্ণ — এই পূর্ব ও দক্ষিণ দেশীয় হস্তি-বাহিনীর সৈনিকেরা পাঞ্চাল বাহিনীর উপর তীর ও বর্শা বর্ষণ করল।”
৮.৪৪—তে দেশা ধর্মহীনাঃ স্যুঃ ন তত্র গন্তব্যম্ ইতি ব্রাহ্মণঃ উবাচ।
“সেই অঞ্চলগুলো ধর্মহীন — সেখানে যাওয়া উচিত নয়, ব্রাহ্মণ এই কথাই বললেন।”
৮.২২-তে বঙ্গকে সরাসরি ‘ধর্মহীন’ বলা হয়নি, কিন্তু বঙ্গ যে তালিকায় আছে — বৌধায়নের ১.২.১৪-এর সেই আরট্ট-কেন্দ্রিক দলটাতেই। অতএব, ৮.৪৪-এর এই রায়টা মূলত একই মতাদর্শিক গুচ্ছেরই অংশ।
৬. মনুস্মৃতি ২.২৩
কৃষ্ণসারস্তু চরতি মৃগো যত্র স্বভাবতঃ।
স জ্ঞেয়ো যজ্ঞিয়ো দেশো ম্লেচ্ছদেশস্ত্বতঃ পরঃ।।
“যেখানে কৃষ্ণসার মৃগ স্বভাবতই বিচরণ করে, সেই দেশ যজ্ঞের উপযুক্ত; তার বাইরে সব ম্লেচ্ছদেশ।”
মনুস্মৃতি (আনুমানিক ২য়-৩য় শতাব্দী) ব্রাহ্মণ্য ধর্মশাস্ত্রের সংবিধানই বটে। সেখানে আর্যাবর্তের সংজ্ঞা হলো হিমালয় ও বিন্ধ্যের মধ্যবর্তী অঞ্চল — বঙ্গ এই সংজ্ঞার পূর্বসীমার বাইরে পড়ে, ফলে নিজের থেকেই ‘ম্লেচ্ছদেশ’-এ ঢুকে যায়। Patrick Olivelle (2004) তাঁর critical edition-এ এই ভৌগোলিক বিভাজনের রাজনৈতিক মাত্রা বিশ্লেষণ করেছেন।
৭. পরাশর স্মৃতি (আনুমানিক ৪র্থ-৯ম শতাব্দী)
সমুদ্রযানং গোহন্তিঃ পরদেশনিবাসনম্।
পরান্নভক্ষণং নিত্যং পতিতং কুরুতে নরম্।।
“সমুদ্রযাত্রা, গোহত্যা, বিদেশে বাস এবং নিত্য পরের অন্ন ভোজন — এই চারটি মানুষকে পতিত করে।”
বঙ্গের সভ্যতা ছিল সমুদ্রনির্ভর — তাম্রলিপ্ত (আজকের তমলুক), গঙ্গারিডি প্রভৃতি বন্দর থেকে শ্রীলঙ্কা, বর্মা, জাভা, চিন পর্যন্ত বাণিজ্য চলত। পরাশরের এই বিধান সেই সামুদ্রিক পরিচয়কেই পতনের কারণ বানিয়ে দেয়। এ যেন বঙ্গের অর্থনৈতিক শক্তিকে শাস্ত্রীয় অপবিত্রতায় রূপান্তরিত করার একটা রণকৌশল।
কাজেই, এটা পষ্ট হয়ে উঠছে যে বৌধায়ন থেকে মনু — সবাই একটাই কেন্দ্র-প্রান্ত বিভাজন তৈরি করেছেন: কেন্দ্র = আর্যাবর্ত (কুরু-পঞ্চাল, গাঙ্গেয় সমভূমির পশ্চিমাংশ); প্রান্ত = বঙ্গ, পুণ্ড্র, কলিঙ্গ, অঙ্গ। এই বিভাজন স্রেফ জাতিগত নয়, বরং ভৌগোলিক ও মতাদর্শিক।
কিন্তু কেন? কয়েকটা কারণ উল্লেখ করা যেতেই পারে।
১। বঙ্গের অর্থনীতি সমুদ্রনির্ভর, অথচ ব্রাহ্মণ্য বিধানে সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ — ফলে বঙ্গের আর্থিক ভিত্তিটাই ‘অপবিত্র’ হয়ে যায়।
২। বঙ্গে বৈদিক যজ্ঞতন্ত্রের বদলে তান্ত্রিক, শাক্ত ও লোকায়ত ধর্মাচার ছিল প্রবল — ব্রাহ্মণ্য গোঁড়ামির চোখে সেটাই ‘ধর্মহীনতা’র সামিল।
৩। গঙ্গারিডি, পুণ্ড্রবর্ধন, তাম্রলিপ্তের মতো শক্তিশালী রাজ্য কুরু-পঞ্চালের আধিপত্য মানেনি — দিগ্বিজয়ের আখ্যানে তাদের ‘বিজিত’ দেখানো ছিল সেই স্বাধীনতাকে অস্বীকার করার উপায়।
দুই (খ)।। “আমরা”— “ব্রাত্য, মন্ত্রহীন”
আরো খানিক গভীরে যাওয়া যাক।
সমোস্কৃতে একটা শব্দ আছে—“ব্রাত্য”।
ব্রাত্য শব্দটি এসেছে “ব্রত” থেকে। সেই “ব্রত”-এর সদস্যই ব্রাত্য, মূলধারা যাকে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়, যার ফলে তৈরি হয় “অন্য-ব্রত”-এর দল—যাকে বলে বেগানা। Böhtlingk-Roth অভিধান (Grosses Petersburger Wörterbuch) সংজ্ঞার্থ দিচ্ছেঃ ভ্রাম্যমাণ দলের সদস্য, যাযাবর, ব্রাহ্মণ্য বলয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন। কিন্তু এই একটি সংজ্ঞায় ব্রাত্যের সমগ্র জটিলতা ধরা পড়ে না — বিভিন্ন কালের বিভিন্ন বইপত্তরে শব্দটির অর্থ পরস্পরবিরোধী।
এই শব্দের মানেতত্ত্বের ক্ষেত্রে মূলত তিনখানা স্তর নজরে আনা যায়।
প্রাথমিক স্তর বোঝা যাক আগে। অথর্ববেদের পঞ্চদশ কাণ্ড — যা ব্রাত্যকাণ্ড নামে পরিচিত — সম্পূর্ণরূপে ব্রাত্যদের জন্য উৎসর্গিত। এখানে ব্রাত্য একটি রহস্যময় যোদ্ধা-সন্ন্যাসী চরিত্র। এই একব্রাত্য রুদ্রের সাথে সরাসরি সমীকৃত — পূর্বমুখী, ধনুর্ধারী, পাশুপতের সঙ্গী। ঋগ্বেদের কেশিন বা মুনিদের মতোই — অরণ্যবাসী, অপ্রচলিত আচার পালনকারী — কিন্তু মূলত ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী নন। তারা একটি আলাদা ধর্মীয় প্রবাহের ধারক — প্রোটো-শৈব, রুদ্রকেন্দ্রিক — যা পরবর্তী শৈবধর্মের আদি পূর্বসূরি।
আরেক স্তরে এসে মনুস্মৃতি, বৌধায়ন ধর্মসূত্র ও যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে ব্রাত্য শব্দটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানে নিয়েছে। এখানে ব্রাত্য সেই ব্যক্তি যার নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যে উপনয়ন হয়নি। মনুস্মৃতি ২.৩৯-এ স্পষ্ট বিধান: নির্ধারিত বয়স পেরিয়ে গেলে তিন বর্ণের দ্বিজ সাবিত্রীবর্জিত ব্রাত্যে পরিণত হয়। সায়ণাচার্য তাঁর অথর্ববেদ-ভাষ্যে লিখেছেন—
বৃতাত্যো নাম উপনয়নাদিসংস্কারহীনঃ পুরুষঃ।
সোঽর্থাদ্ যজ্ঞাদিবেদবিহিতাঃ ক্রিয়াঃ কর্তুং নাধিকারী।
অর্থাৎ, “ব্রাত্য হলো সেই ব্যক্তি যার উপনয়নাদি সংস্কার হয়নি, এবং ফলত সে বৈদিক যজ্ঞকর্মের অধিকারী নয়।”
এই তৃতীয় স্তরে যে কোনো না-বামনাই জনগোষ্ঠী — বিশেষত পূর্বদেশীয় লোক যারা উপনয়ন পালন করত না বা পারেনি — তারা এক লপ্তে ব্রাত্য হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকে। এই দৃষ্টিতে বঙ্গ, পুণ্ড্র, কলিঙ্গের বিশাল জনগোষ্ঠী ব্রাত্য শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। প্রসঙ্গত, এই প্রাচ্য দেশে গেলেই সিন্ধু-হিন্দু দ্বিজদের ফিরে এসে ব্রাত্যস্তোম যজ্ঞের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্ত করতে হত।
Heesterman ১৯৬২-তে লিখেছিলেন, ব্রাত্য সমস্যাটি বৈদিক গবেষণার সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। এই নানা মুনির নানা মত একটু দেখে নেওয়া যাকঃ
• J.W. Hauer, Der Vrātya (১৯২৭): ব্রাত্যদের মধ্যে একটি অ-ব্রাহ্মণীয় আর্যভাষী গোষ্ঠী দেখেছেন, যাদের উপাসনার কেন্দ্রে রূদ্র — এবং ইন্দো-ইউরোপীয় Männerbund বা পুরুষ-যোদ্ধা-সংঘ ঐতিহ্যের সাথে সংযোগ টেনেছেন।
• J.C. Heesterman, Vrātya and Sacrifice (Indo-Iranian Journal, ১৯৬২): ব্রাহ্মণ্য orthopraxy-র ভেতর থেকেই ব্রাত্যকে বোঝার চেষ্টা করেছেন; তাদের “betwixt and between” — এক liminal (চৌকাঠ) অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যারা ধর্মীয় ও সামাজিক উভয় কাঠামোর বৈশিষ্ট্য বহন করে অথচ কোনোটিতেই সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্ত নয়। উল্লেখ্য, Hauer-এর মতো Heesterman-ও ব্রাত্যদের রুদ্রের সাথে সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
• Pontillo, Dore ও Hock সম্পাদিত Vrātya Culture in Vedic Sources (DK Publishers, ২০১৬) — ষোড়শ বিশ্ব সংস্কৃত সম্মেলন (ব্যাংকক, ২০১৫) থেকে নির্বাচিত নয়টি নিবন্ধের সংকলন। এতে ঋগ্বেদের প্রথম, অষ্টম ও দশম মণ্ডলে এবং Johannes Bronkhorst-এর “Greater Magadha” সাংস্কৃতিক জগতে (যেখান থেকে বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম তৈরি হয়েছে) ব্রাত্য-ঐতিহ্যের চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
অথর্ববেদে ব্রাত্যদের মহিমান্বিত করা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তী স্মৃতিশাস্ত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশ প্রতিকূল হয়ে উঠেছে— এটি ব্রাহ্মণ্য কাঠামোর একটি ঐতিহাসিক গতিপরিবর্তনের প্রতিফলন।
ওদিকে ব্রাত্যস্তোম যজ্ঞ ব্রাত্যদের জন্য বিহিত একটি বিশেষ সোমযজ্ঞ। দুটি স্তরে এটি পাওয়া যায়।
স্তর ১ — পাঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণের ব্রাত্যস্তোম:
বিস্তারিত বিবরণ পাঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণের (সামবেদের তাণ্ড্য ব্রাহ্মণ) সপ্তদশ অধ্যায়ের ১৭.১-৪ বিভাগে। এখানকার frame tale বলছে: দেবতারা স্বর্গে চলে গেলেন, তাদের অনুগামী গণেরা পেছনে রয়ে গিয়ে ব্রাত্যের জীবন কাটাতে লাগলেন — এই পৌরাণিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে ব্রাত্যদের অবস্থানকে কসমোলজিক্যালভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
স্তর ২ — স্মৃতিশাস্ত্রের ব্রাত্যস্তোম:
কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র (১২.১.২ ও ২২.৪.১) এই যজ্ঞকে একটি “একাহ” অর্থাৎ এক-দিবসীয় সোমযজ্ঞ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি (১.৩৮) ও গৌতম ধর্মসূত্রেও এর উল্লেখ আছে। Monier-Williams-এর অভিধান অনুযায়ী, এটি সেই বিশেষ যজ্ঞ যা সংস্কার-বিলম্বের কারণে হারানো দ্বিজত্বের অধিকার পুনরুদ্ধার করতে সম্পন্ন করা হয়। R. Pandey-র বিশ্লেষণ আরও স্পষ্ট: শাস্ত্র অনুযায়ী যজ্ঞ না করার কারণে বহিষ্কৃত ব্যক্তিরাও এই যজ্ঞ সম্পাদনের মাধ্যমে আর্য সমাজে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য হতেন। যজ্ঞটি “একাহ” সোম-প্রেষণ পদ্ধতিতে সম্পন্ন, স্তোম-সংখ্যা পাঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণে নির্দিষ্ট, এবং মরুৎদের উদ্দেশে আহুতি প্রদান এর বৈশিষ্ট্যমূলক অংশ।
এই পুরো ব্রাত্য-ব্রাত্যস্তোমের কাঠামোখানা বঙ্গের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.২.১৪-এ বঙ্গ-ভ্রমণকারীর জন্য যে পুনস্তোম বা সর্বপৃষ্ঠা ইষ্টির বিধান দেওয়া হয়েছে, সেটি আসলে ব্রাত্যস্তোমেরই একটি সমগোত্রীয় প্রায়শ্চিত্ত-বিধি। বঙ্গে যাওয়া মানে ব্রাত্যদের মধ্যে প্রবেশ করা — ফলে ফিরে এসে পুনরায় ব্রাহ্মণ্য সমাজে প্রবেশের জন্য শুদ্ধিযজ্ঞ অনিবার্য।
বঙ্গের জনগোষ্ঠী কেন ব্রাত্য? বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সূত্র থেকে তিনটি কারণ মিলছেঃ
১. তারা উপনয়ন-সংস্কার ছাড়া বড় হত অথবা ভিন্ন আচার পালন করত।
২. তারা সমুদ্রযাত্রা করত — যা ব্রাহ্মণ্য বিধানে সামাজিক পতনের কারণ।
৩. তারা রূদ্র-শিব (এই দুই দেবতাকে অনেকসময় এক করে দেখা হলেও আদতে আলাদা; শিবের উল্লেখ বেদ-এ পাওয়া যায়না) ও তান্ত্রিক উপাসনা করত — যা আশ্চর্যজনকভাবে অথর্ববেদের আদি ব্রাত্যদের ধর্মীয় চরিত্রের সঙ্গেই মিলে যায়।
এইখানেই ইতিহাসের গভীর বিদ্রূপটা — অথর্ববেদের ব্রাত্যরা রুদ্রের সঙ্গী, ধনুর্ধারী যোদ্ধা-সন্ন্যাসী, সেই গ্রন্থে মহিমান্বিত। আর সেই একই সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী বাংলার মানুষই পরবর্তী ধর্মশাস্ত্রে “সংকীর্ণযোনি” ও “অশুদ্ধ”। একই শিকড়, দুটি বিপরীত মূল্যায়ন।
Pontillo ও Dore-এর (২০১৬) পর্যবেক্ষণটা এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক: ব্রাত্য-ঘটনা কোনো একক সত্তা নয়, এটি একটি অস্থির সার্বভৌমত্বের ধারণার সাথে যুক্ত — কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে একবার মহিমান্বিত করে, আরেকবার
“পতিত” ঘোষণা করে নিয়ন্ত্রণে আনবার চেষ্টা করা হয়। এটি কেবল শাস্ত্রীয় স্ববিরোধ নয় — বৈদিক ব্রাহ্মণ্য কেন্দ্রের পূর্বদিকে বিস্তারের সাথে সাথে ক্ষমতার মানচিত্র পরিবর্তনের আরেক মতাদর্শগত দলিল।
| বিষয় | অথর্ববেদ (প্রাচীন) | স্মৃতিশাস্ত্র (পরবর্তী) |
| ব্রাত্য কে | রহস্যময় যোগী-যোদ্ধা, রুদ্রের সঙ্গী | উপনয়নহীন বর্ণচ্যুত ব্যক্তি |
| মর্যাদা | উচ্চ, দেবতুল্য | নীচ, প্রায়শ্চিত্তযোগ্য |
| ব্রাত্যস্তোম | ব্রাত্যদের মহিমা-স্তোত্র | ব্রাত্যত্ব থেকে “মুক্তি”র যজ্ঞ |
| বঙ্গের প্রাসঙ্গিকতা | বঙ্গের প্রোটো-শৈব, তান্ত্রিক সংস্কৃতি = আদি ব্রাত্য-ঐতিহ্য | বঙ্গবাসী = ব্রাত্য = অশুদ্ধ |
দুই (গ)।। “পাঁচটি অ-পবিত্র অঞ্চল”-এর বামনাই কাঠামো
ব্রহ্মপুরাণের ভূগোলখণ্ডে যে তালিকা আছে, সেটি আসলে একটি বৃহত্তর ব্রাহ্মণ্য কাঠামোর অংশ — যেখানে গোবলয়ের বাইরের এলাকাগুলোকে “অনার্য” বা “ম্লেচ্ছদেশ” বলা হয়। এই কাঠামোয় বঙ্গ একা নয় — পুণ্ড্র, সুহ্ম, কলিঙ্গ, অঙ্গ — প্রত্যেকটা জায়গাই কোনো না কোনো নিন্দাসূচক পদ পেয়েছে।
বৌধায়ন ধর্মসূত্রের (১.১.২.৪) বিখ্যাত পংক্তিটি — যেখানে পুণ্ড্র-বঙ্গ অঞ্চলে যাওয়া নিষিদ্ধ এবং সেখান থেকে ফিরলে প্রায়শ্চিত্তের নির্দেশ — তার সাথে “বায়ংসি” নিন্দার সংযোগ বোঝাতে হলে বুঝতে হবে যে এটি একটি পদ্ধতিগত বর্জনতন্ত্রের অংশ, নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
এই বর্জনতন্ত্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি হল পশ্চিম ভারত থেকে ব্রাহ্মণ্য সম্প্রসারণের ক্রমধারায় পূর্বের জনগোষ্ঠীগুলিকে “অপবিত্র” বলে চিহ্নিত করা, যাতে তাদের সঙ্গে বৈবাহিক ও সামাজিক সম্পর্ক এড়ানো যায় এবং তাদের ভূমি ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে যায়।
আমরা যদি এতোই অপবিত্র, অচ্ছুত তাহলে কেন বাপু, হে ভাজপা, “মারি অরি পারি যে কৌশলে”–নীতি নিয়ে বাংলা-দখল করে আহ্লাদিত হচ্ছো?
এখানেই আসে অন্যব্রতদের বৈদিকীকরণ, আর্যীকরণ তথা সংস্কৃতায়নের প্রক্রিয়ার প্রয়াস, যা কিনা খ্যামতাতন্তর বিস্তারেরই একাধিক প্রয়াস।
দুই (ঘ)।। সমকালে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ বিষয়ক ঘেন্নাভরা কথাবার্তাঃ আমরা কি তবে স্রেফ “ঘুসপেটিয়া”?
১. “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা থাকলে রাজ্যে বিস্ফোরণ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ঘটবে।” — অমিত শাহ, রাজস্থানের মেওয়ার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮। [Hindustan Times/PressReader, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮]
২. “অনুপ্রবেশকারীরা উইপোকার মতো। তারা গরিবদের খাবার খেয়ে নিচ্ছে, আমাদের চাকরি নিচ্ছে।” — অমিত শাহ, রায়গঞ্জ, পশ্চিমবঙ্গ, ১১ এপ্রিল ২০১৯। [Asian Age, ১১ এপ্রিল ২০১৯; Business Standard, ১১ এপ্রিল ২০১৯]
৩. “বাংলা ভাষায় জনগণনায় মাতৃভাষা লিখলে আসামে বিদেশিদের সংখ্যা পরিমাপ করা সম্ভব হবে।” — হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, গুয়াহাটি প্রেস কনফারেন্স, ১০ জুলাই ২০২৫। [সংবিধানের অষ্টম তফসিলে স্বীকৃত বাংলা ভাষাকে সরাসরি “বিদেশির ভাষা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এই উক্তিতে।] [Scroll.in, ১১ জুলাই ২০২৫; Deccan Herald, ১০ জুলাই ২০২৫; Barak Bulletin, ১৩ জুলাই ২০২৫]
৪. “যে কোনোভাবে যে যতটা পারেন কষ্ট দিন। রিকশায় ভাড়া যদি ৫ টাকা হয়, ৪ টাকা দিন। কষ্ট পেলে তবেই তারা আসাম ছেড়ে যাবে… হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ও বিজেপি সরাসরি মিয়াদের বিরুদ্ধে। আমরা কিছু লুকাচ্ছি না। আগে মানুষ ভয় পেত; এখন আমি নিজেই মানুষকে কষ্ট দিতে উৎসাহ দিচ্ছি।” — হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, দিগবই, তিনসুকিয়া, আসাম, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬। [‘মিয়া’ — আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের প্রতি প্রযুক্ত অবমাননাকর শব্দ।] [The Wire, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬; Hindutva Watch; PUCL বিবৃতি, মার্চ ২০২৬]
৫. “আমি ক্ষমতায় থাকলে মিয়ারা কষ্ট পাবেই। এখানে তারা শান্তিতে থাকতে পারবে না। কষ্ট দিলে তবেই তারা চলে যাবে।” — হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, গোয়ালপাড়া, আসাম, ফেব্রুয়ারি ২০২৬। [News9Live, ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬; Outlook India, মার্চ ২০২৬]
৭. “আমি সারাজীবনে তাদের ডিপোর্ট করতে পারব না। তাই আমি ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছি, যাতে তারা নিজেরাই চলে যায়।”— হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, Aaj Tak-এর ‘পঞ্চায়েত আসাম’ অনুষ্ঠান, ১২ মার্চ ২০২৬। [The Wire, ১৪ মার্চ ২০২৬; Outlook India, মার্চ ২০২৬]
৮. “Sylheti ভাষা কোনো Bengali বোঝে না। ‘Bengali’ বলতে ethnicity বোঝায়, ভাষাগত ঐক্য নয়। দিল্লি পুলিশ যখন ‘Bangladeshi language’ বলেছে, এটি বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার shorthand।”— অমিত মালব্য, X-পোস্ট, ৩-৪ আগস্ট ২০২৫। [ভাষাবিজ্ঞানীরা এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।] [The Quint, আগস্ট ২১, ২০২৫; Outlook India, আগস্ট ৪, ২০২৫; Alt News, আগস্ট ৮, ২০২৫]
৯. একটা আপিসি চিঠির বিষয় দেখুন: “Translation of documents containing text written in Bangladeshi language — regarding…”। — ইন্সপেক্টর অমিত দত্ত, লোধি কলোনি থানা, দিল্লি পুলিশ; বঙ্গ ভবন, নয়াদিল্লিকে লেখা সরকারি চিঠি, ২৪ জুলাই ২০২৫। [বাংলা ভারতের সংবিধান স্বীকৃত ২২টি ভাষার একটি। দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন।] [Deccan Herald, আগস্ট ৩, ২০২৫; Tribune India; National Herald India; The Federal, আগস্ট ৩, ২০২৫]
১০. “বাংলাদেশ থেকে অনেক রাক্ষস এসেছে। এই রাক্ষসদের মেরে ফেলতে হবে।” — গিরিরাজ সিং, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী; পূর্ণিয়া, বিহার, আগস্ট ২৫, ২০২৫। [Al Jazeera, অক্টোবর ৮, ২০২৫; The Business Standard/TBS News, অক্টোবর ২০২৫; CJP Report, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৫]
দুই (ঙ)।। সাম্প্রতিক বাঙালি হেনস্থার হিসেব-নিকেশঃ এক নজরে
সংখ্যা ঘেঁটে-ঘুঁটে দেখলেই বোঝা যায় এসব ঘেন্নাভরা বাক্যস্রোত, গালিগালাজ ইত্যাদি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান প্রকল্পের এক ধারাবাহিক পরিকল্পনা।
২০২৪ সালে India Hate Lab — ওয়াশিংটনের Center for the Study of Organized Hate (CSOH)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি নজরদারি প্রকল্প — সারা ভারত জুড়ে মোট ১,১৬৫টি ঘেন্নাজবানির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যা ২০২৩ সালের ৬৬৮ থেকে ৭৪.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ১৮২টি ঘটনায় সরাসরি “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” তকমা ব্যবহার করে বাঙালিদের নিশানা করা হয়েছে — অর্থাৎ মোট ঘটনার ১৫.৬%। আরও উদ্বেগের বিষয়, সেই বছর মোট ২৫৯টি ঘটনায় সরাসরি হিংসার সপক্ষে আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ঘেন্নাজবানির সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে দিল্লি, বিহার, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে। ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে — সেই বছর মোট ঘটনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৩১৮-তে, এবং “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” তকমা ব্যবহার করে বাঙালি মুসলমানদের লক্ষ করা ঘটনার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৯২। [India Hate Lab / CSOH, ফেব্রুয়ারি ২০২৫; জানুয়ারি ২০২৬]
রাস্তা-ঘাটে কী ঘটেছে সেটা আরও স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গ অভিবাসী কল্যাণ পর্ষদের চেয়ারম্যান সামিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র দশ মাসে ১,১৪৩টি হয়রানির অভিযোগ জমা পড়েছে, সবই বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলো থেকে। ওই পর্ষদ সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে বাংলায় কথা বলে বা বাংলায় নথিপত্র রাখে — শুধু এই কারণেই শত শত বাঙালি শ্রমিককে যথেচ্ছভাবে আটক করা হচ্ছে, জিজ্ঞাসাবাদের মাঝে তাদের মারধর করা হচ্ছে, এবং কেউ কেউ পরে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণিত হওয়ার পরও ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও নয়টি রাজ্যকে নোটিশ পাঠিয়েছে — ওড়িশা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, হরিয়ানা ও পশ্চিমবঙ্গ। [পশ্চিমবঙ্গ অভিবাসী কল্যাণ পর্ষদ, ডিসেম্বর ২০২৫; Deccan Herald, আগস্ট ২০২৫; Tribune India]
সীমান্তের ছবিটা আরো ভয়ঙ্কর। বাংলাদেশের সংবাদপত্র প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র আট মাসে ২,৪৭৯ জনকে ভারত থেকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BGB) তাদের মধ্যে কমপক্ষে ১২০ জনকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেছে — অর্থাৎ তারা যাওয়ার আগেই বাংলাদেশি ছিলেন না। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজে X-এ ঘোষণা করেছেন: “Assam is not your breeding ground” — এবং এই push-back-কে উন্নয়নের সাফল্য হিসেবে উদযাপন করেছেন। [Prothom Alo, উদ্ধৃত The Wire, মে ২০২৬; Deccan Herald; The Quint]
অথচ এইসব বর্ডার-“রক্ষা”র দায়ভার কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের আওতায় পড়ে। তাহলে?
অন্তত দুটি নথিভুক্ত হত্যাকাণ্ডে এই ঘেন্না-রাজনীতির সরাসরি প্রমাণ মিলেছে।
১৭ জুলাই ২০২৫: আসামের গোয়ালপাড়ায় পাইকান রিজার্ভ ফরেস্টে উচ্ছেদ-বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ১৯ বছরের সাকোয়ার আলি নিহত হন। তার পরিবারের ১,০৮০টি মুসলিম পরিবারের সাথে বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল পাঁচ দিন আগে। South Asia Justice Campaign-এর হিসাবে, এটি ২০১৬ সাল থেকে আসামের উচ্ছেদ-অভিযানে এই ধরনের অষ্টম হত্যা। [The Wire, ১৭ জুলাই ২০২৫; Scroll.in; ThePrint; South Asia Justice Campaign, ২০২৫ বার্ষিক প্রতিবেদন]
২৪ ডিসেম্বর ২০২৫: ওড়িশার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদের সুতি থানার বাসিন্দা ১৯-২০ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি শ্রমিক শেখ জুয়েল রানাকে একদল লোক “বাংলাদেশি” বলে চিহ্নিত করে তার নিজের ঘরে ঢুকে পিটিয়ে হত্যা করে। Alt News-এর তদন্তে দেখা গেছে, তিনি আদর্শ ভাবে আধার কার্ডসহ একজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড ২০২৫ সালের জুন-জুলাই থেকে শুরু হওয়া বাঙালি শ্রমিকদের উপর ধারাবাহিক হামলার একটি পর্যায়মাত্র। [Alt News, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫; The Wire, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫; Ground Xero, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫; Deccan Herald]
এইসব শুনে-দেখেই হঠাৎ করে যেন আমাদের বাঙালি-সত্তা জেগে উঠলো।
জোর ঝটকা জোরেই এসে লাগলো। আমাদের কিনা “বং” বলে নিন্দার্থে?
গোপাল ভাঁড়ের একটা গপ্পো মনে পড়লো।
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময় একজন আসেন, যিনি একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারেন। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষাটা কী, সেটাই কেউ ধরতে পারছে না। সেই ভদ্রলোকের আসল ভাষা কী, সেটা জানার জন্য গোপালকে দায়িত্ব দেওয়া হল। গোপাল কী করতে পারে? লোকটা যখন রাজসভায় ঢুকছে, তখন তাকে গোপাল জোরে ধাক্কা দিল। ধাক্কা দেওয়াতে, লোকটি চেঁচিয়ে বলে উঠল, “ষড়া অন্ধা আছি?!”।
একান্ত “নিজের” ভাষা কেবল ধাক্কা খেলেই বেরিয়ে আসে। আমাদের ক্ষেত্রেও কি তেমন কিছু ঘটতে চলেছে, বা ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে?
আরেকরকম ব্যাপার দেখুন। “শ্রীকান্ত”-র আখ্যানে ঘাপটি মেরে থাকা বাঘ যে আদতে ছিনাথ বহুরূপী, সেটা জানবার পর মারাত্মক ভয় যখন ভেঙে যায়, তখন শ্রীকান্তর পিসেমশাই হঠাৎ করেই হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করেন।
“অকস্মাৎ পালোয়ান কিশোরী সিং ‘উহ বয়ঠা‘ বলিয়াই একলাফে একেবারে বারান্দার উপর। (…) সেই ঘরের ভিড়ের মধ্য হইতে পিসেমশায়ের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর আসিতে লাগিল—সড়কি লাও—বন্দুক লাও। আমাদের পাশের বাড়ির গগনবাবুদের একটা মুঙ্গেরী গাদা বন্দুক ছিল; লক্ষ্য সেই অস্ত্রটার উপর। ‘লাও’ত বটে, কিন্তু আনে কে? ডালিম গাছটা যে দরজার কাছেই; এবং তাহারই মধ্যে যে বাঘ বসিয়া! হিন্দুস্থানীরা সাড়া দেয় না—তামাশা দেখিতে যাহারা বাড়ি ঢুকিয়াছিল, তাহারাও নিস্তব্ধ। (…) বেশ করিয়া দেখিয়া ইন্দ্র কহিল, দ্বারিকবাবু, এ বাঘ নয় বোধ হয়। (…) পিসেমশাই মহাক্রোধে হুকুম দিলেন, শালাকো কান পাকাড়কে লাও! (…) ভট্চায্যিমশাই তাহার পিঠের উপর খড়মের এক ঘা বসাইয়া দিয়া রাগের মাথায় হিন্দী বলিতে লাগিলেন, এই হারামজাদা বজ্জাতকে বাস্তে আমার গতর চূর্ণ হো গিয়া। খোট্টা শালার ব্যাটারা আমাকে যেন কিলায়কে কাঁটাল পাকায় দিয়া—।”
প্রভু পিসেমশাই কেন ভৃত্য কিশোরী সিংয়ের হিন্দিভাষায় কথা কইছেন? প্রভু কখন ভৃত্যের ভাষা রপ্ত করার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন? প্রভু-ভৃত্যের সম্পক্কের খতিয়ান আমাদের ধরতেই হবে।
ভৃত্য আবার কখনো কি প্রভুর চাপিয়ে দেওয়া ভাষায় কথা বলতেও বাধ্য হয়?
তিন।। নেশনের নেশার কিসসা
আজিকার হিঁদুরাষ্ট্রেও প্রভু-ভৃত্যের ডায়নামিকটা বড়োই আজব, উদ্ভট। এর কেন্দ্রে রয়েছে “imperative” বা নির্দেশের নামাবলী।
তুমি বলবে থালা বাজাতে, আমি তা’ করবো; তুমি বলবে আলো নিবিয়ে পোদিপ (অযোধ্যার মানুষজন পরিত্যক্ত প্রদীপের তেল জোগাড় করে রান্না করেছেন) জ্বালাতে, আমি তা’ করবো। তুমি মাতৃভাষা হিসেবে হিন্দিকে সাব্যস্ত করে আমাদের ওপর চালিয়ে দেবে, তুমি ফাতোয়া জারি করে বলবে “বন্দেমাতরম্” গাও আর দেশকে হিঁদু দেবী মনে করে পুজো-আচ্চা করো, “জয় শ্রী রাম” বলো— এসবও আমরা করবো, কেননা আমাদের মুন্ডু খারাপ হয়ে গেছে। মগজে কারফিউ-ই লাগেনি শুধু, বরং মগজটাকে অনেক ক্ষেত্রেই যেন গচ্ছিত রেখেছি এই নন-বায়ো-লজিকাল ৫৬’ইঞ্চি কিং লায়ারের পদতলে।
তুমি তো ভাই সংবিধানের রক্ষক, “চৌকিদার”—তুমি রাত আটটার সময় আদেশ দেবে আর দ্রুতগতিতে আমাকে সেটা পালন করতে হবে—এ কেমন একুশে আইন হে ডঙ্কাপতি?
ভাজপা এই নির্দেশ-চাপিয়ে দিয়ে যেসব কাজকম্মো করে চলেছে সেই ২০১৪ থেকে, তা আদতে সংবিধান-বিরোধী।
এখানে ক’টা প্রশ্ন পেড়ে ফেলা যাকঃ
স্বভূমিকে কেন “মা” বলি, কেনই বা তার বন্দনা করি?
কোনো এক ভাষাকেই বা কেন “মা”-ভাষা বলে ডাকি, কেনই বা তার বন্দনা করি?
আমাদের মনে পড়ে—স্বদেশীয়ানায় বীতশ্রদ্ধ সুখসায়রের এক জমিদার কি’সব যেন বলছেন। মন্তর-তন্তর চাপিয়ে চাগানো নেশার কথা। কাজেই, দেপ্রব আর আব-র পুনঃস্মরণের প্র্যাক্সিস থামলো না। আমরা এবার ঘরে বাইরে পড়তে শুরু করলাম।
আপাতত আগে বলা প্রশ্নগুলোর সূত্র ধরে একটা বিশেষ নির্দেশ তথা আদেশ নিয়েই আমরা আলাদা করে কথা কইবো— বন্দেমাতরম্।
হিঁদুবাদীগুলো বলে কিনা, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (ইস্কুল-মাদ্রাসা-কেরেশচান মিশনারি ইস্কুল) বাধ্যতার সঙ্গে গাওয়া হবে “বন্দেমাতরম্”। এ তো মহা আপদ! খামোখা এমন করতে যাবো কেনো?
বঙ্কিম-“দা”, দেখো, আমরা তোমাকে শ্রদ্ধা করি। তোমার প্রবন্ধ পড়ি। কিন্তু ওই “আনন্দমঠ”-এ এসে আজ আমি আটকে যাই। মনে হতে থাকে, কী বিশাল সব্বোনাশ করেছে এই উপন্যাস। কোনো সন্দেহই নেই, যে এটা এখন সঙ্ঘ পরিবারের (শিব্রাম কয়ে গেছেন, “সঙ্ঘ মানেই সাঙ্ঘাতিক”!) ধম্মো-কিতাবে পরিণত করা হয়েছে। এই মা-পুজোর জন্য মূল সমস্যাটা পেকেছিলো অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, শ্রীসঙ্ঘ কিংবা বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের মতোন দলগুলোকে নিয়ে, যেখানে বহু ক্ষেত্রেই গীতা ছুঁয়ে কালি মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে দেশসেবার শপথ নেওয়ানোর মতোন কাজকর্ম করিয়ে নেওয়া হতো। এখানে ধর্ম আপাতভাবে সে’সময়ে এক এসট্যাবলিশমেন্ট-বিরোধী, কাউন্টার-হেজিমোনিক ভূমিকা নিশ্চিতভাবে নিলেও, এই হিঁদু দেবী ইমেজারির আধিক্যের ফলে একটা গোটা সময় জুড়ে মুসলিম অংশগ্রহণ এসব বিপ্লবী দলগুলোতে কমে গেছিলো। মুসলিম সমাজের মধ্যে পারক্য তৈরি হয়েছিলো। তাকে ভুলি কিভাবে?
এই “বন্দেমাতরম্” গানের সূত্রে আরএসএস প্রার্থনা সঙ্গীতের প্রথম স্তবকটাও মনে এলোঃ
“নমস্তে সদা বৎসলে মাতৃভূমেত্বয়া হিন্দুভূমে সুখং বর্ধিতোহম্।
মহামঙ্গলে পুণ্যভূমে ত্বদর্থে
পতত্বেষ কায়ো নমস্তে নমস্তে।।”
এখানে খেয়াল করে দেখবেন “মাতৃভূমি” (= হিন্দুভূমি = পুণ্যভূমি?) কথাটা এবং সংস্কৃত ভাষায় গানটা লেখা/গাওয়া-র বিষয়টা। এই সেক্যুলার ভারতবর্ষ যেন ১৯২৫ সালেই পাড়ি দিলো অখণ্ড হিঁদু রাষ্ট্রের পরিকল্পনায়। এবং এই একই সময়ে ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির জম্মো। নেহাতই কি কার্যকারণহীন সমাপতন?
তা’হলে “বন্দেমাতরম্”? সেটায় আছে সংস্কৃত আর বাংলার অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। ভালো পদ্য বটে। তবে আরেকটা গান আমার বড়ো ভালো লাগে। খেলার মাঠে যখন সমবেত সুরে “আমার সোনার বাংলা” শুনি, তখন, মাইরি (<মা মেরী) বলছি, গায়ে কাঁটা দেয়। এই ভালোলাগার কারণে যদি আজ কেউ আমাদেরকে “বাংলাদেশী” বলেন, তাতে আমাদের কিসসুটি আসে যায় না।
কিন্তু, খটকা লাগলো এই বঙ্কিমদার লেখা “বন্দেমাতরম্”-এর তিন নম্বর স্তবকে এসেঃ
“সপ্তকোটীকন্ঠ-কল-কল-নিনাদকরালে
দ্বিসপ্তকোটীভুজৈধৃতখরকরবালে…”
এই সাত কোটির ব্যাপারটা কী? গানটা প্রথম লেখা হয় ১৮৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর। নানান রূপান্তরের পর ১৮৮২ সালে এসে ঠাঁই পায় ‘আনন্দমঠ’-এ। ১৮৮১ সালের আদম-ইভশুমারিতে দেখা যাচ্ছে ভারতের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৫ কোটি ৩৯ লাখ। এই তথাকথিত “সাত কোটি” তাহলে কারা? ১৮৮১ সালের জনগণনাতে বিরাট বাংলা প্রেসিডেন্সির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৯৫ লাখ। মনে রাখতে হবে, এই “বাংলা” মানে কিন্তু আজকের পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ নয়। তখনকার অবিভক্ত বাংলা প্রেসিডেন্সির মধ্যে পড়ত আজকের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, আর আসাম — এই গোটা এলাকাটা। সাত কোটির হিসেব এক্কারে খাপে খাপ।
তা’হলে তো এটা বাংলার গান—সমস্ত ভারতের (?) গান নয়। শক্তিপূজক বাঙালির মায়ের টান মারাত্মকঃ সুয্যি-চাঁদ বাঙালিদের কাছে মামা, চতুর শেয়াল ভাগ্নের মামা বাঘ। দায়ভাগী (পরে আলোচনা করছি এটা নিয়ে) বাঙালির সম্পত্তির হিসেবনিকেশে ভাগ্নেরও ভুমিকা আছে। তাই জন্যই তো, তাই তাই করে মামার বাড়ি গেলে মামী লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে। গোয়েন্দা গপ্পো পড়া আমি ভাবতে বসি— সম্পত্তির ভাগাভাগির ব্যাপার না থাকলে এমন বৈরিতা হয় নাকি? এই সম্পত্তির লোভেই তো সতীদাহ চালু করেছিলো কুলিন দায়ভাগীরা।
এই “মা”-এর ব্যাপারটা নিয়ে কিছু কথা এখানে উল্লেখ করা দরকার। দামোদর কোসাম্বি তাঁর “At the Crossroads: Mother Goddess Cult-Sites in Ancient India” (১৯৬০)-তে দেখাচ্ছেন যে কিভাবে বৈদিক ছেলে দেবতাদের দাপুটে উপস্থিতিতে মা-দেবীরা চতুর্মার্গের কোণায় চলে যাচ্ছেনঃ এক্কেরে কোনঠাসা অবস্থা। আবার দেখুন, মনসামঙ্গলে চাঁদ সদাগর বাঁ হাতে পুজো না দিলে মনসা “দেবী” হয়ে উঠতে পারতেন না। ওদিকে রাজা সুরথ আর বৈশ্য সমাধি মিলে চণ্ডীর পুজো করছেন। বুঝুন অবস্থা, সদাগর আর রাজার মিলনে কি তখনই ক্রোনি ক্যাপিটালিজম শুরু হয়ে গেসলো?
অথচ কোনো প্রাচীন ‘সনাতন’ (most oldest?!) লেখাপত্তরে দেশকে “মা” বলে ডাকবার, উপাসনা করবার কোনো কথা খুঁজে পাইনা। এটা খৃস্টানদের অবদান। খৃস্টান পুরুতরা যখন ভার্নাকুলারে কথা বলতেন, তখন থেকেই (অষ্টাদশ শতক শেষ নাগাদ) দেশ এবং ভাষাকে “মা” বলবার রীতি চালু হয় (ইভান ইলিচের ১৯৮১-র কাজ Shadow Work দেখুন; কিংবা দেখে নেওয়া যায় দেপ্রব বিরচিত “(M)Other Tongue Syndrome: From Breast To Bottle”. Kumar, R. ed. Studies in Sociolinguistics and Applied Linguistics, pp. 87-106. Centre of Advanced Studies in Linguistics: Booklinks)। অথচ এই খৃস্টান বা মুসলমানেরা নিজেরাই দেশকে “মা” বলে মনে করে না। কাজেই, মা-ভূমি ব্যাপারটাই বড্ডো ঘাঁটা।
কিন্তু যখন “মা-ভাষা” নিয়ে কথা বলি? আসলে ‘মাতৃভাষা’ বলে যে ধারণাটা আছে, তাও মা-ভূমির মতোই বেশ সমস্যাজনক। ৩০০ বছর আগেও আমাদের দেশে ‘মাতৃভাষা’ শব্দটার কোনও অস্তিত্ব ছিল না। ‘মাতৃভাষা’ শব্দটা উনিশ এবং বিশ শতকের বয়ানে ব্যবহৃত হয়েছে। এই শব্দটা নেওয়া হয়েছে মূলত গির্জের এক বিশেষ পরিভাষা থেকে। পাদ্রীরা লাতিন ভিন্ন অন্য যে ভাষায় কথা বলতেন, সেই ভাষাকে বলা হত “mother tongue”, আল্মা মেটারের (মা) বা ইস্কুলের ভাষা। চার্চ পাদ্রীদের পরিভাষাকে অনুসরণ করে আমরা আহৃত এবং বিকল্পিত একটি লব্জ বানিয়েছি, যেটা হল ‘মাতৃভাষা’। এই শব্দটাকে নিয়েই নানান খেলা চলে। এমনকি দুদ্দু শাহ পর্যন্ত লিখেছেন চমৎকার এক গানঃ
“মহম্মদের জন্ম যদি হত এদেশে,
বেহেস্তের কোন ভাষা হতো বলতো এসে।
মাতৃভাষা ত্যেজে সবাই,
আরবি ভাষা শিখলে রে ভাই
তাতে তাই ফয়দা তো নাই অবশেষে।”
এই প্রসঙ্গে আপনাদের হয়তো মনে পড়বে নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক ইজরায়েল ভ্রমণের কথা। সেদিনটা ছিলো আমাদের মতোন মানুষজনদের কাছে কালাদিন। গুজরাটের কসাই হাত মেলাচ্ছেন, কোলাকুলি করছেন ফিলিস্তিনের কসাই-এর সঙ্গে। উনিজি টেলিপ্রম্পটার-মারফৎ বলছেন “Israel is the fatherland and India is the motherland”। সমাসোক্তি অলঙ্কারে এই অ-প্রাকৃতের প্রকৃতিকরণ (Fallacy of misplaced concreteness) সব্বাইকে মানতেই হবে? একি মগের মুলুক পেয়েছো নাকি?
তিন (ক)।। “আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ…”
এসব খানিক ছেড়েছুড়ে এই অ-/দুঃ-সময়েই আমি নিখিলেশকে ডাকি, “আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ…”
নিখিলেশ পূর্বপরিকল্পিত দাঙ্গা থামাতে গিয়ে খুন হয়ে গেছে। তবু নিখিলেশের ভূত আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে—আমার সত্তার (ontos) মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়ে আমাকে haunt করছে। আমি Hauntology-র খপ্পরে পড়েছি।
তাই আসুন, আমরা বরং বিমলা আর নিখিলেশের কথাগুলোই শুনি, পড়ি, দেখি। “বন্দেমাতরম্”-মন্তরের নেশাকে (আর আগন্তুক ছবির মনমোহনের ভাষায় নেশা আর নাসা!) কেমন ঝেড়েছেন রবি ঠাকুর তাঁর অল্টার ইগো নিখিলেশকে দিয়ে, সেটা দেখি না হয়। মনে রাখবেন পাঠক, চরকা কাল্ট নিয়েও রবি ঠাকুর একই কথা কইছেন গাঁধিজির সঙ্গে তীব্র কাজিয়ায়।
বিমলার আত্মকথা (১) থেকেঃ
“অথচ স্বদেশী কাণ্ডর সঙ্গে যে আমার স্বামীর যোগ ছিল না বা তিনি এর বিরুদ্ধে ছিলেন তা নয়। কিন্তু “বন্দে মাতরম্” মন্ত্রটি তিনি চূড়ান্ত করে গ্রহণ করতে পারেন নি। তিনি বলতেন, দেশকে আমি সেবা করতে রাজি আছি, কিন্তু বন্দনা করব যাঁকে তিনি ওর চেয়ে অনেক উপরে। দেশকে যদি বন্দনা করি তবে দেশের সর্বনাশ করা হবে।” (নজরটান সংযোজিত)
নিখিলেশের আত্মকথা (১) থেকেঃ
“আজ সেই একই কারণ থেকে সে ভিতরে ভিতরে আমার উপরে রাগ করে উঠছে যখন দেখছে আমি ‘বন্দে মাতরম্’ হেঁকে চারি দিকে যা-ইচ্ছে তাই করে বেড়াই নে।
আজ সমস্ত দেশের ভৈরবীচক্রে মদের পাত্র নিয়ে আমি যে বসে যাই নি এতে সকলেরই অপ্রিয় হয়েছি। দেশের লোক ভাবছে আমি খেতাব চাই কিংবা পুলিসকে ভয় করি ; পুলিস ভাবছে ভিতরে আমার কু মতলব আছে বলেই বাইরে আমি এমন ভালোমানুষ। তবু আমি এই অবিশ্বাস ও অপমানের পথেই চলেছি। দেশকে সাদাভাবে সত্যভাবে দেশ বলেই জেনে, মানুষকে মানুষ বলেই শ্রদ্ধা করে, যারা তার সেবা করতে উৎসাহ পায় না, চীৎকার ক’রে মা ব’লে দেবী ব’লে মন্ত্র প’ড়ে যাদের কেবলই সম্মোহনের দরকার হয়, তাদের সেই ভালোবাসা দেশের প্রতি তেমন নয় যেমন নেশার প্রতি। সত্যেরও উপরে কোনো-একটা মোহকে প্রবল করে রাখবার চেষ্টা এ আমাদের মজ্জাগত দাসত্বের লক্ষণ। চিত্তকে মুক্ত করে দিলেই আমরা আর বল পাই নে। হয় কোনো কল্পনাকে নয় কোনো মানুষকে, নয় ভাটপাড়ার ব্যবস্থাকে আমাদের অসাড় চৈতন্যের পিঠের উপর সওয়ার করে না বসালে সে নড়তে চায় না। যতক্ষণ সহজ সত্যে আমরা স্বাদ পাই নে, যতক্ষণ এইরকম মোহে আমাদের প্রয়োজন আছে, ততক্ষণ বুঝতে হবে স্বাধীনভাবে নিজের দেশকে পাবার শক্তি আমাদের হয় নি। ততক্ষণ, আমাদের অবস্থা যেমনি হোক, হয় কোনো কাল্পনিক ভূত নয় কোনো সত্যকার ওঝা, নয় একসঙ্গে দুইয়ে মিলে আমাদের উপর উৎপাত করবেই।” (নজরটান সংযোজিত)
নিখিলেশের আত্মকথা (২) থেকেঃ
“ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি সন্দীপ হচ্ছে আইডিয়ার জাদুকর; সত্যকে আবিষ্কার করায় ওর কোনো প্রয়োজন নেই, সত্যের ভেলকি বানিয়ে তোলাতেই ওর আনন্দ। মধ্য-আফ্রিকায় যদি ওর জন্ম হত তা হলে নরবলি দিয়ে নরমাংস ভোজন করাই যে মানুষকে মানুষের অন্তরঙ্গ করার পক্ষে শ্রেষ্ঠ সাধনা এই কথা নূতন যুক্তিতে প্রমাণ করে ও পুলকিত হয়ে উঠত। ভোলানোই যার কাজ নিজেকেও না ভুলিয়ে সে থাকতে পারে না। আমার বিশ্বাস, সন্দীপ কথার মন্ত্রে যতবার নূতন-নূতন কুহক সৃষ্টি করে প্রত্যেকবার নিজেই মনে করে ‘সত্যকে পেয়েছি’, তার এক সৃষ্টির সঙ্গে আর-এক সৃষ্টির যতই বিরোধ থাক্।
যাই হোক দেশের মধ্যে মায়ার এই তাড়িখানা বানিয়ে তোলায় আমি কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারব না। যে তরুণ যুবকেরা দেশের কাজে লাগতে চাচ্ছে গোড়া থেকেই তাদের নেশা অভ্যাস করানোর চেষ্টায় আমার যেন কেনো হাত না থাকে। মন্ত্রে ভুলিয়ে যারা কাজ আদায় করতে চায় তারা কাজটারই দাম বড়ো করে দেখে, যে মানুষের মনকে ভোলায় সেই মনের দাম তাদের কাছে কিছুই নেই। প্রমত্ততা থেকে দেশকে যদি বাঁচাতে না পারি, তবে দেশের পূজা হবে দেশের বিষনৈবেদ্য, দেশের কাজ বিমুখ ব্রহ্মাস্ত্রের মতো দেশের বুকে এসে বাজবে।” (নজরটান সংযোজিত)
এই নেশা ধরানোর ব্যাপারটাই একটু ভালো করে বুঝে নিই, রক্তকরবী থেকে।
“ফাগুলাল। বিশুভাই, তোমার বেয়ান জানতে চায় আমরা মদ খাই কেন।
বিশু। স্বয়ং বিধির কৃপায় মদের বরাদ্দ জগতের চার দিকেই, এমন-কি, তোমাদের ঐ চোখের কটাক্ষে। আমাদের এই বাহুতে আমরা কাজ জোগাই, তোমাদের বাহুর বন্ধনে তোমরা মদ জোগাও। জীবলোকে মজুরি করতে হয়, আবার মজুরি ভুলতেও হয়। মদ না হলে ভোলাবে কিসে।
চন্দ্রা। তাই বৈকি। তোমাদের মতো জন্মমাতালের জন্যে বিধাতার দয়ার অন্ত নেই। মদের ভাণ্ড উপুড় করে দিয়েছেন।
বিশু। এক দিকে ক্ষুধা মারছে চাবুক, তৃষ্ণা মারছে চাবুক; তারা জ্বালা ধরিয়েছে, বলছে, কাজ করো। অন্য দিকে বনের সবুজ মেলেছে মায়া, রোদের সোনা মেলেছে মায়া, ওরা নেশা ধরিয়েছে, বলছে, ছুটি ছুটি।
চন্দ্রা। এইগুলোকে মদ বলে নাকি।
বিশু। প্রাণের মদ, নেশা ফিকে, কিন্তু দিনরাত লেগে আছে। প্রমাণ দেখো। এ রাজ্যে এলুম, পাতালে সিঁধকাটার কাজে লাগলুম, সহজ মদের বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গেল। অন্তরাত্মা তাই তো হাটের মদ নিয়ে মাতামাতি করছে। সহজ নিশ্বাসে যখন বাধা পড়ে, তখনই মানুষ হাঁপিয়ে নিশ্বাস টানে।
গান
তোর প্রাণের রস তো শুকিয়ে গেল ওরে,
তবে মরণরসে নে পেয়ালা ভরে।
সে যে চিতার আগুন গালিয়ে ঢালা,
সব জ্বলনের মেটায় জ্বালা,
সব শূন্যকে সে অট্ট হেসে দেয় যে রঙিন করে।” (নজরটান সংযোজিত)
এখানে মদের নেশার দুটো মানে পাচ্ছিঃ নিসর্গের নেশার ঘোর (ইতিবাচক মানেতে) আর মোদো মাতালের নেশা! নিসর্গের সঙ্গে শৃঙ্গারে যে আহ্লাদ আছে, সে আল্লাদিপনা কি যক্ষপুরীর বজ্র-আঁটুনিতে সম্ভব? সেখানে কি “সহর্ষ ঐচ্ছিক শ্রম” আছে আদৌ? সেখানে আছে শুধু প্রাতিস্বিক যন্তর-নাঃ মেশিন-ম্যানের দাপট (চার্লির The Great Dictator-ছবির শেষ বক্তিমে মনে করুন)। উৎপাদন-ক্রীড়া তখন ক্রিয়া হয়ে ওঠে—স্রেফ মালিকের জন্য ক্রিয়া। এখানেই তৈরি হয় শ্রমিকের পরম পারক্য, অনন্বয় তথা বিচ্ছিন্নতা (alienation)। তখনই তো মাল-টানার নেশায় লাঙলদধারী মাতাল “বলরামের চেলা” বনে যেতে হয়… পাগলা “বৃষ্টিনেশাভরা” সোন্ধেবেলাতেও আজকাল “আমার স্বপ্ন ঘিরে নাচে মাতাল জুটে—যত মাতাল জুটে।” এই গানটাতে যেন নিসর্গের নেশাই প্রমুখিত হচ্ছে। কিন্তু, যক্ষপুরে?
রক্তকরবী-র অধ্যাপক আরেক সূত্র ধরিয়ে দিচ্ছেনঃ
“সকালে ফুলের বনে যে আলো আসে তাতে বিস্ময় নেই, কিন্তু পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে যে আলো আসে সে আর-এক কথা। যক্ষপুরে তুমি সেই আচমকা আলো।” (নজরটান সংযোজিত)
এই হাঁসফাঁস বাতাবরণে আচমকা আলোই তো বিস্ময় জাগায়–“ভ্রমি বিস্ময়ে”-র নেশাই তো আদত নেশা! মহাবিশ্বে মহাকাশে জোয়ার-ভাঁটার ভুবনদোল তো এক্কারে নাড়িতে সেঁধিয়ে রক্তধারায় টান ধরিয়ে দেয়।
আজকের বাচ্চারা বোধহয় আর বিস্মিত হয় না। হয় কি?
কার্যগতিকে KT (খালাসিটোলা)-তে গিয়ে যে সুরাপান করি, তা মাক্ষালির ছবি (এখন আর মা কালীর ছবি দেখছি না) দেওয়া “বাংলা”। এখানেই আমার সোনার বাংলার উদ্দেশ্যে বলি— আমি মালের সাগর পাড়ি দেবো…!
শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত: চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
১৮৮৫, ২৪শে অক্টোবর
[ডাক্তার সরকার ও সর্বধর্ম পরীক্ষা (Comparative Religion)]
ডাক্তার — মহাদেব man in the maturity-কে examine করেছে। European-রা Embryo থেকে maturity পর্যন্ত সমস্ত stage দেখেছে। Comparative History সব জানা ভাল। সাঁওতালদের history পড়ে জানা গেছে যে, কালী একজন সাঁওতালী মাগী ছিল — খুব লড়াই করেছিল। (সকলের হাস্য) (নজরটান সংযোজিত)
এই সংলাপ পড়ে এখন আর কেউ হাসবে না। বরং পাল্টা হামলা করবে গোমুখ্যুর দল। অথচ, এটা রামকৃষ্ণ স্বয়ং হাসছেন। আরো বলি, রামপেসাদি গানে কালী কে “মাগী” বলার নমুনা আখছার।
তিন (খ)।। “দেবভাষা” সমোস্কৃতের গপ্পো
মা-ভাষা বা ভূমিই শুধু নয়, দেবতাদের ভাষা মানে সমোস্কৃতরও এক কুলুজির খোয়াব রচনা করা হলো।
“যুক্তি তক্কো আর গপ্পো” চলচ্ছবির সেই দৃশ্যটা মনে করুন। ছৌ-নাচে ওস্তাদ পঞ্চানন আর স্মৃতি-ঝাড়া জগন্নাথের মধ্যে হেব্বি ঝামেলা লেগেছে সংস্কৃতকে নিয়ে। পঞ্চাননের মতে, সমোস্কৃত বিদেশী, ম্লেচ্ছ ভাষা। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে সংস্কৃত ভাষায় কথা বলে কে? ওদিকে জগন্নাথ “মা”কে স্রেফ সরাসরি “মা” বলবার বদলে সমোস্কৃত শোলোক ঝাড়তে থাকেন, জননী, জঠরধারিনী ইত্যাদি বলে চলেন। সেখানে এই কাজিয়ার নিষ্পত্তি করে একটি মেয়ে, তার নাম আবার বঙ্গবালা। নচিকেতা যখন রাগের চোটে খাবার উল্টে দেয়, তখন যে গান গেয়ে ওঠা হয়, তাতেও মা-এর উপস্থিতি, “কেন চেয়ে আছো গো মা?”।
সেই মূহুর্তেই মনে পড়ে আরেকটি গানঃ
“কে এসে যায় ফিরে ফিরে আকুল নয়ননীরে ।
কে বৃথা আশাভরে চাহিছে মুখ’পরে ।
সে যে আমার জননী রে ।।
কাহার সুধাময়ী বাণী মিলায় অনাদর মানি !
কাহার ভাষা হায় ভুলিতে সবে চায় ।
সে যে আমার জননী রে ।।
ক্ষণেক স্নেহ-কোল ছাড়ি চিনিতে আর নাহি পারি ।
আপন সন্তান করিছে অপমান—
সে যে আমার জননী রে ।।
পুণ্য কুটিরে বিষণ্ণ কে বসি সাজাইয়া অন্ন ।
সে স্নেহ-উপচার রুচে না মুখে আর ।
সে যে আমার জননী রে।।”
এই অবহেলিতা “মা”-এর ভাষাকেই সংস্কৃতায়ন তথা বৈদিকায়ন করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে আজও। আর অন্যদিকে অপুষ্টিতে ভোগা মা— “পুণ্য কুটিরে বিষণ্ণ কে বসি সাজাইয়া অন্ন!” আমাদের দেশের সিংহভাগ মেয়েরা নিদারুণ অপুষ্টিতে ভোগে।
এখানে আরো কিছু বিষয় চলেই আসে। এক দিকে যেমন ছোট্টবেলা থেকেই ইংরেজিকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, আর অন্য দিকে সংস্কৃতকে “দেবভাষা” বলে শিক্ষার কেন্দ্রে বসানোর মরিয়া চেষ্টা—এই দুটোই ভারতবর্ষ নামক কল্পিত রাজনৈতিক ভূগোলের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। নেহরুর ভারত-নির্মাণ প্রকল্পে ইংরেজির জায়গা ছিল সব্বার আগে, আর হিঁদুত্ববাদীরা সেখানে সংস্কৃত না জেনে সংস্কৃতায়নের স্বপ্ন দেখেছেন বারেবারে। জনসংঘ থেকে শুরু করে আজকের সংঘ পরিবার পর্যন্ত, সংস্কৃতকে কেন্দ্রে রাখার ভাবনাটা যেন একরকম ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। তবে গান্ধী-লোহিয়া-রাহুল সাংকৃত্যায়নরা চেয়েছিলেন দেশজ, সমকালীন ভাষায় কথাবার্তা চলুক।
কিন্তু এই তিন-তিনখানা প্রস্তাবের কোনোটাই নিম্নবর্গের মানুষের কাছে আদতে পৌঁছায় না। ডি.পি. পট্টনায়ক দেখিয়েছেন, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত প্রতি পাঁচ-দশ মাইল অন্তর-অন্তর ভাষার হেরফের ঘটে — তবু মানুষ নিজেদের মধ্যে অনায়াসে কথা চালিয়ে যেতে পারছেন। নিচুতলার মানুষ নিজেরাই তৈরি করে নিচ্ছেন ঘরের ভাষা আর বাইরের ভাষার কাজ-চালানো তফাৎ। অনেকগুলো বহুভাষী কৌম বানিয়ে নিয়েছে Language for Wider Communication, যেমন নেফামিজ, সাদরি, নাগামিজ ইত্যাদি। কাজেই, বহুভাষিক দেশে একভাষিক “হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান”-এর দাবি তোলবার কোনো মানেই হয়না।
এখন কিছুটা আসা যাক সংস্কৃতের নানান শেকড়-বাকড়ের প্রসঙ্গে। সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে, অর্থাৎ দ্বিতীয় নগরায়নের সময়, পাণিনি তাঁর প্রাতিশাখ্যসূত্রে ভাষাটাকে ব্যাকরণের শক্ত খাঁচায় পুরে ফেললেন। সেই মুহূর্ত থেকে এটি হয়ে উঠল শুধু রাজা-ব্রাহ্মণদের ভাষা।
এই ইঞ্জিনিয়ার্ড ভাষাটাই সংস্কৃত। সাধারণ মানুষ যে ভাষায় কথা বলত, সেগুলো হল মূলত প্রাকৃতের নানান রূপ। বৌদ্ধধর্মের সম্রাট অশোক প্রচার চালিয়েছিলেন নানান প্রাকৃত ভাষাতেই। অশোকের পরেও নাটকের ক্ষেত্রে পাত্রের পরিচয় অনুযায়ী ভাষা ঠিক হত — শৌরসেনী ছিল মেয়েদের আর বিদূষকের ভাষা, মাগধী চোর-ছ্যাঁচোড়দের, গান হত মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতে। এই তথাকথিত সংস্কৃত নাটক আদতে বহুভাষিক নাটক। উপভোক্তা দর্শকদেরও অসুবিধে হতো না এ নাটক দেখতে-শুনতে।
কিন্তু ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা এমন এক ভাষা বানালেন যাতে নিম্নবর্গের মানুষ তা না বুঝলে, তারা সেই জ্ঞানভাণ্ডার থেকে চিরকাল বঞ্চিতই থাকবে — আর পরলোক-পুনর্জন্ম-ভূত-ভগবান, জাত-পাত জাতীয় কুসংস্কারগুলোও টিকিয়ে রাখা যাবে।
এভাবে সংস্কৃত অচল ও অনড় থেকে গেল, আর প্রাকৃত ভাষাগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হতে হতে পরিণত হল বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, রাজস্থানি, কাশ্মীরি, ওড়িয়া, অসমিয়া ইত্যাদি linguistic nation statist কল্পনায়–।
হিন্দুত্ববাদীরা প্রায়ই দাবি করেন, সংস্কৃত নাকি সব ভারতীয় ভাষার “মা”। এটা নিতান্তই মিথ্যে কথা। ভারতে মোট চারটি ভাষাগোষ্ঠী আছে — অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, ভোটচিনীয় এবং ভারতীয় “আর্য”/ইন্ডিক। সংস্কৃত কেবল ভারতীয় আর্য বা ইন্ডিক শাখার একটি ভাষা, কাজেই বাকি তিনটি গোষ্ঠীর ভাষার সাথে তার মা-মেয়ের কোনো সম্পর্কই নেই। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের The Origin and Development of the Bengali Language (ODBL)-এ স্পষ্ট দেখা যায়, বাংলার বিবর্তনে সংস্কৃতের কোনো প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি নেই — বরং প্রাকৃত এবং নানান অপভ্রংশ পার হয়েই বাংলার জন্ম। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও চমৎকার বলেছিলেন, বাংলা সংস্কৃতের মেয়ে নয়, বরং সংস্কৃত বাংলার “অতি-অতি-অতি-প্রপিতামহী”।
এই বাস্তবতায় যখন শিক্ষা কমিশন থেকে প্রস্তাব আসে যে বাংলাকে প্রথম ভাষা হিসেবে নেওয়া ছাত্রছাত্রীদেরও বাধ্যতামূলকভাবে সংস্কৃত পড়তে হবে (৫০ নম্বরের), তখন সেটা অবাক করার মতো বটেই। অনেকে মনে করেন সংস্কৃত না জানলে নাকি বাংলাই জানা যায় না — এই ধারণাটা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ভুল। ফার্দিনান্দ দ্য সোস্যুরের দাবাড়ু উদাহরণটা মনে করলেই বোঝা যায় — আগের চালগুলো না জেনেও নতুন চাল দেওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব। ৯৯.৯৯৯ শতাংশ বাঙালি সংস্কৃত না জেনেই বাংলায় কথা বলে চলেছেন। এই অবস্থায় বাংলা ব্যাকরণের মধ্যে সংস্কৃতের খিচুড়ি ঢুকিয়ে দেওয়ার মানে হল ছাত্রছাত্রীদের জোর করে এমন শব্দ গেলানো যা তারা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারই করে না — যেমন ‘পিতৃণ’ বা ‘নে + অন্ = নয়ন’-এর মতো বিদঘুটে সন্ধিবিচ্ছেদ।
আসল কথা হল, সংস্কৃতকে কেন্দ্রে রাখার এই রাজনীতি আসলে হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডারই অংশ — ভাষার মাধ্যমে একটি বিশেষ মিথ বা পৌরাণিক পরিচয় তৈরি করা এবং বহুভাষী, বহুসাংস্কৃতিক ভারতকে একটি কাল্পনিক “হিন্দু রাষ্ট্রের” ছাঁচে ফেলার চেষ্টা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জায়গার দেবভাষা সংস্কৃত নামকরণের মাতলামি সেটাই প্রমাণ করে।
চার।। “হিঁদু” কে বে’? কে বে’ “সনাতন”?
[চাদ্দিকে চাড্ডি, ডাফার, লুম্পেনদের অভ্যুত্থানে আমাদের ভাষাও এইরূপ মস্তানি ভাষা হয়ে গিয়েছে!]
আচ্ছা, এতোক্ষণ বারবার যে “হিন্দু”র কথা বলছি, সেটা আদতে কিরকম? কাকে বলি “হিন্দু”, “সনাতন” ব্যাপারটাই বা কী?
এই তথাকথিত হিঁদু সনাতন ধর্ম বলে যেটাকে হিঁদুত্ববাদের অ্যাজেন্ডার ভেতরে প্রত্যেকবার প্রাক-সিদ্ধভাবে ধরে নেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে মিলে-মিশে রয়েছে প্রচুর সম্প্রদায়, উপসম্প্রদায়, গোষ্ঠী, পন্থা, মার্গ ইত্যাদি। কিরকম? কয়েকটা বলছি। বৈষ্ণব, কত্তাভজা, নেড়ানেড়ি, শাক্ত, শৈব, বামাচারী, তান্ত্রিক ইত্যাদি ইত্যাদি (“বিদ্যাসাগর” চলচ্ছবিতে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহনের সংলাপ মনে পড়ে যায়)। এদের নিজেদের মধ্যেও আবার নানান ভাগাভাগি, এবং বিস্তর মিলের সঙ্গে হরেক ঝামেলাও রয়েছে। এই বহুত্বেরা কখনোই “এক” ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে থাকেনি, সেই বোধও তাদের হয়নি। অতএব, এদের মধ্যে কোনটাকে “ঠিক/প্রকৃত হিঁদু” হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে বা এগুলোকে বুলডোজার চালিয়ে জুড়ে দিলেই “হিঁদু ধর্ম” মিলে যাবে, এই ধরণের প্রবণতায় মাতলে প্রচুর ঝামেলা উপস্থিত হয়। তারপর আছে পোশাক-আশাক, পুজো-আচার-অনুষ্ঠান, প্রসাদ ইত্যাদির বিস্তর ফারাক। কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা খোলসা করে বোঝা যাক।
হিঁদুদের সম্পত্তি-সমর্পণের আইনে আছে মিতাক্ষরা আর দায়ভাগের ভাগাভাগি। মূলত গোবলয়ের লোকেরা মিতাক্ষরায় থিতু। আর পুবদিকের প্রদেশগুলোর হিঁদুরা দায়ভাগ অনুসরণ করে। মিতাক্ষরার নিয়ম হলো, সন্তান পেটে থাকতেই সম্পত্তির ভাগাভাগি পেয়ে যায়। ফলত, আয়কর বিভাগে কর দেওয়ার ব্যাপারটাও কমে যায়। অন্য দিকে, দায়ভাগে “কর্তা” না মরা অব্দি উত্তরাধিকার পাওয়া যায় না। এই নিয়ম তুলে দেওয়ার অনুরোধ বারবার করেছিল ভারতের আয়কর বিভাগ। সেটা শোনা হয়নি। তবে এ নিয়ে রাজা রামমোহন রায় সর্বপ্রথম এবং প্রধাণ কাজটা করে গেসলেন বহু আগেই।
একইভাবে প্রশ্ন উঠবে কামাখ্যার প্রসাদের (মোষবলি যেখানে “স্বাভাবিক” রীতি) সঙ্গে তিরুপতির প্রসাদের তুলনা করলে। তিরুপতির লাড্ডুতে গোরু ও শুয়োরের চর্বি এবং মাছের তেল মেশানো নিয়ে ঠিক এই কারণেই বাওয়াল লেগেছিল।
আরো প্রশ্ন করুনঃ সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত হলেও ৩৭১ হয়না কেন?
এগুলোকে আন্তর্বিরোধ কিংবা (অ-)বিরোধী বিরোধ দিয়ে ধরা যেতে পারে। অনেকে হয়তো একে হিঁদুদের “উদারতা” বলবেন, তবে আজকের ভারতের পরিস্থিতিতে এ কথা হয়তো আর বলা চলে না। এমনকি ইতিহাস ঘাঁটলেও বৈষ্ণব রাজা এবং শৈব রাজার লড়াইয়ের মতোন বিষয়গুলো সহজেই নজরে পড়ে।
দ্বাদশ শতাব্দীতে লেখা কলহনের রাজতরঙ্গিণী-তে মিলছে কাশ্মীরের রাজাদের ইতিবৃত্ত। সেখানে শৈব রাজা হর্ষের রাজত্বকালের (১০৮৯–১১০১ খ্রিস্টাব্দ) বিস্তারিত বিবরণ আছে। তাঁর রাজ্যে তখন চলছে চরম আর্থিক সংকট (এখনকার সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন!) এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন। এই পরিস্থিতিতে তিনি একের পর এক মন্দির লুঠ করতে শুরু করলেন — শৈব, বৈষ্ণব, এমনকি বৌদ্ধ মন্দিরও বাদ গেল না। এই কাজের জন্য তিনি একজন বিশেষ কর্মকর্তাও নিযুক্ত করেছিলেন, যে পদের নাম ছিল দেবোৎপাটন-নায়ক (এবং/অথবা কোনো কোনো পাঠে “দেবপাটলউৎপাটক”) — অর্থাৎ সোজা ভাষায় যাঁর কাজ হলো দেবমূর্তি উপড়ে ফেলা। মূর্তিগুলো গলিয়ে ধাতু বের করে রাজকোষ ভরানোটাই ছিল উদ্দেশ্য। এটা কোনো আন্তর্ধর্মীয় সংঘাত ছিল না — এ ছিল একই ঐতিহ্যের ভেতর থেকে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে একদলের দ্বারা অন্যদলের পবিত্র স্থান লুণ্ঠনের ঘটনা।
[সাম্প্রতিক একটা ঘটনা মনে পড়ে যায়। ১২ বিলিয়ন ডলারের সোনাদানা স্রেফ বেচে দিয়েছে আমাদের সদাগর-পোষিত হিঁদু রাষ্ট্র। অথচ জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণে ১০ই মে ২০২৬ তারিখে উনিজি লোকজনকে সোনা কিনতে বারণ করেছিলেন—কিপটেমির অর্থনীতিতে যেতে বলেছিলেন। আরও বারণ করেছিলেন বিদেশ সফর করতে, বলে নিজেই বিদেশে গিয়ে মেলোডি টফি-বিলি করেছিলেন! উনি সনাতন ধর্ম মোতাবেক এত্তোবার কালাপানি পাড় করে গোবর আর গোমূত্র সহযোগে প্রায়শ্চিত্তির করবেন না??!]
দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসেও একই ধরনের নজির মেলে। চোল আমলের শিলালিপিতে দেখা যায়, শৈব রাজারা বৈষ্ণব মন্দির ভেঙেছেন, বৈষ্ণব রাজারা শৈব মন্দির — মতাদর্শগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এবং রাজানুগ্রহ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় এসব চলতেই থেকেছে। সুতরাং এক সম্প্রদায়-কর্তৃক অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা, এক দেবতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার নামে অন্য দেবতার মন্দির ধ্বংস করা—এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটত, যা বিজেপি “ইতিহাসবিদরা” (কাঁঠালের আমসত্ত্ব??) আলোচনায় আনেনই না।
বৈষ্ণব আজু গোঁসাইয়ের সঙ্গে কালীভক্ত রামপ্রসাদের তুমুল তরজা চলতো, গানে-গানে।
এই ঘটনাগুলো একটা জরুরি কথা মনে করিয়ে দেয়: সাম্রাজ্যবাদ আপিসিভাবে আসবার আগে “সনাতন হিন্দু” বলে কোনো একক, অখণ্ড, সমসত্ব পরিচয় ছিল না। ছিল নানা সম্প্রদায়, নানা মত ও পথের জটিল বিন্যাস — এবং তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যে সহিংসতা, তার মূলে ছিল ক্ষমতার টানাপোড়েন, কোনো একটি ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় পরিচয়ের অনুভূতি নয়।
অনেকেই জানেন—“হিন্দু” এসেছে “সিন্ধু” শব্দটা থেকে, যেটা আদতে উত্তর-পশ্চিম অংশের একটা ভৌগলিক পরিচয় (geographical identifier) মাত্র, তার বেশি কিসসু নয়। একে “এক” ধর্মীয় পরিচয়ের ছাঁচে ঢালাই করা হয়েছে সেমেটিক এবং কেরেশচানি ধর্মগুলোর আয়না-প্রতিবিম্ব হিসেবে, অর্থাৎ সেক্ষেত্রে “অপর”-কে চিহ্নিত করবার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে-পিটে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কলোনিকালেই। উল্টোদিকে, ব্রাত্য বাঙালি-র নির্মাণ নেতিকরণের মাধ্যমে “আত্ম”-পরিচয় বানিয়ে তুলেছে।
কাজেই, ওই সঙ্ঘের বাৎলানো “এক ধর্ম, এক নেশন” ব্যাপারটা ধোপে টেঁকেনা। ধ্বসে পড়ে অতি সহজেই। এসবের চোটে তারা কি আজও পেরেছে ইউনিফর্ম সিভিল কোড তৈরি করতে? করতে গেলেই এই এত্তোসব বহুত্বের মাঝখানে ব্যাপক ঝাড় খেয়ে যাবে।
এবার আসা যাক হিন্দুকে “সম্প্রদায়” হিসেবে বোঝবার ব্যাপারটায়।
বিদেশে (ইউরোপ এবং ব্রাজিলের মতোন তথাকথিত বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশেও) “কম্যুনাল” শব্দটা ব্যবহার করতে গিয়ে বহুবার বিপাকে পড়তে হয়েছে আমাদের। আমাদের সেইসব বিদেশী বন্ধুরা “কম্যুনাল” বলতে বোঝে যা-কিছু একটা “কম্যুনিটি”-র সঙ্গে ইতিবাচকভাবে অনুসঙ্গিত। এখানে নির্দিষ্টভাবে ধর্মীয় সম্প্রদায় বোঝানোই হয় না, বরং কৌম-নির্ভর যাপনের (“কম্যুন” বলে যাকে) কথা আসে ব্যক্তি-প্রসঙ্গ পেরিয়ে।
ওদিকে ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় লেখবার সময় স্বয়ং অক্ষয় কুমার দত্ত (চরম নাস্তিক!) কিন্তু আজকের অর্থে সাম্প্রদায়িকতা বোঝাননি, বরং আজ যাকে তথাকথিত “হিঁদু” চ্যাটাই দিয়ে ফ্ল্যাট করে পড়া-বোঝা-বলা হয়ে থাকে, সেই হিংস্রভাবে একীভূত ধারণাকে যেন পূর্বানুমান করে একরকম চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এই স্বভূমিতে বহু-সম্প্রদায়ের উপস্থিতি দর্শানো হয়েছিলো। এইসব সম্প্রদায়ের সাধনা পদ্ধতি, আচার-ব্যবহার, বিশ্ববীক্ষা, চরম লক্ষ (মোক্ষ) ইত্যাদিতে বহু ফারাক, বহু অমিল। তবু এগুলো সময়ে-সময়ে গজিয়ে উঠেছে, বিচ্ছুরিত হয়েছে, অন্য ধারণা এসে এদের স্পন্দিত করেছে, ধ্বণিত করেছে। কখনো এরা হারিয়ে গেছে “অপর” কিছুর আধিক্যে, আবার কখনো বা মিশে গিয়েচে, এমনকি গৃহীত কিংবা আত্মীকৃত করেছে সেই “অপর” প্রবণতাদের (বহু পরে যেমন বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার বলে চালানো, কিংবা জৈন-বৌদ্ধ-শিখ সক্কলকেই “হিঁদু” বলে গিলে ফেলা – এইসব আরকি)। তবু, এই ব্যাপারগুলো সম্প্রদায়গত বাদ-বিবাদের অন্তর্বর্তী হলেও এখনো ঠিক “সাম্প্রদায়িকতা” হয়ে উঠছেনা।
কাজেই, “সাম্প্রদায়িকতা” শব্দের মানেতত্ত্ব অত্যন্ত বিশেষ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। এ শব্দটা দেশ-কাল-ঐতিহাসিকতা নির্দিষ্ট, অন্য সমস্ত শব্দের মতোই। “সাম্প্রদায়িকতা”র ব্যাখ্যায় কলোনির মনন-নির্মাণের প্রক্রিয়াটাই প্রকাশ্যে আসে। এখানে একটা উঁচু-নিচু থাকবন্দীকরণ আছে। এক সম্প্রদায় অন্যটার থেকে ওপরে বা নিচে – এটা দেখানো হয়। আর আছে “ভিক্টিম কার্ড” খেলা – আমরা খতরায় রয়েছি অমুক চিহ্নিত “অপর” সম্প্রদায়ের কারণে ইত্যাদি। হ্যাঁ, আজকের এই দেশের পরিস্থিতিতে আমরা “হিঁদু খতরে মে হ্যায়”-এর কথাই বলছি, এবং তার সঙ্গে তৈরি করা, বানিয়ে তোলা ইসলামবিদ্বেষ। অর্থাৎ “সম্প্রদায়”-এর ইতিবাচক অর্থতে যেই রাষ্ট্র-পার্টি-ব্যবসায়ীরা এসে নাক গলাতে যায়, তখনই নেতিবাচক সাম্প্রদায়িকতা জন্ম নিতে শুরু করে।
এই সাম্প্রদায়িকতার ক্ষেত্রে অতি দক্ষিণপন্থীদের “আমরা বনাম ওরা”-র কথা অনেকেই বলেন। যাকে অনেকসময় “deictic categories” দিয়ে বোঝা হয়ে থাকে, অর্থাৎ– আমি, তুমি, আমরা, তোমরা, ওরা ইত্যাদি।
তবে আমরা বলতে চাইছি শব্দের বেড়ে চলা বেড়াজালের কথাঃ “ঘুসপেটিয়া”, “উইপোকা”, “মোল্লা”, “তালিবানি”, “রিফিউজি”, “পরাশ্রয়ী জীব/পরজীবী”, “আতঙ্কবাদী”, “যাদের পোশাক দেখলেই চেনা যায়”, “সন্ত্রাসী”, “কাটা”, “দাড়িওলা”, “লুঙ্গি পরা”, “বাংলাদেশী”, “মুখে পেঁয়াজের/রসুনের গন্ধ যাদের”, “গরুখেকো”/ “ওইসব মাংস খায়”, ইত্যাদি। কিন্তু এই বেড়াজালের বাড়াবাড়ি বেশিদূর এগোতে পারে না।
এই ভিক্টিমপণা দর্শানোর পাশাপাশি রয়েছে নানান আখ্যান প্রচার করে মৈত্রীবোধের জায়গায় হিংসা-বিদ্বেষ-ঘেন্না-অসহিষ্ণুতা বাড়িয়ে তোলা। “ওদের” বেশি বাচ্চা, “ওদের” অনেকগুলো বিয়ে, “ওদের” সবাই সন্ত্রাসবাদী, “ওদের” মজ্জায় হিংসা-প্রবণতা, “ওরা” সবসময় যুদ্ধবাজ, “ওদের” কখনো বিশ্বাস করা চলে না ইত্যাদি গোছের। এগুলো প্রত্যেকটাই নির্দিষ্ট ক্ষমতাতন্ত্রদের হাতে বানিয়ে তোলা হয়, এবং সংখ্যাতত্ত্ব দেখিয়ে (বিশেষত ওই “প্রচুর জনসংখ্যা”-র ব্যাপারটায়), তথ্যের হদিশ দিয়ে এসব কথাকে অতি সহজে ভেঙেও ফেলা যায়।
ও কিসের কোলাহল শুনতে পাচ্ছি? রথযাত্রা বেরিয়েছে বুঝি? কি বলছে এটাকে? সুনার বঙ্গাল তৈরির জন্য পরিবর্তন যাত্রা? কিসব যেন স্লোগান দিচ্ছে ওরা?
“মুসলমানো কো দোনো স্থান, পাকিস্তান অউর কবরস্থান!”
“দেশ কে গদ্দারো কো, গোলি মারো সালো কো!”
“এই তার-পেরোনো বাংলাদেশী— ভাগ!”
“উর্দু চলবে না! উর্দু মোল্লা ভাষা!”
(এর আগেই দুই নম্বর অধ্যায়ের ঘেন্নাবাক্যগুলো খেয়াল করুন)
এই রথযাত্রার পাশেই আবার এক বিশাল বপু (?!) মিথ্যের রাজার (কিং লায়ার) বক্তৃতা শুরু হলো। সে টেলিপ্রম্পটার দেখে দেখে বলছেঃ “আর্বান নকশালদের আটকাতেই হবে। নইলে দেশের চরম বিপদ। আর অনুপ্রবেশকারীদের সমুদ্দুরে ছুঁড়ে ফেলে দাও!”
টিভি চালিয়ে বসতে গিয়ে সংসদের “লাইভ টেলিকাস্ট” চালু হয়। সেখানে মোটাভাই কয়েকটা শব্দ বলে চলেঃ “টুকড়ে টুকড়ে গ্যাঙ”, “লিবারাণ্ডু”, “দেশবিরোধী”, “অ্যান্টি-ন্যাশানাল”, “দেশদ্রোহী”, “গদ্দার”, “সিকুলার”, “আন্দোলনজীবি”, ইত্যাদি…
গৌরি লঙ্কেশ, কালবুর্গী, পানসারে, দাভোলকর, রোহিত ভেমুলা…
আপনারাও এসব এখনো শুনতে পাচ্ছেন কি?
নাজিব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে…
চ্যানেল পাল্টাই। তুমুল ঝগড়া-চেঁচামিচি চলছে হেজে যাওয়া গণতন্ত্রের তথাকথিত “চতুর্থ স্তম্ভ” জুড়ে। বাকি স্তম্ভগুলোর মতোনই ভারতের ধর্মতান্ত্রিক শাসনকালে এই স্তম্ভকেও ভেতর থেকে শেষ করে ফেলা হচ্ছে। দেখলুমঃ এইসব চ্যানেল খালি উনিজির প্রশংসায় মত্ত হয়ে পাকিস্তানের নিন্দেয় নেমে পড়েছেন। ওহ হ্যাঁ, চ্যানেলগুলো তো আবার আদানিভাই-আম্বানিভাইদের দখলে… হাম দো, হামারে দো – এক ফুল দো মালির “ক্রোনি” অবস্থা।
এরকমই একটা চ্যানেলে দেখলাম বলা হচ্ছে যে মুসলমান আগ্রাসনকারীরা কিভাবে ভারত দখল করেছিলো, মন্দির ধ্বংস করে নিজেদের সম্পত্তি-রাজত্ব বাড়িয়ে তুলেছিলো। এসব নাকি “ইতিহাস” (?!)-এ বলে। আজ অব্দি কংগ্রেস নাকি এই ইতিহাসকে প্রকাশ হতে দেয়নি—তাই এন-সি-ই-আর-টি-র বই থেকে বাদ পড়ে মুঘল ইতিহাস, দিল্লী সুলতানদের ইতিহাস, ডারউনের বিবর্তনবাদ। থাকবে শুধু শিবাজি, মহারাণা প্রতাপ প্রমুখ “হিঁদু” রাজাদের বীরত্ব ও প্রতাপ-গৌরবের কাহিনী। আর-এস-এস এর ১০০ বছর বলে কতা! তার পাশে হয়তো বাল নরেন্দ্রর কুমীর ধরবার কাহিনী কিংবা নর্দমার গ্যাস দিয়ে চা বানানোর ব্যাপারগুলোও জায়গা পাবে।
মোটামুটি এই একই বয়ানের “খবর” (?!) অন্তত আরো খান পাঁচেক হিন্দি-ইংরেজি চ্যানেলে চালানো হচ্চে। একটা উত্তেজিত নিউজ অ্যাঙ্কর (যে নাকি তিহার জেলে সময় কাটিয়েছে) বললেঃ আসলে তাজমহল নাকি তেজোমহালয় শিব মন্দির, আবার বেনারসের জ্ঞানবাপী মসজিদে নাকি একদা মন্দির ছিলো … এবং হিঁদুরা সেটা খুব শিগগরি পুনরায় দখল করেই ছাড়বে! তারপর ওরা বললো মথুরা জন্মভূমির কথা। সভ্যতার গৌরব, নিজ ধর্মের আত্মগরিমা ফেরাতেই হবে – সে যে’করেই হোক!
আমরা টিভিটাকে বিরক্তভাবে সুইচ অফ করে দিই। ভাবিঃ যখন তোরাই বেনারসে মন্দির ভাঙিস এবং তারপর অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাস, তখন? এ জিনিস আমরা নিজেরা বেনারসের গলিতে গিয়ে দেখতে পেয়েছি, যে কিভাবে “বিশ্বনাথ ধাম করিডোর” বানানোর দোহাই দিয়ে মন্দির ভাঙছে বিজেপিরই কার্যকর্তারা! ফুঃ!
তাছাড়া বিশ্বনাথ মন্দিরের সোনার তৈরি ইসলামি “ডোম” তোরা দেখিসনি? জানিসনা সেখানে ঔরঙ্গজেবের অবদান? তোরা কি জানিসনা যে কিভাবে নিজের প্রাণ দিয়ে ঔরঙ্গজেব এক হিঁদু রাণীকে হিঁদু পুরুতের ধর্ষণের মুখ থেকে তুলে বাঁচিয়েছিলেন? বিশ্বনাথ মন্দিরের সেনাই-বাদক আলি বকশ বিলায়েতুর কথা জানিস, ওস্তাদ বিসমিল্লা খানের মামা? লুকিয়ে দিতে চাস তোরা সে’সব ইতিহাস?
গুঁড়িয়ে দেওয়া প্রাচীন মসজিদের ওপর গেরুয়া করসেবকদের ভাগোয়া ঝান্ডা লেহরানো উল্লাসের পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই বড়দিনের সাজসজ্জার ওপর আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ভাঙচুর করা হচ্ছে গীর্জের মধ্যে… আবার বুলডোজারের মারকাটারি আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি আমরা—আমাদের চারিদিকে। বেছে বেছে ওদের বাড়ি ভাঙছে, ভেঙেই চলেছে। দখল হচ্ছে উপাসনা-ক্ষেত্র। উচ্চ আদালতের প্রধাণ বিচারক পোধানমোন্তির সঙ্গে মিডিয়া সহযোগে গণেশ পুজো করতে করতে বলেনঃ কোনো মসজিদ কক্ষনো ভাঙা হয়নি। কোনো প্রমাণ নেই। সেই, “প্রমাণ”! রামলালাকে “আইনী-সত্তা/ব্যক্তি” বানিয়ে দিয়ে তাঁর “অনুপ্রেরণা”য় সইহীন “রায়”দান করে বসবার ফলে প্রমাণ-টমান আপুনার চোখে হারানোটাই স্বাভাবিক, হে চন্দ্রাহত চন্দ্রচূড়!
ও আবার কি! একটা বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিলো, কারা যেন ঢুকে বন্ধ করে দিলো—বললো, “লাভ জিহাদ”!
এই সমস্ত কাণ্ডে হারিয়ে যায় আমাদের স্বভূমির দীর্ঘকালের সংশ্লেষনাত্মক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারঃ চারুকলায়, কারুকলায়, সাহিত্যে, দর্শনে, রাজনীতিতে, পারস্পরিক যাপনের ইতিহাসে… এই আবহাওয়ায় হারিয়ে যান যবন হরিদাস-শ্রীচৈতন্যদেব, আকবরের দীন-এ-ইলাহী কিংবা দারা সুকো, ওয়াজিদ আলি শাহ, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, রামপ্রসাদ বিসমিল-আসফাকুল্লাহ, আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব… আরো কতো মানুষ, আরো কতো ঘটনা! ভুলিয়ে দেওয়া হয় বেলুড় মঠের স্থাপত্যে ধর্মীয় সহাবস্থানের যুক্ত-হয়ে-থাকার কথা। মনে পড়ে যায় ডিরোজিওর জঙ্গীরা পাহাড়ের ফকির কাব্যের সতী-হতে-যাওয়া নলিনী আর সেই “মুসলমান দস্যু”র ট্র্যাজিক প্রেমগাথা! যদিচ সেই মুসলমান দস্যু তথা ফকিরের ওপরে আক্রমণ নেমে আসে এক মুসলমান সুলতান/নবাবের তরফে।
এর মানে হলো, ধর্মটা আসল কথা নয়, ওটা গৌণ। ক্ষমতার ভাষা দিয়ে কথা বলতে গেলে ধর্মনীতি আর স্রেফ ধর্মনীতিটুকুতেই আবদ্ধ থাকে না, তাকে পরিণত করা হয় সেই ক্ষমতাতন্ত্রের যান্ত্রিক তোতাপাখিতে। ধর্মের মৌলবাদের ব্যাপারটা হয়ে ওঠে স্রেফ গভীরতাহীন মুখোশ, ভড়ং, ভান – তার আড়ালে চলে ব্যক্তি পুঁজির (“খোলা” বাজার-অর্থনীতির মৌলবাদ) ব্যাপক, দূর্দমনীয় উচ্ছাস ও প্রবাহ।
হঠাৎ একদল লোক এগিয়ে আসে লাঠি-ছোড়া-ত্রিশুল-বর্শা হাতে। তারা আরেকটা নিরীহ দেখতে লোককে মাটিতে ফেলে তার উদ্দেশ্যে বলে ওঠেঃ “বল শ্লা জয় শ্রী রাম! বল ভারত মাতা কি জয়!” তারপর শুরু হয় প্রবল গণপিটুনি। লোকটা আর পিটুনির ধাক্কা সামলাতে পারে না। ক্রমাগত মার নেমে আসতে থাকে, আর শেষমেশ তার প্রাণহীন দেহটা নেতিয়ে পরে ধরিত্রীতে। এই অ-চেনা মানুষটার জন্য আমাদের এই পৃথিবীটা ক্রমাগত ঘুরতে ঘুরতে কয়েক মিলিসেকণ্ডের জন্যেও থামেনা।
আকলাখ, পেহলু, রকবর, হিন্দু বালক আরিয়ান, রাম মন্দিরের পুজারি লালদাস, জাস্টিস লোইয়া, হরেণ পাণ্ডিয়া…
শুনতে পাচ্ছেন আপনারা?
হিন্দ রজবের আওয়াজ আর শোনা যাচ্ছে না…
দেখতে পাচ্ছেন গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইন্স, স্ট্যান স্বামী?
আমাদের দিকেও এবার এগিয়ে এলো ওরা, দাঁতে দাঁত ঘসে নিয়ে বললোঃ “হিঁদুর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেলে আমরা চুপ করে থাকবো না! তোমরা ভেবেছোটা কি! আমাদের খাবে, আমাদের পরবে, আবার আমাদেরই গাল পাড়বে?”
আমরা বললুম, “দাঁড়াও দাঁড়াও। পিঠ ঠেকে গেছে মানে? তোমরাই তো সংখ্যাগুরু হে!”
ওরা যেন বললেঃ “না! আমাদের পবিত্র গোমাতার অপমান আমাদের জাতির স্বর্ণযুগের সনাতন আদর্শকেই অপমান করা। এই গরু-সংহারকদের আমরা বলী দেবোই!”
আমরা আরো বলিঃ “রোষো দেখি। তোমাদের ধম্মো এতো ঠুনকো বুঝি, যে এতো সহজেই তার ভিত নড়ে যায়? কিন্তু তোমরা যে তথাকথিত সবচেয়ে পুরোনো, “most oldest” আদি “হিঁদু সনাতন” কালের কুলুজির খোয়াব দেখছো এবং দেখাচ্ছো, সে’সময়ে তো দিব্য হরিণ-গরু-মোষের মাংস খেতেন সাধু সন্ন্যাসীরা, আত্মীয়রা এলেও সেই গো-মাংস রীতিমতোন সার্ভ করা হতো… অনেক সময় হাল্কা পুড়িয়ে কাবাব করে… আহা! এসব তো খেতে দেওয়া হতো সূরা, মৈরেয় মদের সঙ্গে… এমনকি স্বয়ং রামচন্দ্রও তো– যাক গে, এর প্রমাণ আছে প্রচুর… অতি সমস্যাজনক কিতাব মনুস্মৃতিতে পর্যন্ত কথা বলা হচ্ছে এই আমিষ-আহারের সপক্ষে…স্বামীজি নিজে বলেছেন গরু মেরে না খেলে সে হিঁদু বলেই গণ্য হয়না! ‘কাস্ট অন দ্য মেনু কার্ড’ বলে একখানা ভালো ছবি আছে এ ব্যাপারে। ওটা ইউটিউবে একবার দেখো, একটু পড়াশোনা করো…… তারপর নাহয় কথা বলতে এসো বাপু! আর তোমাদের বিজেপি আমলেই তো সবচেয়ে বেশি “নিষিদ্ধ” মাংস রফতানি হয়েছে ভারত থেকে… “আল কবীর এক্সপোর্টস” মোষ (নাকি মোষ বলে গরু!)-বেচা কোম্পানির মালিকানার একটা অংশও তো হিঁদু! কিন্তু তোমরা তো আবার…”
ওদের আর দেখতে পাই না আমরা।
আর ভালো লাগেনা। চুড়ান্ত নেশা করে ঘুম লাগাই। আমরা আর নিতে পারছিনা- কিছুতেই না।
কিন্তু…
তারপরের দিনই সকাল হতে না হতেই আমাদের এক উত্তরপ্রদেশবাসী ইউটিউব সাংবাদিক বন্ধুর থেকে খবর পাইঃ বারানসীতে দাঙ্গা লেগেছে। হতাহতের হিসেব নেই। মনিকর্ণিকা ঘাটে রক্তগঙ্গা।
মনিকর্ণিকায় দাহ করলে নাকি সরাসরি স্বর্গপ্রাপ্তি হয় বলে শুনেছি? কোথা হে তুমি সন্ত বিপ্লবী কবীর, মাঘারে গিয়ে ইচ্ছে করে মরলে যাতে তুমি এই স্বর্গপ্রাপ্তির “মিথ”টাকে ভাঙতে পারো?
দাঙ্গার ব্যাপারে আরো “গোপন” খবর এলো সেদিনকেই।
গণতন্ত্রের নয়া পঞ্চম স্তম্ভের (অতি-অবশ্যই হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদ রেখে, গোদি মিডিয়ার বাইরের পরিসরের কথাই বলছি) স্বাধীন সাংবাদিকেরা “হুল ফোটানো”-মারফৎ খুঁজে বার করেছেন যে বিজেপির কিছু স্থানীয় নেতা এবং কিছু ব্যবসাদারেরা এই দাঙ্গা বানিয়ে তুলতে পয়সা ঢেলেছে, ঢেলেই চলেছে। সেই পয়সা দিয়ে জ্ঞানব্যাপী মসজিদের সামনে ফেলা হয়েছে শুয়োরের পচা মরা, আর বিশ্বনাথ মন্দিরের সামনে ফেলা হয়েছে হালাল করা গরু! সেই টাকা দিয়ে আমদানি করা হয়েছে অস্ত্র-সস্ত্র। আমাদের ভীস্ম সাহানির “তমস” মনে পড়ে গেলো। গোবিন্দ নিহালনির চিত্রায়ণে দেখেছিলুম সেই কবে!
আচ্ছা, জ্যান্ত মুর্গি এক কোপে কাটতে শেখানো হয়েছিলো যাকে, সেই কাবুলিওয়ালা-হত্যাকারী বাচ্চাটাই কি তার দলবল নিয়ে এসব দাঙ্গা বাঁধাচ্ছে আজো? আজকের যুবসমাজের একাংশকে আর-এস-এস বা সঙ্ঘের ক্যাডার বানাতে উঠে-পড়ে লাগছে না এরা, পুরুর যৌবন কেড়ে নিতে উদ্যত হচ্ছে না কি যযাতি সরসঙ্ঘচালকেরা? একে আটাকাবো না?
আচ্ছা, বেনারসের খবরটাতে মনে পড়লোঃ ২০০২-এর গুজরাটের একপাক্ষিক দাঙ্গাতেও এভাবেই যেন কিসব বানিয়ে তোলা হয়েছিলো না? ক্যারাভানের রিপোর্ট, বিবিসির ডক্যুমেন্ট্রি যেন কিসব বলেছিলো গোধরা ইত্যাদির ঘটনা নির্মাণ সম্পর্কে? আজ সব ভুলতে বসেছি আমরা। ২০২০-র দিল্লীর একপাক্ষিক দাঙ্গাতেও প্রায় একই ব্যাপার। অথচ অমূলকভাবে দোষ চাপানো হলো যাদের ওপর, তারা কিন্তু সেদিন গাঁধিবাদী সত্যাগ্রহের কথা বলেছিলো, সংবিধান বাঁচানোর কথা বলেছিলো।
হায় মাতঃ! প্রতিবেশীকে আমরা তাই আজ সন্দেহ করতে শিখছি। আমাদের মগজে চালান দেওয়া হচ্ছে এই সন্দেহ। যাতে আমরা প্রকৃতি-পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সার্বিক ভালোভাবে বেঁচে থাকার কথাগুলো বেমালুম ভুলে যাই! “তুমি এই”, “তুমি ওই” – এভাবে দেখছি আজ আমরা আশেপাশের মানুষকে।
তবে? শান্তি কোথা আছে?
বল মা তারা দাঁড়াই কোথা?
আমাদের ধাক্কা খেয়ে, ঝাপট খেয়ে জেগে ওঠা তথাকথিত “বাঙালিয়ানা”-তে আশ্রয় মিলবে কি?
পাঁচ।। বাঙালি— আপুনার মুখ আপুনি দেখো!
হঠাৎ শুনতে পাই একটা গান। তার মাঝের কয়েকটা লাইন এইরকমঃ
“আমরা পাঞ্জাবিদের পাঁইয়া বলি মাড়োয়ারি মাওড়া
আর নন-কমিউনাল দেওয়াল লিখি,
এদিকে নন-কমিউনাল দেওয়াল লিখি
ক্যালকাটা টু হাওড়া…”
আজকের পরিস্থিতিতেও কিছু বোঝা গেলো কি?
বাঙালিকে অনেকে বলেন সাম্রাজ্যবাদী, আগ্রাসী। হ্যাঁ, অনেককাল ধরেই বিশেষত উড়িষ্যা আর অহমের লোকেরা তাই বলেন। আরো বলা হয় যে সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকেই বাঙালিরা অন্য/অপর/ভিন্নকে আত্মসাৎ করেছে, নিজের মধ্যে পুরে নিয়েছে সেই জাতীয়তাবাদী ধুয়ো তুলে এবং সেইসঙ্গে অন্য/ অপরকে রীতিমত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা করেছে।ওড়িশাবাসীকে ‘উড়ে’, অহমীয়াদের ‘আসামী’, পাঞ্জাবিদের ‘বাঁধাকপি’ ইত্যাদি বলে ঠাট্টা-তামাশা তো করেছেই, এমনকি যাঁরা বাঙালি ‘বাঙাল’ ওরফে ‘জার্মান ছারপোকা’-দের মারাত্মক অপছেদ্দা অবহেলা করেছে।
অনেকেরই মতে বাঙালি হচ্ছে গিয়ে ব্রাউন সাহিব—ইংরেজের বিকল্প মূর্তি।
কিন্তু এসবের দরকারটা কী?
কী-ই বা দরকার আজকের মধ্যবিত্ত বাঙালিদের একাংশের নয়া আধারে সরাসরিভাবে প্রকাশ পাওয়া ইসলামবিদ্বেষ, হিন্দি-হিন্দু সংস্কৃতি হনুকরণের প্রবণতা?
২০০১-এর সেনসাস দেখুন। তাতে ভাষাগুলোর স্টেটাস কিরকম বোঝা যাচ্ছে? “হিন্দি” নামক ছাতার তলায় প্রায় ৫১টা ভাষা (বুন্দেলখণ্ডি, ছত্তিসগড়ি মগাহি ইত্যাদি)-কে একসঙ্গে চ্যাটাই চাপা দিয়ে দেওয়া হলো? “হিন্দি”-নামক এক বানানো বহুত্বের জনসংখ্যা বেশি দেখানোর জন্য কি? ঠিক যেভাবে ডিলিমিটেশন-এর ক্ষেত্রে করা হচ্ছে? মজার ব্যাপার এই, ভারতের পূর্ব এবং দক্ষিণ দিকের দেশগুলোতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ মানবার কারণে জনসংখ্যা কম। আর গোবলয়ে আবাদি অত্যধিক বেশি। অতএব, জনপ্রতিনিধিও অনেক বেশি পাওয়া যাবে এই গোবলয় থেকে!
আগে উল্লেখিত গানেরই আরেকটা লাইন আমার মনে আপনা-আপনিই বেজে ওঠেঃ
“চাড্ডি পরে শোধ করে যাই লোনেরই ভগ্নাংশ…!”
এই “চাড্ডি” (ভাজপাকে এই নামেই ডাকে “লিবারান্ডু”, “সেকু-মাকু”রা—বলা বাহুল্য এইসব নাম আবার লেফট লিবারালদের দিকে তাক করেই বলে চাড্ডিরা) পরার ব্যাপারটা আজকের বাঙলায় দাঁড়িয়ে অনেকের উদ্দেশ্যেই বলতে ইচ্ছে করছে, যারা ৪ঠা মের পর থেকে রাতারাতি দাঁতনখ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন, ভোল পাল্টে নিয়েছেন এবং গিরগিটি হয়ে গেছেন।
একদিকে যেমন “স্নব” ভাবাবেগে মত্ত থেকে অন্য প্রদেশকে হ্যাটা করা, নিচু চোখে দেখা, অবমাননাকর মন্তব্যের জালে বেঁধে ফেলা, তেমনি আরেকদিকে হিপোক্রিসি ছড়িয়ে রয়েছে “বাঙালি” বর্গের মজ্জায় মজ্জায়।
এ প্রসঙ্গে অঞ্জন দত্তের “সেই অদ্ভুত ভালো লোকটা” গানের কয়েকটা লাইন খেয়াল করুনঃ
“বামপন্থী গান শুনলে পরে করে চোখ ছলছল
লক্ষ্মীবারে দাদা উপোস করে পরে র্যাঙ্গলার জিন্স বিজয়ায়
সে কি কিছুটা তোমার মতো, কিছুটা আমার মতো নয়?”
নানান ক্ষেত্রে এই দুমুখো দোটানা (মন আর মুখ যেখানে কিছুতেই এক হয় না) নজরে পড়ে।
খেয়াল করবেন, বঙ্কিম চাটুয্যে বাঙালিদের ইতিহাস-বিস্মৃত জাতি হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ১৯ শতকের সময় থেকেই আমাদের সামনে হাজির হয়েছিলেন একজন রাজা রামমোহন, পেয়েছি ডিরোজিও, বিদ্যাসাগরকে, কিংবা অক্ষয় দত্ত, মাইকেলকে। ইয়াং বেঙ্গলের রামগোপাল ঘোষকে বলা হতো “ভারতের ডিমোস্থিনিস”। আরো ভুরিভুরি উদাহরণ দেওয়া যায়, তবে সম্পূর্ণ লিস্টি বানানো আপাতত আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আরো মনে পড়ে যায়—আমরা পেয়েছি রসিককৃষ্ণ মল্লিকের মতোন মানুষকে, যিনি সরাসরি গঙ্গাজলের পবিত্রতাকে অস্বীকার করে তার নামে শপথ নিতে চাননি। আমরা আরো পেয়েছি নজরুল, রোকেয়ার মতোন মানুষজনদের। কোথায় বেমালুম উধাও হয়ে গেলো সেসব স্মৃতি? নাকি এনারা কেবল সমাজের তথাকথিত “এলিট” বর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছেন, ছড়িয়ে যেতে পারেননি বিরাট জনসমাজের পরিসরে? এসব সমালোচনা থাকবেই। আজকের অবস্থা দেখে বুঝতে পারছি বাংলার তথাকথিত “নবজাগরণ” আদতে কতিপয় বেগানা ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো।
তবু বড্ড কষ্ট হয় আজকাল— চাদ্দিকে যা ঘটতে দেখি, তাতে শিউড়ে না উঠে পারি না আমরা। খালি খালি খেয়াল হয় নিরোদচন্দ্র চৌধুরীর “আত্মঘাতী বাঙালি”।
নিরোদ চৌধুরী যেমনটা বলেছিলেন— বাঙালির পতনের জন্য বাইরের কোনো শক্তি — ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, মুসলিম শাসন, বা দেশভাগের রাজনীতি — প্রধাণত দায়ী নয়; দায়ী বাঙালির নিজস্ব মানসিক গঠন, বুদ্ধিবৃত্তিক কাপুরুষতা এবং শতাব্দীব্যাপী আত্মপ্রতারণার অভ্যাস। নিরোদ চৌধুরী মনে করেছিলেন, বাঙালি একটি বিশেষ ধরনের আত্মহননে অভ্যস্ত — সে নিজের সভ্যতার ভিত্তিগুলো ধ্বংস করে চলে, অথচ সেই ধ্বংসকেই গর্বের আখ্যান দিয়ে ঢেকে রাখে।
তাঁর মতে, বাঙালি নিজের অতীতকে কখনো সৎভাবে বিচার করতে শেখেনি। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে যে আত্মতৃপ্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটি বাস্তব সংকটকে ঢেকে রাখার একটি মানসিক কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীত গৌরবের মিথ নির্মাণ করে বর্তমান দায় এড়ানোর এই প্রবণতাকে তিনি বাঙালির মূল রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে উনিশ শতকের হিন্দু “পুনরুজ্জীবনবাদ” (?) এই প্রসঙ্গে তাঁর বিশেষ সমালোচনার লক্ষ। তিনি মনে করেছিলেন যে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আন্দোলন বাঙালিকে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞান-মনস্কতার পথে না নিয়ে বরং একটি আবেগতাড়িত রহস্যবাদের দিকে টেনে নিয়ে গেছে। এই পথনির্বাচনকে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনার সূচনা হিসেবে দেখেন।
ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, অর্থাৎ “বাবু”দের বিরুদ্ধে নিরোদবাবুর কঠোর অভিযোগ। এই শ্রেণি না পাশ্চাত্যকে সত্যিকারভাবে আত্মস্থ করতে পেরেছে, না নিজেদের ঐতিহ্যকে সৎভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছে। এই উভয়সঙ্কট একটি পরজীবী সংস্কৃতি তৈরি করে দিয়ে গেছে যেখানে বাহ্যিক ভদ্রতার আবরণের নিচে কোনো প্রকৃত বৌদ্ধিক বা নৈতিক মেরুদণ্ডই আদতে নেই। ১৯৪৭-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসকেও নিরোদবাবু এই ধারাবাহিকতাতেই দেখেন।
বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির সম্পর্ক নিরোদ চৌধুরীরর কাছে মূলত দ্বিধাবিভক্ত — একদিকে আবেগমথিত জাতীয়তাবাদী গর্ব, অন্যদিকে প্রকৃত লালন-পালন ও বিকাশের প্রতি চরম উদাসীনতা। এই অসঙ্গতিকে তিনি বাঙালির বৃহত্তর আত্মপ্রতারণার একটি প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে পড়ে নিয়েছেন। সমাধান হিসেবে তিনি ইউরোপীয় উদারতাবাদী ঐতিহ্যকে পেতে চেয়েছেন— অর্থাৎ আলোকপর্বীয় বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে, এসব ব্যাপার সত্যিকারভাবে আত্মস্থ না করলে বাঙালি সভ্যতার কোনো ভবিষ্যৎ নেই বলেই মনে করেছেন।
আজকের অবস্থা দেখেও নিরোদচন্দ্র চৌধুরীর অনেক মতামতেই আমাদের সায় নেই। কেননা তিনি নিজে ১৯৪১-এর পর প্রকাশিত কোনো বাংলা লেখা পড়েননি। এই ভিত্তিতেই বলা যায় দেশভাগ-পরবর্তী অধ্যায় বা সংস্কৃতি সম্পর্কে তিনি আদৌ ওয়াকিফ-হাল ছিলেন না।
আজকাল “বাংলা জাতীয়বাদ” নিয়ে যেসব লাফালাফি চলে, তা কিছুটা সঙ্গত/বৈধ কারণে হলেও, আবার অনেকটাই সেই আদি আগ্রাসনকে প্রবাহিত করবার রাস্তাটাও তৈরি করে দেয়। বাংলাপাক্ষিক হয়ে আপনি কোনো সফট টার্গেটকে মেরে-ধরে ঘাড় ধাক্কা দিচ্ছেন, কিন্তু কাল যে আপনিও ঠিক একইভাবে “তাদের” প্রদেশ থেকে ঘাড়ধাক্কা খাবেননা, তার কী গ্যারেন্টি আছে? বরং সেটাই তো দেখা যাচ্ছে জায়গায়-জায়গায়, কিভাবে হেনস্থা হতে হচ্ছে “বাঙালি = বাংলাদেশী” সম্ভাষণ মারফৎ (যেমনটা আমরা কিছু আগেই দুই নম্বর অধ্যায়ে দেখলুম)। আমাদের আক্রমণের লক্ষ কি বিহারী, মাড়োয়ারি খেটে খাওয়া মানুষ? নাকি ধনপতি শেঠেরা?
আর এইধরণের বাংলা-জাতিয়তা বা নেশন-তৈরির ধুয়ো তোলবার ব্যাপারটাও বেশ গোলমেলে।
কেন? কারণ নেশন-স্টেট নিজেই এক কুলুজির খোয়াব।
ভাষা ও উপভাষার মধ্যে যে বিভাজন আমরা ‘বৈজ্ঞানিক’ বলে মানি, সেটি আসলে কোনো ভাষাতাত্ত্বিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। গ্রিয়ার্সন নিজেই স্বীকার করেছেন যে কোনো বক্তৃতারীতি ‘স্বাধীন ভাষা’ না ‘উপভাষা’ তা নির্ধারণ করা অনেক সময়ই অসম্ভব এবং এই দুটি শব্দ ‘পাহাড়’ ও ‘পর্বত’-এর মতোই অনির্নেয় (যেমন আরাবল্লির পাহাড়ের গোলমেলে উচ্চতা, ঠিক তেমনই যেন এই ভাষা জাতীয়তাবাদ) একটি ভাষা-কৌমের গণ্ডি ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তিতে টানা হয় না — টানা হয় রাষ্ট্রীয় ও আর্থসামাজিক টানাপোড়েনের মধ্যে, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর যোজকদের মতিগতির ওপর নির্ভর করে। পুরোনো ভাষাতত্ত্ব এই বর্গমালাকে ‘বৈজ্ঞানিক’ করে তুলত এবং একটি জেনিয়োলজি তৈরি করত — কার্যকারণ-ধর্মী ইতিহাসে পরপর যুগ পেরিয়ে সরলরৈখিকভাবে একটি ভাষার ‘উন্নয়ন’ ঘটেছে বলে দেখানো হত, যা আসলে দেরিদার ভাষায় নিছক ‘জেনিয়োলজিকাল ফ্যান্টাসি’ বা কুলুজির খোয়াব। এ ব্যাপারে পরের অধ্যায়ে আরো আলোচনা থাকবে, বিশেষত ভাষা ও পুঁজির বিনিয়োগ প্রসঙ্গে।
এই ফ্যান্টাসির প্রমাণ পাওয়া যায় ঔপনিবেশিক জনগণনায়। ১৮৮১ সালে উড়িয়াভাষী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিন কোটি, অথচ মাত্র দশ বছর পরে তা নেমে আসে ৯৬ লক্ষে — আড়াই কোটি মানুষ সংখ্যাগণনার খাতা থেকে স্রেফ হাওয়া হয়ে গেল। অসমীয়াভাষীর সংখ্যাও একইভাবে অর্ধেক হয়ে যায়। এই পরিসংখ্যানগত বিলুপ্তি ভাষাতাত্ত্বিক কারণে ঘটেনি — ঘটেছিল পুঁজির নিজস্ব নিয়মে, কলকাতার ছাপাখানা ও প্রকাশনা শিল্পের বাজারি স্বার্থে।
এই প্রক্রিয়ার ফর্মুলাখানা বারবার পুনরাবৃত্ত হয়েছে এবং সর্বত্র একই ছাঁচে ঢালাই করে চালানো হয়েছে। প্রথমে সন্নীত বা প্রমিত ভাষা নির্বাচন, তারপর ছাপাখানার মাধ্যমে তার প্রসার, ব্যাকরণ ও অভিধান নির্মাণ, সেই ভাষাকে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী হিসেবে উপস্থাপন করা, সাহিত্য পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠান গঠন — এবং শেষমেশ এক ছাতার তলায় একজন ‘পূর্ণভাষী’, বাকি সবাই ‘অসভ্য ঔপনিবেশিক উপভাষার’ ক্যাপটিভ স্পিকার। বাংলার ক্ষেত্রে প্রতিটি নেশন-স্টেট বা নেশন-স্টেট হওয়ার অভিলাষী কৌম নিজেকে একটিমাত্র দলিলে উৎসমুখী করেছে — চর্যাপদ, বাংলার জন্য যেমন, অসমীয়া বা ওড়িয়ার জন্যও তেমন। এই উৎস-নির্দেশ কতটা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে নির্ধারিত আর কতটা আধিবিদ্যক – সে প্রশ্ন থেকেই যায়, কারণ মাত্র সাড়ে ছেচল্লিশ পদের ওপর নির্ভর করে এত বড় বড় ভাষার উৎস নির্ণয় করাটা অতিব্যাপ্তি ছাড়া আর কিছু নয়।
যে ভাষা-আন্দোলনগুলো মাঝে মাঝে রোমান্টিক স্বাধীনতাবোধের আমেজ তৈরি করে, সেগুলোর ভেতরেও এই একই রাষ্ট্রীয় ধাঁচা ঢুকে পড়ে। ‘আমার’ তথাকথিত নিজস্ব স্বরের মধ্যে আসলে ‘অপরের বাচন’ মিশে থাকে। এই আন্দোলনগুলো রাষ্ট্রকে শুকিয়ে মারার জন্য নয় — এগুলো বরং রাষ্ট্রকেই সাবস্ক্রাইব করে। নেশন-স্টেটের খোয়াবনামা তাই কুলুজির খোয়াব — বংশপরিচয়ের দাবি যতই গভীরে যায়, তত বেশি দেখা যায় সেই পরিচয়ের শিকড় আসলে ঔপনিবেশিক শাসনের মাটিতে পোঁতা, ভাষার বিবর্তনে নয়।
এই কুলুজির খোয়াবের শেকড় কিন্তু আরও গভীরে যায় — ঔপনিবেশিক আমলের অনেক আগে, সংস্কৃত পণ্ডিতদের ভেতরেই বঙ্গকে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছিল “বর্জনযোগ্য” জায়গা হিসেবে। আমরা কিছুটা এর আগেই “ঝটকা” খাওয়ার সময় দেখে ও চেখে নিয়েছিলাম। এখন না’হয় সে আলোচনাটাকে আরো কিছুটা বিশেষীকৃত করি।
ব্রাহ্মণ্য ভূগোলতালিকায় বঙ্গীয়দের জন্য “বায়ংসি/বয়াংসি” (পাখি, বায়বীয় প্রাণী) পদটি বারবার উদ্ধৃত হয়েছে। “বায়ংসি”-র প্রয়োগের মাধ্যমে বর্জনের কাঠামোটা এখানে বোঝা দরকার। এর সবচেয়ে পরিষ্কার প্রমাণ বৌধায়ন ধর্মসূত্রে (প্রশ্ন ১, কণ্ডিকা ২):
অঙ্গা বঙ্গাঃ কলিঙ্গাঃ সুহ্মাঃ পুণ্ড্রাস্তথৈব চ। প্রায়শ্চিত্তং বিশুদ্ধ্যর্থং কুর্যাত্তেষু নিবাসিনাম্॥
অর্থাৎ অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুহ্ম, পুণ্ড্র (এখন আবার উনিজি অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ বিজয় করে বলে ধুতি পরে আহ্লাদে আটখানা হয়ে লাফান)— এই পাঁচ অঞ্চলের বাসিন্দাদের শুদ্ধির জন্য প্রায়শ্চিত্তির করতে হবে। বঙ্গ এখানে একা নয়, গোটা পূর্বাঞ্চলটাই “ম্লেচ্ছ দেশ”। উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার — আর্যাবর্তের পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী সম্প্রসারণে এই জনগোষ্ঠীগুলোকে বর্জনযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে রাখলে বৈবাহিক ও সামাজিক সম্পর্ক এড়ানো যায়, ভূমি ও সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়। এটা ভৌগোলিক আধিপত্যের ভাষাবদ্ধ রূপ, এবং নেশন-স্টেটের কুলুজি-নির্মাণের চেয়ে অনেক পুরোনো একটা খেলা।
“বায়ংসি = নিচু, অস্থির” সমীকরণটা অবশ্য খুব সরলীকৃত। ঋগ্বেদে vāyas মানে নিছক ‘পাখি’ — এবং পাখি বৈদিক-পৌরাণিক সাহিত্যে সবসময় নিম্নমানের নয়। গরুড়, হংস, গায়ত্রী — এরা সকলেই vāyas-জাতীয় এবং প্রতীকী মর্যাদায় সর্বোচ্চ। আসলে “পাখির মতো স্থির থাকে না” রূপকটা বঙ্গের নদীমাতৃক বদ্বীপের ভৌগোলিক বাস্তবতারই প্রতিফলন — বন্যা, নদীভাঙন, জলের সাথে মিলেমিশে বসবাস। ব্রাহ্মণ্য দৃষ্টি এই ভৌগোলিক গতিশীলতাকে নৈতিক অস্থিরতায় অনুবাদ করেছে। এই অনুবাদের রাজনীতিটাই আসল সমস্যা।
তবে এই নিন্দার গল্পটা এখানেই শেষ নয়, বরং দ্বিস্তরীয়। বাইরে থেকে ব্রাহ্মণ্য বর্জনতন্ত্রের আঘাত, আর ভেতর থেকে উনিশ শতকের ঔপনিবেশিকতা-প্রভাবিত আত্মসমালোচনা (বঙ্কিম), এই দুই স্তর একে অপরকে শক্তিশালী করে একটা দীর্ঘস্থায়ী আত্মঘাতী প্রবণতা তৈরি করেছে।
কিন্তু এই নিন্দার পাল্টা-বয়ানও কিন্তু বাংলার ভেতরেই আছে, সমান্তরালভাবে। চর্যাপদে (৮ম-১২শ শতাব্দী) পাখির উড়ে যাওয়া অবমাননার রূপক নয় — নির্বাণের। বৈষ্ণব পদাবলিতে হংস আত্মার মুক্তির প্রতীক। তান্ত্রিক পরম্পরায় যা ব্রাহ্মণ্য বিধিতে ‘অপবিত্র’ তা-ই সাধনার উপকরণ — বর্জনতন্ত্রের সচেতন উলটো পাঠ। বায়ংসি” তাই শুধু একটা নিন্দাপদ নয় — এটা একটা ক্ষমতা-সম্পর্কের জবানিগত চিহ্ন।
বায়ংসি-রা তাই আজ একইসঙ্গে ডানা মেলে উড়তে চাইছে – কেবল শেকড়কে শেকল না বানিয়ে ফেলেই!
ছয়।। নানান চলে-চালে “ভাষা”
ছয় (ক)।। পথিক, তুমি কি ম্যাপ হারাইয়াছো? (কৃতজ্ঞতাঃ কেতকী কুশারী ডাইসন)
যদি “বাঙলা” কিংবা “বঙ্গ”-র রাজনৈতিক ভূগোলের হরেকরকম্বার প্রসঙ্গে আসি, তাহলে ব্যাপারটা কিরকম দাঁড়ায়?
নীহাররঞ্জন রায়কে মেনে চললে দেখতে পাই, তথাকথিত প্রাচীন বাংলায় অনেকগুলো আলাদা আলাদা জনপদ ছিল, যেমন পুণ্ড্র, গৌড়, রাঢ়, সূক্ষ্ম, বঙ্গ, তাম্রলিপ্তি, সমতট ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো প্রত্যেকটাই নিজের মতো করে স্বতন্ত্র ছিল, একে অপরের সাথে মিলমিশ ছিল না তেমন।
ষষ্ঠ-সপ্তম শতক নাগাদ শশাঙ্কের আমলে প্রথমবার এই জনপদগুলোকে একটা রাজনৈতিক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা হয়। পাল এবং পরে মুসলমান শাসকরা এসে সেই এক করে দেওয়ার কাজটা আরও এগিয়ে নিয়ে যান। এই সময় থেকেই “গৌড়” নামটা একটু একটু করে গোটা বাংলার প্রতীক হয়ে উঠতে শুরু করে।
“গৌড়বর্ধন” নামটা শুনলেই বাঙালির মনে একটা আলাদা টান আসে। লক্ষ্মণসেনের ক্ষেত্রেও একই কথা। এইভাবে দেখলে মোটামুটিভাবে বাঙালির তিনটে পরিচয় পাওয়া যায় — পুণ্ড্রবর্ধন, গৌড় আর বঙ্গ।
আসল ব্যাপারটা হলো, দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ নিজেদের নাম নিয়ে ভীষণ গর্বিত — কেউ পুণ্ড্র বলে, কেউ দক্ষিণ বাংলা বলে, কেউ চট্টগ্রাম বা সিলেটের কথা তোলে। পশ্চিম বাংলায় রাঢ়ের উত্তর-দক্ষিণ ভাগ, তারও আবার উপবিভাগ — এইসব নিয়ে টানাপোড়েন চলতেই থাকে। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝে রাঢ়ের মতো প্রাচীন জনপদগুলো ধীরে ধীরে “গৌড়” নামের মধ্যে মিলিয়ে গেছে। ফলে গৌড় অনেক বড়ো একটা এলাকা হয়ে উঠছিলো।
গৌড়াধিপতি শশাঙ্ক এবং পাল-রাজাদের আমলে “গৌড়” নামটার বেশ prestigious ছিলো, ফলে গৌড়ীয় পরিচয়টা গোটা পূর্বাঞ্চলের পরিচয় হয়ে উঠল। ভিন্-প্রদেশীরাও এটাকে মেনে নিল — এমনকি নবম শতকের শিলালেখেও এর প্রমাণ আছে।
পাল ও সেন রাজাদের আমলে লক্ষ্মণসেনের মতো রাজারা “গৌড়েশ্বর” উপাধি নিতেন। মানে গৌড় তখন শুধু একটা শাসকবর্গের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।পুণ্ড্র আর বঙ্গের অধিপতিরা নিজেদের নামের আগে “গৌড়াধিপতি”, “গৌড়েশ্বর” ইত্যাকার নাম দিয়ে স্টেটাস বাড়াতেন।
পরের দিকে — মোগল আমলে — বাংলার বাইরের লোকেরা বাঙালিদের “গৌড়ীয়” বলত, আর অঞ্চলটাকে বলত “গৌড়মণ্ডল”। উনিশ শতকে মাইকেল তো লিখেইছিলেন — “রচিব এ মধুচক্র গৌড়জন যাহে / আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।” আবার রাজা রামমোহনের ব্যাকরণ বইতেও এই ব্যাপারটা লক্ষ করা যায়। তাঁর বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের নাম “গৌড়ীয় ব্যাকরণ”, কিন্তু ইংরেজি বইটার নাম “দ্য গ্রামার অফ বেঙ্গালা ল্যাঙ্গোয়েজ”।পর্তুগিজ বণিকেরা যখন এই ভৌগলিক অঞ্চলে এলেন, তখন তাঁরা দুটো জায়গাকে চিহ্নিত করলেন, “বঙ্গ” এবং “বঙ্গাল বাজার”। পর্তুগিজদের বানানো মানচিত্র দেখলে নজরে পড়ে “গালফ অফ বেঙ্গালা”, অর্থাৎ আজ যাকে মোটামুটিভাবে বঙ্গোপসাগর বলে থাকি।
কিন্তু মজার কথা হলো, “গৌড়” নাম দিয়ে পুরো বাংলাকে এক করার চেষ্টা শেষমেশ সফল হয়নি। কারণ গৌড় আসলে আর্যসভ্যতার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে “কম খাঁটি” বলে বিবেচিত হত অনেকক্ষেত্রেই— ফলে “হিন্দু” আমলে নামটা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা পায়নি। ইংরেজ আমলে এসে “বাংলা” নামটাই চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে স্বীকৃতি পেল — যদিও মোঘল আমলের (ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে আকবরের সময় থেকেই) “সুব-এ-বাংলা” হিসেবে গৌড়ের চেয়ে “বাংলা” নামটাই বেশি টেকসই হয়ে উঠল। এমনকি “বঙ্গাব্দ”-এর হিসেবটাও কিন্তু আদতে আকবরের আমলে হিজরির হিসেব অনুযায়ী চাঁদ-মেলানো বর্ষপঞ্জি মেনেই ঘটেছিলো। এই সুব-এ-বাংলার ব্যাপারটা, এবং তার সঙ্গে গালফের পাশাপাশি চলতে থাকা পর্তুগিজ বাণিজ্যের অঞ্চল হিসেবে “বঙ্গ”, “বঙ্গাল বাজার” ব্যাপারগুলো সাহেবদের সময়ে এসে মিলে-মিশে গেলো – তৈরি করলো “বাংলা” (বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, যার মধ্যে আসামও পড়তো! আমি আসাম থেকে অরুণাচল যেতে গিয়ে এখনো সে ফলক লক্ষ করেছি।) ভূগোলের নির্মাণ। তবে কী সেই “সুব-এ-বাঙলা”-ই আমাদের আজকের “বাংলাদেশ”? না না, ভুল বললুম হয়তো। এরই মাঝে আরেক বিপত্তি ঘটে গেছে। বাঙলা আর পঞ্জাব প্রদেশের মাজা ভেঙে দেওয়া দেশভাগ ভুললে চলবে কিভাবে? সাম্রাজ্যবাদের কৌশলে তৈরি করা এই দেশভাগ থেকেই কিন্তু এই যাবতীয় সঙ্ঘী মারদাঙ্গা। সেখান থেকেই আজকের গোবলয়ের আমদানি করা “হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান” নাড়ার উত্থান, বাঙলাকে ঔপনিবেশিকৃত/কব্জা করবার যাবতীয় চেষ্টাচরিত্তির। আদতে যেটা হয়েছে, মুচলেকা সাভারকরদের দৌলতে দেশটা শুধু ভাগই হয়নি, মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে দুটো প্রদেশের। যে দুটো প্রদেশ পঞ্জাব এবং বাংলা স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছিলো, সুচতুর সাহেব তা আর-এস-এস-কে দিয়ে কাজে লাগিয়ে দিলেন। দেশভাগ না হলে কে আর লাগাতে বসতো কাঁটাতারের বেড়া?
“সীমানা পেরোতে চাই জীবনের গান গাই
আশা রাখি পেয়ে যাবো বাকি দু আনা!”
ছয় (খ)।। খেলার নানান লীলেখেলা
ছোটোবেলা থেকেই দেখছি ফুটবল খেলার মাঠে ত্রয়ীর লড়াইঃ মোহনবাগান-ইস্টবেংগল আর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের লড়াই। স্পষ্টত দেশভাগের প্রতিফলন ঘটছে যেন এই তিন দলে। কার্যগতিকে দেপ্রব বাটি (বাঙাল+ঘটি) বা বাঘ (বাঙাল+ঘটি)। দেপ্রবর বাপ খাঁটি লুঙ্গি-পরা (আমরা আজকাল ঠিক ঠাওরাতে পারিনা কেন যে তীব্র ঘেন্নায় হিঁদু বাঙালিরা “লুঙ্গি-পরা” বলতেই “মোছলমান” বোঝেন) উত্তর কোলকাত্তাইয়া আর মা খাঁটি বরিশাইল্যা। দেপ্রব ইস্টবেংগলের সমর্থক আর তার বাবা মোহনবাগানের। ফলে এই দুই দলের মধ্যে খেলা থাকলে জোর অথচ মিঠে ঝগড়াঝাঁটি চলতো বাপ-ব্যাটায়। অথচ এই অনুষঙ্গে ইলিশ ভাপে আর চিংড়ির মালাইকারি সমান সম্মান বা আদরে খাওয়া হতো আমাদের দুই বাঙাল-ঘটি বাড়িতেই।
অন্য মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব (কলকাতা), যা মোহামেডান এসসি (যা আজকাল ব্ল্যাক প্যান্থার্স’ নামেও পরিচিত), ভারতের অন্যতম প্রাচীন ফুটবল ক্লাব (প্রতিষ্ঠিত ১৮৯১) কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। বর্তমানে (জুন ২০২৬) ক্লাবটির অবস্থা খুবই খারাপ। আর্থিক সংকট ও ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে পুরো মৌসুমে কোনো বিদেশি খেলোয়াড় ছাড়াই শুধুমাত্র ভারতীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে খেলতে হয়েছে। ক্লাবটি গুরুতর আর্থিক সমস্যায় ভুগছে, খেলোয়াড়-কোচদের বেতন বকেয়া রয়েছে এবং এই ক্লাবে কেউ বিনিয়োগ করতে চান না।
এমত পরিস্থিতি যেন সমকালের ভারতের রাজনীতির প্রতিবিম্বন। “মোহামেডান” নামটাও হারিয়ে গেছে। এটা কি ইসলাম-হীন ভারতের হিঁদুয়ানি খোয়াব আর রোয়াব? একেই বলে হিঁদু দেবতার লীলেখেলা! শরৎ চাটুজ্জ্যে কেন যে এমন লাইন লিখলেন, তা আজ হাড়ে-হাড়ে বুঝিঃ “ইস্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের ‘ফুটবল ম্যাচ’। কেননা, পশ্চিমবাংলার বাঙালিরা “বাঙালি” বলতে খালি হিন্দুই বোঝেন। সার্বিকভাবে “বাঙালি” বর্গীকরণের ক্ষেত্রে মুসলমানরা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও হিঁদু বাঙালির মননে এমনভাবেই বিলুপ্ত!
এ এক বিরাট সাইকোসিস!
আরো বলি, খেলার স্টেডিয়ামে গিয়ে দেপ্রব-র শব্দভাঁড়ার সমৃদ্ধ হয়েছে। আবার, ইসলামঘেন্নাকেও সেখানে দেখেছে। মোহামেডান সমর্থকদের নাকি হাতে থাকতো খুড়। ভিন্ন দলের সমর্থকদের ওপর সেই খুড় নাকি চালাতো তারা। আবার “মোহনবাগানের মেয়ে” ছবিতে ঢিল সাপ্লায়ার রবি ঘোষকেও দেখেছি। মাউন্টেড (মাউন্টেন) পুলিশ লাইন টিকিটের লাইন নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে যেকোনো দলের সমর্থকই পাঁচ-দশ পয়সার আইসক্রিম ঘোড়ার একটা বিশেষ জায়গায় ঢুকিয়ে দিতো। তার ফলে যা হওয়ার তাই হতো!
কিন্তু, আশ্চর্য ব্যাপার, ফুটবল-ক্রিকেটের স্টেডিয়ামে বা গানের আসরে বসে দেপ্রব এবং তার বন্ধুরা কোনোদিন ভাবেই নি বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব, হাবিব, আকবর, নৈমুদ্দিন, আজাহার, কিরবানি, বিসমিল্লা খান, বিলায়েৎ খান, আল্লা রাখা— এনারা সব “মুসলমান”। যেদিন ইডেনে ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২-এর পর বিরাট প্ল্যাকার্ডে লেখা হলো “কপিল-আজাহার ভাই ভাই”, তখনই টের পাওয়া গেলো ধম্মের ভাগাভাগির কথা। যা ছিলো অদৃশ্য, তাকে দৃশ্যমান বানিয়ে তোলা হলো। এভাবেই ভারতীয় সেনসাস উত্তরপূর্ব ভারতে যখন লোকগণনা করে কৌম চিহ্নিত করতে লাগলেন, তখনই এক কৌমের সঙ্গে আরেক কৌমের ঝামেলা বেঁধে গেলো।
উস্তাদ বিসমিল্লা খান এখানে বড়ো গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলে গেছেন। গৌতম ঘোষের ডক্যুতে রশিদ খানের তোলা প্রশ্ন “গানের মজহব আছে কি না”-র জবাবে তিনি বলছেন – উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, হিন্দু, ইসলাম, শিখ, ইসাই – সবেতেই তো একই সুরঃ সারেগামাপাধানিসা, সানিধাপামাগারেসা! এবার তিনি নানানরকমভাবে আজান গাওয়ার হরেক তরিকা গেয়ে দেখান। বললেন, লোকে ভাবে নামাজ কেবলই আল্লার বন্দনাটুকুই – কিন্তু আদতে “ইয়ে রাগ হ্যায়”! এরপর তিনি বৈষ্ণব গানে চলে যান। উনি আমেরিকার নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন শুধুমাত্র গঙ্গার জন্য। আমেরিকায় তো বেনারসের গঙ্গা মিলবে না! এখন যখন বিসমিল্লা ও বিলায়েৎ-এর যুগলবন্দীতে “মোহে পনঘট পে নন্দলাল…” শুনি, তখন ওঁদের দু’জনের মুখের দিকেই বিভোর হয়ে তাকিয়ে থাকি। তাঁদের শারীরিক গীতভঙ্গিমা নিজেই আস্ত একটা গান হয়ে ওঠে। এই তো আসলি লীলেখেলা!
আসুন, দম নিতে এবার একখানা গান শুনে নেওয়া যাকঃ
“মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের খেলা হয়েছে
দু’দলের এক দল নয় হেরে গিয়েছে
খেলাতে হার-জিত তো আছেই আছে
তাই নিয়ে কেন এত মারামারি দলাদলি
খেলার মাঠে খেলা হলো
কেউ জিতলো কেউ হেরে গেলো
খেলার শেষে হাত মিলিয়ে যে যার ঘরে চলে গেলো
এই ঝুটঝামেলার জড়িয়ে পড়ে আমরা কেন মরি
কেন দুর্দিনের এই বাজারে ভাই হাতাহাতি, ঘুষোঘুষি … জরাজরি করি
আমরা করি দলাদলি
কেউ বাঙাল কেউ ঘটি বলি
মুখের হাসি প্রাণের কথা
দিয়েছি সব জলাঞ্জলি
কেউ চড়চাপাটি খাচ্ছি শুধু
ভাঙছি যা সব ছিলো
হায় চিংড়ি ইলিশ মাছের দাম
বাইশ টাকা কিলো!” (অনুপ ঘোষালের গলায় হেমন্তবাবুর সুরে শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “মোহনবাগানের মেয়ে” ছবিতে)
এখানে হারা-জেতার প্রশ্নটা বাতিল হয়ে আহ্লাদের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আমরা জন হৌলিহানের ম্যাচ রিপোর্ট (ইন্দো-পাক ম্যাচ, ১৯৯৯) থেকে পাওয়া একটা ঘটনার কথা এখানে বলতে চাই। একজন একা সমর্থক, গায়ে ভারতীয় পতাকা জড়িয়ে আর মাথায় পাকিস্তানি সান হ্যাট পরে, পুরো ইন্দো-পাক ক্রিকেট লড়াইয়ের সারমর্মটা বলে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “এটা কোনো যুদ্ধ নয়, এটা ছিল একটা ক্রিকেট খেলা”। সত্যিই তাই। কার্গিল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ এক বিশেষভাবে স্মরণীয় উক্তিই বটে।
আসলে সবকিছুই তো খেলা, নয়তো লীলা। তাই আমরা আমাদের খেলা-বিষয়ক সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা শেষ করব রামগড়ের রামলীলা দিয়ে। অনুরাধা কাপুর ১৯৭৮ সালে লিখেছিলেন যে, লীলার শেষে রাবণ রামকে জড়িয়ে ধরেছিলেন আর রামও স্নেহের সঙ্গে তা শান্তভাবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ ঘটনার পর কাপুর, ভারুচা সহ অনেকেই লক্ষ করেছেন যে, রামের যে কোমল ও শান্ত ছবি ছিল, সেটাকে ভেঙে এক রাগী, উগ্র রামের ছবি তুলে ধরা হয়েছে। এটাও কি তাহলে খেলারই অংশ, নাকি লীলারই অংশ?
রামানুজের “লীলা”র তত্ত্বে এক ব্রেহ্ম তিনি বহু (“ভূমৈব সুখম” মনে করুন; ভূমা হলো এই বহুত্ব, এই নানাত্ব) হন, জীব-জগৎ তৈরির শৃঙ্গারে মাতেন, কারণ একার মিথুনে (solitary sex!) নেই কোনো আনন্দ! আজকের ভারতরাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষেত্রে আমরা কি সেই বহুস্বরের উদযাপনের খেলার দিকেই এগিয়ে যাবো এবার?
ছয় (গ-১)।। “আমি যে তোর ভাষা বুঝি নে…”
সমস্ত মানুষ হোমো স্যাপিয়েন্স হিসেবে খুব স্বল্প সংখ্যক শব্দ দিয়ে অসীম বাক্য বানাতে পারে—এটা তার সহজাত সৃজনশীল ক্ষমতা। বৌদ্ধিক ভাষাতত্ত্বের কাজ হল সমস্ত মানুষের এই ভাষিক অভেদের গণিতকে বোঝা। এই যে এই সসীম শব্দ দিয়ে অসীম বাক্য বানানোর মানবিক ক্ষমতা, এটা নোম চমস্কি আজ থেকে ১৯৫৭ সালে প্রমাণ করেছিলেন, অথচ আমার একসময়ের প্রতিষ্ঠানের সবজান্তা ডিরেক্টর খ্যাক করে হেসে এই অসীমতার প্রস্তাবকে ‘impossible’ বলে নাকচ করে দিয়েছিলেন।
ভাষার যে ভিন্নতা দেখি, যেমন শব্দের বা ধ্বনির, তা নেহাতই অবাধ বা আরবিট্রারি (যা-ইচ্ছে-তাই)। তুমি জল-পানি-একোয়া-ওয়াটার যাই বলো না কেন H₂O বস্তুটি H₂O-ই থাকবে। আমরা যদি এখন চুক্তি করি যে H₂O বস্তুটিকে “দৃঘাংচু” বলে ডাকব, তাহলে কি আর আসে যায়! পিটার বিকসেলের “টেবিল হলো টেবিল” মনে করুন।
এই যাচ্ছেতাই-অবাধ-প্রাতিভাসিক অংশটা ভাষার বাইরের দিক—শ্রেফ কাঁচামাল মাত্র। আমাদের কগনিটিভ ডোমেইনে (সাধারণভাবে বলতে পারো মনে বা মস্তিষ্কে) প্রাকনির্ধারিত আকারের খোপে খোপে এই কাঁচামালগুলো আকৃত হতে থাকে। সোস্যুর এটা দাবা খেলার উদাহরণ দিয়ে বেশ বুঝিয়েছেন। ধরুন, আপনার দাবা খেলার ফুটোগুলো কাঠ, মাটি বা গজদাঁত দিয়ে তৈরি—এই কাঁচামালের বদল ঘটলে কি দাবা খেলার প্রক্রিয়ায় কিছু আসে যায়? “শতরঞ্জ কে খিলাড়ি” মনে করে নিন। সেখানে তো খেলা চলে নিয়মের জোরে। অনেকটাই সেভাবেই—ভাষার ক্ষেত্রে চিন্তার বিষয়গুলো ভিন্ন হলেও, খেলাটা চলতে থাকে বায়োলজির ভেতরে থাকা সহজাত গণনাভিত্তিক নিয়মের জোরে।
কিন্তু আকৃত-নিয়মের অভিন্ন সর্বজনীনতা ভুলে আমরা ক্যাচাল পাকাই ভাষার অবাধ বিভেদ নিয়ে। এই অবাধ বিভেদের প্রতিভাসিক চরিত্রে আমরা মূল-আরোপ করি; ভালো-খারাপ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ ভাষার নিরিখ বানাই; বলি ওটা উপপত্নীসম উপভাষা, এটা ভাষা বা তোমারটা লোকভাষা বা আদিবাসী ভাষা। এখন আমরা এই প্রতিভাসিকতার রাজনীতি পাঠ নেব।
ধরা যাক, কোনো একটা অঞ্চল হঠাৎ করে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে গুরুত্ব পেয়ে গেল, মানে শহর হয়ে উঠল। আশপাশের গাঁ থেকে লোক এল; ছাপাখানা তৈরি হল—গণ মাধ্যমগুলো আস্তে আস্তে পাখা মেলল। এবার হল কী, সেখানকার ভাষাটা ভাষা-অতিরিক্ত একটা গুরুত্ব পেয়ে গেল। সেই ভাষার ব্যাকরণ-অভিধান বানানো হল। সেই ভাষার নাম দেওয়া হলো Standard ভাষা। অনেকটা যেন পুরোনো পুঁজিবাদী লব্জ ‘Standard tool’-এর মতো ব্যাপারস্যাপার— সমস্তটাই পণ্য— যা সব জায়গায় ফিট করবে। ব্যাকরণে এই ‘শুদ্ধ’ ভাষার সঞ্চার শুরু হল। অন্য/ ভিন্ন ভাষা বৈচিত্র্যগুলোর নাম হয়ে গেল ‘উপ’ভাষা। স্ট্যান্ডার্ড ভাষার একমেবাদ্বিতীয়ম্ অধিপত্যের জোরে ‘উপ’-নামধারী ভাষাবৈচিত্র্যগুলো হয়ে গেল পরাজিত ভাষা এবং তাদের বক্তারা হয়ে গেল বন্দি বক্তা! তাদের মাতৃভাষার মাতৃদুগ্ধের বদলে এই নির্দেশমূলক বা প্রেসক্রিপ্টিভ ব্যাকরণের ফিডিং বটল স্মিত ভাষার প্যাকেজড দুধ খেতে হল।
লক্ষ্মীনাথ বেজবড়ুয়া তাঁর জীবনীতে যা বলেছেন, সেটা এবার শুনে নেওয়া যাক:
“কথা লিখতে পড়তে শেখার পর মদনমোহন তকলকারের বাংলা শিশুশিক্ষা আমাকে পড়তে দেওয়া হল, কারণ তখনকার দিনের দেশের শাসকতন্ত্রের বিপরীত বুদ্ধির ফলে আসামের বিদ্যালয় সমূহে অসমীয়া ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষা শেখানো হত, অসমীয়াদের নিজের মাতৃভাষা অসমীয়া ভাষা জায়গা পেয়েছিল অবর্জনা ফেলার জায়গাতে আর বিদেশিনী বাংলা ভাষা মায়ের স্থান অধিকার করে নিয়ে অসমীয়া শিশুদের মাতৃস্থানের ‘স্থানে ফিডিং বটল’ দিয়ে তাদের ‘কাল কাক ভাল কাক’ শিখিয়ে দিয়েছিল।” (মোর জীবন-মরণ। অনুবাদঃ আরতি ঠাকুর। ১৭-১৮ পাতা)
এ ফিডিং বোতলের উপমাটা ইভান ইলিচেও এসেছে। ১৯৮১-তে লেখা ডি.পি. পটনায়েকের একটা বই-এর ভূমিকায় হিস্পানিয় একটা ব্যাকরণের আপিসি লিটারেসির কেন্দ্রীয় ব্লক বোঝাতে গিয়ে ইলিচ এই উপমাটা ব্যবহার করেন। গ্রেট মেন থিংক অ্যালাইক? তবে কিনা লক্ষ্মীনাথের মনকষ্টের জায়গাটা আমি বুঝি। ঠাকুর বাড়ির জামাই হয়ে তাঁকে ক্লাসিক বাঙালিয়ানায় এমনই হতে হয়েছিল যে, প্রজ্ঞাসুন্দরী সম্পাদিত ‘পুণ্য’ পত্রিকায় তাঁর পদবি ছাপা হত ‘বিদ্যাবর্গ’—হিসেবে!
কোনটা কেন্দ্রীয় স্থিত তথা শুদ্ধ ভাষা হবে আর কোনটা ‘উপ’ভাষা হয়ে প্রায়ে চলে যাবে—এই হিসেবটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রনৈতিক এবং ঐতিহাসিক ঘটনা মাত্র। এখন এই বর্গমালা তথা কেন্দ্র-প্রান্তের বাহ্যরিকে মান্যতা দিয়েই ‘শব্দতত্ত্ব’ বা ফিললজি বা পুরোনো ভাষাতত্ত্ব কাজকর্মে চালায়। এবার স্মিত ভাষা ও ‘উপ’ ভাষা মিলে যে ‘ভাষা কম্যুনিটি’-র ধারণা সেটাও বেশ গণ্ডগোলের। কয়েকটা নমুনা পেশ করে দেখা যাক:
১. ডেনিশ আর নরওয়েজিয়ানের মধ্যে বাংলা আর অসমীয়া-ওড়িয়ার মধ্যে পারস্পরিক সমবোতা/বোঝাপড়ার মাত্রা বেশি হলেও এরা কেউ কারোর ‘উপভাষা’ নয়, স্বতন্ত্র ভাষা! কেন?
২. অথচ ক্যান্টোনিজ আর মান্দারিন, কলকাতার বাংলা আর সিলেটি, অথবা চাটগেঁর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাত্রা কম হলেও, এমনকি ভাষিক কাঁচামাল বা সাবস্ট্যান্সের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মিলজুল মাত্রাগতভাবে কম হলেও ‘উপ’-ভাষা ক্যান্টোনিজ আর মান্দারিন এবং কলকাতার বাংলার উপভাষা সিলেটি বা চট্টগ্রামের ভাষা, কেন?
এই দুটো নমুনা থেকে আবারো একটা ব্যাপার স্পষ্ট: “স্বাভাবিক” ভাবে টানা হয় না, টানা হয় নানান আর্থ-রাজনৈতিক বহুকারণবাদের মধ্যে দিয়ে। কে কার বাড়ির মধ্যে ঢুকবে অথবা ঢুকবে না, তা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর যোগযোগ বা মেডিয়েটরদের রাষ্ট্রীয় নেগোশিয়েশনের ওপর নির্ভর করে এবং মেডিয়েটরদের হাতে পুঁজি থাকলেই তবেই ভাষিক নেশন স্টেট বা ধর্মীয় নেশন স্টেট তৈরি হয়। পুরোনো ভাষাতত্ত্ব বর্গমালাকে লেজিটিমেট করত; নিজস্ব ডিসিপ্লিনের মধ্যে এই বর্গমালাকে ‘বৈজ্ঞানিক’ করে তুলত, এবং একটা জেনিয়লজি বানাতো—এ কথা আগেও বিশদে বলেছি। সেখানে প্রতিভাসিক অবাধ ধ্বনি ও শব্দের বিবর্তন দেখা যাচ্ছে সেইসব কল্পিত ভাষিক গোষ্ঠীর—যাঁরা কোনো না কোনোভাবে ভাষা-জাজ, ভাষা-ম্যানেজার বা ভাষা-পুলিশের কাজ করছেন, তাঁরা কেউ ঠিক আজকের অর্থে ভাষাতাত্ত্বিক নন! একেই বলে নেশন স্টেটের খেয়াবনামা!
ভাষা-আন্দোলন নিয়ে যে উদযাপন, যে স্মরণ, যে একাডেমিক কাজকর্ম চলতে থাকে চারপাশে, তার আসল উপকারভোগী কারা? ২১শে ফেব্রুয়ারির রিচুয়াল আর ১৯শে মে-র স্মরণ হয় বটে, কিন্তু এই ধরণের উপস্থাপন আসলে বিদ্যে ব্যাওসায়ীদের কাজে লাগে।
মাঠকম্মের কথাই বলা যাক। ১৯৯৮-৯৯ সালে দেপ্রব ভাষা-আন্দোলন নিয়ে একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করেন, যেটা পেতেই তাঁকে তাঁর সে-সময়ের প্রতিষ্ঠানের Technical Advisory Committee-এর সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল। দেপ্রব বলতে চেয়েছিলেন, ভারতে ভাষার রাষ্ট্রের কোনো সুনির্দিষ্ট সীমা নেই, একই মানুষ একাধিক ভাষায় নিজের পরিচয় খোঁজেন, এবং “ভাষিক নেশন স্টেট” ধারণাটা আসলে ইউরোপ থেকে আমদানি করা। এই কথাগুলো প্রতিষ্ঠানের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
মাঠে নেমে দেপ্রব যা দেখলো সেটা চমকে দেওয়ার মতো। ছত্তিশগড়, সাঁওতাল পরগনা, বুন্দেলখণ্ড, কামতাপুর, দার্জিলিং, পাহাড়ি ভাষা-অঞ্চল — সর্বত্র একই ছবি। ভাষিক রাষ্ট্রের দাবি মূলত কিছু শিক্ষিত মধ্যবর্গের প্রকল্প। গরিব নিম্নবর্গের মানুষেরা খাওয়া-পরা-বাঁচার লড়াইয়ে এতটাই ব্যস্ত যে ভাষা-রাষ্ট্র নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। উল্টে তারা নিজের ঘরের ভাষা নিয়ে এক অদ্ভুত হীনমন্যতায় ভোগেন — “ভালো”(?) ভাষা শেখার চেষ্টা করেন, গবেষকদের সঙ্গে নিজের ভাষায় কথা বলতে সংকোচ পান, ভয় পান ভাষা-পুলিশরা এসে তাদের ঘরের ভাষার ভুল ধরবেন।অন্যদিকে যে শিক্ষিত মধ্যবর্তী শ্রেণি ভাষিক নেশনের স্বপ্ন দেখছেন, তাঁদের “উন্নয়ন”-এর ধারণাটা পুরোপুরি পুঁজিকেন্দ্রিক সংসদীয় গণতন্ত্রের ছাঁচে ঢালা। সমস্যাগুলো আর্থনৈতিক-সামাজিক, কিন্তু সমাধান খোঁজা হচ্ছে পুঁজিকেন্দ্রিক কাঠামোর মধ্যে। আর যাঁরা কিছুটা পেয়েছেন — গোর্খাল্যান্ডের হিল কাউন্সিল, পরে ছত্তিশগড় বা ঝাড়খণ্ড — তাঁদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে “সাগিনা মাহাতো সিনড্রোম” [Formal Elaboration of Social Hierarchy (FESH, a la Probal Dasgupta)-র ভেতরেই স্রেফ ভূমিকা বদলের খেলা]। অর্থাৎ তাঁরা প্রতিষ্ঠিত পদমর্যাদার ধাঁচার মধ্যে ঢুকে আমজনতার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন, এবং তাঁদের নিজস্ব স্বর হারিয়ে অপরের স্বর হয়ে উঠছে — সেই “অপর” যাঁরা তাঁদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসবাদী বলেন। এই “অপর”-এর রাজনীতিটা আরও গভীরে যায়। ভাষার এক বাঁ একাধিক কৌম আছে। সেই কৌমে তথাকথিত “ভালো” ও “খারাপ” ভাষার তারতম্য আছে, এবং ভাষার বিবর্তনকেই “উন্নয়ন” বলা হয়। ফলে ভাষা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, আর “উত্তরাধিকার” সূত্রে সেটা পাওয়াকে গৌরবমণ্ডিত করা হয়।একাডেমিক প্রতিষ্ঠান এই পুরো ব্যাপারটায় কীভাবে কাজ করে সেটাও লেখক দেখাচ্ছেন। ভাষিক নেশনের দাবির পেছনে যে “জ্ঞানতাত্ত্বিক” ঢাঁচা দেওয়া হয়, সেটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তৈরি হয়। চাকরের আয়নায় দেখে সন্ত্রাসী ও সমর্থক একই পথে হেঁটে “Linguistic Human Right”-এর কথা তোলেন, এবং সেই অধিকারের নামে রাষ্ট্র-বিরোধী আন্দোলন করা শুরু দেওয়া হয়। ফলত সব আন্দোলনই হয়ে ওঠে “রাষ্ট্র-বিরোধী, দেশবিরোধী”।প্রতিষ্ঠান এই ধরনের আখ্যানধর্মী উপস্থাপন চায় না। তারা চায় শিডিউল-নির্ভর সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, Classified রিপোর্ট, সাংখ্যিক ওজন দিয়ে কাজ — যেগুলো “বৈজ্ঞানিক”। দেপ্রব-র পাল্টা যুক্তি ছিল: কাউকে সংখ্যায় পরিণত করা মানে তাকে খাটো করে ফেলা, কোনো সংখ্যাতত্ত্ব বা গণিত দিয়ে মানুষের বাস্তব বোঝা যায় না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে ভাষার ভাষাত্ব হয়ে ওঠা পুঁজি-নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থাই বটে। পুঁজি বিনিয়োগেই একটা ভাষা “ভাষা” হয়ে ওঠে। কেননা, ভাষাকে ভাষাত্ব তৈরি করতে গেলে অনেককিছু যোগাড়-যন্তর করতে হয়। বিধানসভা, ছাপাখানা, বেতার-মাধ্যম, দূরদর্শন বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয় লাগে। সেসব বহুত খরচাপাতির ব্যাপার।
ভাষার কুলুজির খোয়াবের সঙ্গে তাই পুঁজি জড়িয়ে আছে। কে কোন ভাষাকে “ধ্রুপদী” বানাবেন বা বানাবেন না, সংবিধানের অষ্টম তফসিলে রাখবেন কী রাখবেন না, সেটা ধূর্ত আর্থ-রাজনৈতিক খেলা। একান্নবর্তী পরিবার যখন টুকরো হয়ে অণু-পরিবারে পরিণত হয়, তখন আলাদা করে টিভি, এসি মেশিন, ইত্যাদি কিনতে হয়। ভাষার ঘরগুলো আলাদা হলে তাই পুঁজিপতিরই লাভ। যখনই কোনো গোষ্ঠিকে (এক্ষেত্রে ভাষা-গোষ্ঠি) “এনুমারেট” করে ফেলা হয়, মেপে নেওয়া হয়, তখনই তাদের মধ্যে ভাগাভাগি চলে আসে, সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দেওয়া হয় ইত্যাদি। যতো বেশি সংঘর্ষ বানিয়ে তোলা যাবে, ততো বাড়বে ঋণের পরিমাণ, আর ততোই বেশি তথাকথিত “তৃতীয় বিশ্ব” নির্ভর করতে শুরু করতে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের মতোন সংস্থার আদেশ-নির্দেশের ওপরে। মণিপুরের মেইতেই-কুকী সংঘাতও এক্ষেত্রে উল্লেখ্য বিষয়।
ছয় (গ-২)।। “রামরাজ্য” আর রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে
এবার একটু পরশুরামে ডুব দেওয়া যেতে পারে। গপ্পের নাম “রামরাজ্য”। দেখা যাক কী বলা হচ্ছে সেখানেঃ
“অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ সুবোধ রায়ের বাড়িতে প্রতি শনিবার একটি প্রেতচক্র বা সেয়াঁসের (Séance) অধিবেশন বসে। ভূতনাথ নন্দী নামের একজন মিডিয়াম সেখানে পরলোকগত আত্মাদের আহ্বান করে। একদিন ভূতনাথের ওপর স্বয়ং মহাবীর হনুমানের আত্মা ভর করে। হনুমান বর্তমান যুগের রাজনৈতিক নেতাদের—বিশেষ করে নিজেদের স্বার্থে হানাহানি ও গণতন্ত্রের নামে চিৎকার করা দেশপ্রেমিকদের কার্যকলাপ দেখে অত্যন্ত বিরক্ত।
ভূতনাথের মুখ থেকে শব্দ হ’ল—খ্যাঁক খ্যাঁক। সুবোধবাবু বললেন, কে আপনি প্রভু?
অবধবিহারী। রাষ্ট্রভাষা হিন্দীমে পুছিয়ে, রামচন্দ্রজী বাংলা সমঝেন না। অপ কৌন হৈঁ মহারাজ?
[“হিন্দি রাষ্ট্রভাষা” কথাটা অ-সাংবিধানিক। সংবিধানে ৮ নং শিড্যুলে যে ২২ টা ভাষাকে অগ্রণী ভাষাকে মান্যি দেওয়া হয়েছে, তার কোথাও “National Language” কথাটা নেই। এ নিয়ে পরে আরো কথা পাড়ছি।]
আবার খ্যাঁক খ্যাঁক। কবিরত্ন হাতজোড় ক’রে সবিনয়ে বললেন, প্রভু, যদি আমাদের অপরাধ হয়ে থাকে তো মার্জনা করুন। কৃপাপূর্বক বলুন কে আপনি।
ভূতনাথের মুখ থেকে উত্তর বেরুল— অহম্মারুতিঃ।
অবধবিহারী। আরে, ই তো চীনা বোলি বোলছে!
কবিরত্ন। চীনা নয়, দেবভাষায় বলছেন —আমি মারুতি। স্বয়ং পবননন্দন শ্রীহনুমানের আবির্ভাব হয়েছে।
অবধবিহারী। জয় বজরঙ্গবলী মহাবীরজী!—
রাম কাজ লগি তব অবতারা।
কনক বরন তন পর্বতাকারা॥
প্রভু, অপ হিন্দীমে কহিয়ে, রামরাজ্যকি ভাষা।
ভূতনাথের জবানিতে মহাবীর আর একবার সজোরে খ্যাঁক ক’রে উঠলেন, তার পর বললেন, রামরাজ্যের ভাষার তুমি কি জান হে? এখন গন্ধমাদনে থাকি, কিন্তু আমার আদি নিবাস কিষ্কিন্ধ্যা, মাইসোরের কাছে বেলারি জেলায়। আমার মাতৃভাষাই জগতের আদি ও বনিয়াদী ভাষা। যদি সে ভাষায় কথা বলি তবে তোমাদের রাজাজী আর পট্টভিজী হয়তো একটু আধটু বুঝবেন, কিন্তু জহরলালজী রাজেন্দ্রজী আর তোমরা বিন্দুবিসর্গও বুঝবে না।
বিপাশা। যাক যাক। আপনি যখন বাংলা জানেন তখন বাংলাতেই বলুন।
মহাবীর। কিরকম বাংলা? ঢাকাই, না মানভূমের, না বাগবাজারী, না বালিগঞ্জী? (একটু আগের আলোচনায় বাংলা-কে “এক” করবার বিষয়ক সমস্যা খেয়াল করুন। — দেপ্রব)
বিপাশা। আপনি মাঝামাঝি ভবানীপুরী বাংলায় বলুন, তা হ’লে আমরা সবাই বুঝতে পারব।
কবিরত্ন। প্রভু মারুতি, আপনার আগমনে আমরা ধন্য হয়েছি, কিন্তু ভগবান শ্রীরামচন্দ্র এলেন না কেন?
মহাবীর। তাঁর আসতে বয়ে গেছে। তোমাদের কিএমন পুণ্য আছে যে তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে চাও? তাঁর আজ্ঞায় আমি এসেছি। এখন কি জানতে চাও চটপট ব’লে ফেল, আমার সময় বড় কম।
সুবোধ। শুনুন মহাবীরজী। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু আর কিছুই পাই নি।—
কবিরত্ন। অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, গৃহ নেই, ধর্ম নেই, সত্য নেই, ত্যাগ নেই, বিনয় নেই, তপস্যা নেই—
অবধবিহারী। বিলকুল চোর, ডাকু, লুটেরা, কালাবাজারুয়া, গাঁঠ-কটৈয়া—
ভুজঙ্গ। পুঁজিপতির অত্যাচার, সর্বহারার আর্তনাদ, জুলুম, ফাসিজ্ম, ধাপ্পাবাজি, কথার তুবড়ি, ভাইপো-ভাগনে-শালা-শালী-পিসতুতো-মাসতুতো-ভরণতন্ত্র —
কানাই। বিদেশী গরুর প্ররোচনায় স্বদেশদ্রোহিতা, ভারতের আদর্শ বিসর্জন, স্বার্থসিদ্ধির জন্য মিথ্যার প্রচার, কিষান-মজুদরকে কুমন্ত্রণা, বোকা ছেলেমেয়েদের মাথা খাওয়া, পিস্তল, বোমা—
মহাবীর। থাম থাম। কি চাও তাই বল।
অবধবিহারী। হামি বোলছি, শুনেন মহাবীরজী।— চারো তরফ ঘূস-খবৈয়া, সব মুনাফা ছিনিয়ে লিচ্ছে। বড় কষ্টে রহেছি, যেন দাঁতের মাঝে জিভ। বিভীখনজী জৈসা বোলিয়েছেন—
সুনহু পবনসুতে রহনি হমারী।
জিমি দসনন্হি মহু জীভ বিচারী॥
প্রভু, এক মুক্কা মার কে ইয়ে সব দাঁত তোড়িয়ে দেন।” (নজরটান সংযোজিত)
এখনকার টালমাটাল সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো মাল-মশলা পেলেন না কি?
এই “রামরাজ্য” আখ্যানে কোনো না কোনোভাবে internal colonization (নানান মিলমিশওলা ভাষাদের শাখা-প্রশাখাকে জোর করে এক করে একটা “স্ট্যান্ডার্ড” বাংলা চাপিয়ে দেওয়া)-র ব্যাপারটা চলে আসছে না কি, যাকে ফিলিপসন সাহেব বলেন Linguistic Imperialism? আবার আরেকদিকে বাহ্যিক উপনিবেশিকতাটাও (external colonization) রয়েছে (হিন্দি আর আংরেজি এসে হামলা করছে বাংলার ওপর)।
আচ্ছা, সত্যিই কী তবে হিন্দি ভারতের রাষ্ট্রভাষা নয়?
না। ভারতের কোনো রাষ্ট্রভাষা নেই। হিন্দি তো নয়ই। এ নিয়ে বিশদে বলা যাক।
ভারতের সংবিধান যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন ভাষার প্রশ্নটা ছিল রীতিমতো বিস্ফোরক। গণপরিষদে হিন্দিকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাশ হয়েছিল মাত্র একটি ভোটের ব্যবধানে — একটা ভোট এদিক-ওদিক হলে ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো। শেষমেশ সংবিধানের সপ্তদশ ভাগে, মানে ৩৪৩ থেকে ৩৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে, পুরো ব্যাপারটা একটা রাজনৈতিক আপোসের মাধ্যমে মিটমাট করা হলো।
সেই আপোসের মূল কথাটা হলো এই — হিন্দি হবে কেন্দ্রের দাপ্তরিক ভাষা, আর ইংরেজি হবে সহযোগী দাপ্তরিক ভাষা, যাকে ইংরেজিতে বলে Associate Official Language। দুটো ভাষা পাশাপাশি চলবে, কিন্তু সাংবিধানিক মর্যাদার দিক থেকে তারা এক জায়গায় নেই — হিন্দি এক্কেরে ওপরে, ইংরেজি ঠিক তার পাশে, কিন্তু তাও কিছুটা “নিচে”।
৩৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদে তিনটে উপধারায় এটা সাজানো হলো। প্রথমটায় বলা হলো — দেবনাগরী হরফে হিন্দিই কেন্দ্রের ভাষা। দ্বিতীয়টায় বলা হলো — তবে আরও পনেরো বছর ইংরেজি চলবে, কারণ হঠাৎ করে ইংরেজি বন্ধ করে দিলে দক্ষিণের ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো একেবারে আঁতে ঘা খাবে। তৃতীয়টায় সংসদকে ক্ষমতা দেওয়া হলো — চাইলে সেই পনেরো বছর পরেও আইন করে ইংরেজি রাখতে পারবে।
সেই আইনটাই হলো ১৯৬৩ সালের Official Languages Act। এই আইনে বলা হলো — সংসদের কাজকর্মে এবং কেন্দ্রের সমস্ত দাপ্তরিক লেনদেনে হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে থাকবে। কিন্তু আসল সমস্যাটা উপস্থিত হলো ১৯৬৫ সালে, যখন সেই পনেরো বছরের মেয়াদ ফুরোলো। ঠিক তখনই তামিলনাড়ুতে আগুন জ্বলে উঠল — রাস্তায় বিক্ষোভ, আত্মাহুতি, রক্তপাত। মানুষ বললে, হিন্দি আমাদের ওপর চাপানো চলবে না। সেই আন্দোলনের চাপে কেন্দ্র পিছু হটতে বাধ্য হলো। ১৯৬৭ সালে আইন সংশোধন করে বলা হলো — যতদিন একটাও অহিন্দিভাষী রাজ্য চাইবে, ততদিন ইংরেজি চলবেই। অর্থাৎ দক্ষিণের রাজ্যগুলোকে একটা অলিখিত ভেটো দেওয়া হয়ে গেল — তাদের সম্মতি ছাড়া ইংরেজি সরানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ল।
বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার। ৩৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে — সমস্ত আইন, বিল, সংশোধনী, আদেশের আধিকারিক পাঠ ইংরেজিতেই থাকবে। সুপ্রিম কোর্টে এখন পর্যন্ত ইংরেজিই একমাত্র ভাষা। হাইকোর্টেও মূলত তাই — যদিও কিছু রাজ্য তথাকথিত “আঞ্চলিক” (?) ভাষা চালুর অনুমতি চেয়েছে।
বাকি অনুচ্ছেদগুলোতেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। রাজ্যগুলো নিজেদের দফতরি ভাষা নিজেরা বেছে নিতে পারবে। এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যোগাযোগ হবে হিন্দি বা ইংরেজিতে। যদি কোনো রাজ্যে বড় একটা অংশের মানুষ অন্য ভাষায় কথা বলে, রাষ্ট্রপতি চাইলে সেই ভাষাকে স্বীকৃতি দিতে পারবেন। আর ৩৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে — কেন্দ্রের দায়িত্ব হিন্দিকে ছড়িয়ে দেওয়া ও সমৃদ্ধ করা, সংস্কৃত আর অন্যান্য ভারতীয় ভাষার সম্পদ নিয়ে তাকে একটা সমন্বিত মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা — তবে অন্য ভাষাগুলোকে সরিয়ে নয়।
এখন অষ্টম তফসিলের একটা মজার দিক আছে। সেখানে বাংলা, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, ওড়িয়াসহ বাইশটি ভাষার তালিকা আছে। এই তফসিল মূলত ভারতের “আঞ্চলিক”(?) ভাষাগুলোকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ইংরেজি এই তালিকায় নেই। সেটা অবাক করার মতো না — কারণ ইংরেজির ক্ষমতার ভিত্তিটা তফসিলের স্বীকৃতির মুখাপেক্ষী নয়। প্রশাসন, বিচার, আর অভিজাত মহলের ভাষা হিসেবে তার আলাদা একটা জায়গা আছেই।
আসল ছবিটা তাহলে এই রকম — সংবিধান হিন্দিকে ওপরে রেখেছে কাগজে-কলমে, কিন্তু ইংরেজিকে টিকিয়ে রেখেছে ব্যবহারে। আদালত ইংরেজিতে চলে, সংসদের আইন ইংরেজিতে লেখা হয়, উচ্চ আমলাতন্ত্র ইংরেজিতে কাজ করে। ফলে হিন্দি আপিসি ভাষায় গুরুত্ব পেলেও ক্ষমতার দরজায় কড়া নাড়তে হলে এখনও ইংরেজি জানতে হয়। এটাই ভারতের ভাষা-রাজনীতির সবচেয়ে বড় অসাম্য — আর “হিন্দি চাপানো”র বিতর্কটা তাই আজও শেষ হয়নি। কাজেই, এটা শুধু ভাষার লড়াই নয় — এটা ক্ষমতার লড়াই, পরিচয়ের লড়াই।
ছয় (গ-৩)।। বাংলার সজ্ঞান সংস্কৃতায়ন, বৈদিকীকরণ ও আর্যীকরণ
একটু পিছিয়ে যাই, চলুন।
সালটা ১৭৯৩। সে সময়টা ছিলো বাণিজ্যিক পুঁজিবাদ বিস্তারের সময়। এই সালটার সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কথা। আশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকায় কেরেশ্চান ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে সাদা সাহেবরা ঝাড় খেয়েছিলো। তাই ইংলন্ডের সংসদে যখন ইভানজেলিস্টদের তরফ থেকে দাবি ওঠে “পাপের পাঁকে নিমজ্জিত” heretic heathen নেটিভদের “উদ্ধার” করতে হবে। কিন্তু সেকালের বিলাতি সংসদ এই আবেদন মঞ্জুর করেনি। এ সময়েই কোন বিপাকে, এই ১৭৯৩-তেই, চলে এলেন এক খৃস্টান মিশনারিঃ উলিয়াম কেরী। সংগ্রহ করতে শুরু করলেন বাংলা কথোপকথন। তার প্রথম সংস্করণে দেখা যাচ্ছে আরবি-ফারসি শব্দের বাহুল্য। অন্যদিকে দ্বিতীয় সংস্করণে দেখি সেই আরবি-ফারসি শব্দ বেবাক হারিয়ে গেছে। এই সময়টাকে (সারণী দেখলেই বুঝবেন) গোলাম মুরশিদ বলেছেন, “সজ্ঞান সংস্কৃতায়ন”-এর সময়।
কেন এই দেবভাষার প্রতি টান? ইতিহাসের পাতা আরেকটু পেছনে নিয়ে যাই। হ্যালেডের ১৭৭৯-তে লেখা “The Grammar of Bengala Language”-এ তিনি বাংলা ভাষার আদ্যছেরাদ্দ করেছেন। ১৭৮৪-তে উইলিয়াম জোনস হ্যালেডের পথ ধরেই বাংলাকে নিন্দে করে সংস্কৃতের গুণ গাইলেন। সংস্কৃত, জর্মান, ইতালিয় ভাষার অনুসঙ্গে খুঁজে পেলেন সংস্কৃত ভাষার মিল। এই সময়েই তৈরি হলো শব্দ-বিদ্যা বা ফিলোলজির অভ্যুত্থান (যা কখনোই ভাষাতত্ত্ব বা লিঙ্গুস্টিক্স নয়)। অতএব, ভাষার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হলো “গুড ওরিয়েন্ট”-এর ব্ল্যাংকেট ধারণা। বাদ চলে গেলো ব্যাড ওরিয়েন্ট সেমেটিক ভাষা। ভাষার তরফ থেকে এসলামপন্থীরা হয়ে গেল “ব্যাড ওরিয়েন্ট”। অন্যদিকে ধম্মের তরফ থেকে ভাগটা গেলো উল্টে। একেশ্বরবাদী কেরেশ্চানি আর এসলাম একই পঙক্তিতে চলে এলো। এই হলো নেশন-স্টেটের খোয়াবের মজলিস।
তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না, ফরস্টার, এডমনস্টোন, কেরী প্রমুখ কেন সংস্কৃতায়ণের দিকে ঝুঁকলেন।
আরো একটা কথা এখানে মনে রাখতে হবে। ১৮১৩-র পর থেকে (১৭৯৩-এর ঠিক ২০ বছর পর) কেরেশ্চান পাদ্রীদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেলো কলোনির প্রান্তর। কেননা সে’সময়ে বেনিয়া পুঁজিবাদ থেকে লাফ দেওয়া হলো শিল্প পুঁজিবাদে। আর নেটিভদের কথা বুঝতে পারার জন্য রচিত হতে থাকলো একের পর এক গ্রামার (ব্যাকরণ এক নয়, মহাকাব্য যেমন “এপিক” নয়, পুরাণ যেমন “মিথোলজি” নয়)। এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি মাথায় না রাখলে বহুবাচনিক ভারতে বাংলা ভাষাকে আলাদা করে বোঝা দুঃসাধ্য।
কাজেই, একটু ছোটবেলাকার মতো করে ইতিহাস বই থেকে টেবিল বানানোর মতোন একটা কিছু করা যাক, কি বলেন? এইসব তথ্য পাওয়া গেছে গুলাম মুরশিদের কিতাব থেকে।
| সাল / কাল | ঘটনা | বিবরণ | শ্রেণি |
| ১৭৯০-এর দশক (আনু.) | ফরস্টার — প্রাথমিক ভাষার প্রবণতা | ফরস্টারের বাংলা ভাষার গোড়ার দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি আরবি-ফারসি শব্দ ছিল। তাঁর অনুবাদের প্রাথমিক পর্বে আরবি-ফারসি শব্দের প্রাধান্য লক্ষণীয়। | ভাষা |
| ১৭৯৩ | ‘কর্ণওয়ালিস কোডে‘র প্রথম আইনের সূচনায় ‘শ্রীশ্রীরাম‘ | ১৭৯৩ সালের ‘কর্ণওয়ালিস কোডে’র প্রথম আইনের সূচনায় ‘শ্রীশ্রীরাম’ লেখা ছিল। এই সংস্করণটিই হিন্দু দেবদেবীর নামের প্রথম উপস্থিতি। আনিসুজ্জামান উল্লেখ করেন যে ১৭৯৮ সালের অনুবাদ থেকে দেবদেবীর নাম উল্লেখিত হয়েছে বলে যে দাবি, তা আসলে ১৭৯৩ সাল থেকেই শুরু। | আইন |
| ১৭৯৩ | দ্বিতীয় সংস্করণে দেবদেবীর নাম বর্জন | ১৭৯৩ সালের ৯৫, ৯৬ এবং ৯৭ পর্যন্ত সেগুলো দ্বিতীয় সংস্করণ। দ্বিতীয় সংস্করণে সব দেবদেবীর নামই বর্জিত হয়। এই সংস্করণ হয়েছিলো বোধহয় ১৮১৭ সালে শ্রীরামপুরে। | আইন |
| ১৭৯৩–১৮০৫ | ফরস্টারের অনুদিত যে–আইন গ্রন্থগুলো | ১৭৯৩ থেকে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত ফরস্টারের অনুদিত যে-আইন গ্রন্থগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তার সবগুলোতেই প্রতিটি আইনের শীর্ষে কোনো-না-কোনো দেবতার উল্লেখ রয়েছে। | আইন / অনুবাদ |
| ১৭৯৪ | ফরস্টার — অনুবাদের কাজ শুরু | ১৭৯৪ সালে ফরস্টার যখন অনুবাদে হাত দেন, তখন তাঁর সামনে আদর্শ ছিলো ডানকান, মেয়ার, চেরী আর এডমনস্টেনের অনুবাদ। এর মধ্যে ১৭৯০ এবং ৯২ সালে প্রকাশিত এডমনস্টেনের অনুবাদই ছিলো সবচেয়ে বেশি আরবি-ফারসি প্রভাবিত। | অনুবাদ / ব্যক্তি |
| ১৭৯৭ | শ্রীশ্রীরাম–স্মরণকারী মুনশির বিদায় | শ্রীশ্রীরাম-স্মরণকারী মুনশি ১৭৯৭ সালের পর ফরস্টারের হয়ে কাজ করেননি। ঈশ্বর-স্মরণকারী মুনশি ১৮০২ সালের পর কাজ করেননি। | ব্যক্তি |
| ১৭৯৮ | আনিসুজ্জামান — অনুবাদের সূচনা–দাবি প্রসঙ্গে | আনিসুজ্জামান লিখেছেন যে, ১৭৯৮ সালের অনুবাদ থেকে আরম্ভ করে আইনের শুরুতে হিন্দু দেবদেবীর নাম উল্লিখিত হয়েছে — কিন্তু নথি অনুযায়ী এটি আসলে ১৭৯৩ সাল থেকেই শুরু। | ভাষা / আইন |
| ১৭৯৮–১৮০৪ | গুরুবেনম — স্মরণকারী মুনশি হিসেবে কাজ | ১৭৯৮ থেকে ১৮০৪ সাল পর্যন্ত গুরুবেনম-স্মরণকারী মুনশি ফরস্টারের হয়ে কাজ করেন। সূর্যকে স্মরণকারী মুনশির অস্তিত্ব ১৭৯৯ সালের আগে পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না। | ব্যক্তি |
| ১৮০১ | হ্যালহেড — বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ প্রকাশ | ১৮০১ সালে হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। হ্যালহেড যখন বাংলা শেখেন — ১৭৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে — তখন তিনি সংস্কৃত ভালো করে জানতেন না। ১৭৭৪-৭৫ সাল নাগাদ তিনি কাজ চালানোর উপযোগী ফারসি শিখে ফেলেন। | প্রকাশনা / ভাষা |
| ১৮০১ | হ্যালহেড — A Code of Gentoo Laws অনুবাদ | হ্যালহেড A Code of Gentoo Laws তিনি অনুবাদ করেছিলেন সংস্কৃত থেকে নয়, ফারসি থেকে। সুতরাং তাঁর পক্ষে আরবি-ফারসি-প্রভাবিত বাংলা বোঝাই সহজ ছিলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি সমর্থন জানান সংস্কৃতগন্ধী বাংলাকে। | অনুবাদ / আইন |
| ১৮০৬ | হ্যালহেড — বাংলা ব্যাকরণের দ্বিতীয় সংস্করণ | ১৮০৬ সালে হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। | প্রকাশনা |
| ১৮১৫ | বাংলা বিভাগে মুনশিদের অভিযোগ — কেরীর বিরুদ্ধে | ১৮১৫ সালে বাংলা বিভাগের মুনশিদের অভিযোগ প্রসঙ্গে কেরী মতব্য করেন যে সংস্কৃত-জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃত জানতেন না, অথচ সামান্য ইংরেজি জানতেন — এমন দুজন মুনশি সম্পর্কে তিনি এই মতামত দেন। | ভাষা / ব্যক্তি |
| ১৮১৫ | রামমোহন রায় — প্রথম বাংলা বই প্রকাশ | ১৮১৫ সালে রামমোহন রায় তাঁর প্রথম বাংলা বই প্রকাশ করেন। সংস্কৃত ও আরবি জানা পণ্ডিত হলেও, বাংলা ভাষায় নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। তাঁর প্রথম দিকের বাংলায় যথেষ্ট আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য উপাদান ছিলো। | প্রকাশনা / ব্যক্তি |
| ১৮১৭ | দ্বিতীয় সংস্করণ — শ্রীরামপুরে প্রকাশ | ১৭৯৩ সালের কর্ণওয়ালিস কোডের দ্বিতীয় সংস্করণ হয়েছিলো বোধহয় ১৮১৭ সালে শ্রীরামপুরে। এই সংস্করণে সব দেবদেবীর নামই বর্জিত। | প্রকাশনা / আইন |
| ১৮১৮ | হ্যালহেড — বাংলা ব্যাকরণের তৃতীয় সংস্করণ | ১৮১৮ সালে হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণের তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। | প্রকাশনা |
| ১৮১৮ | বাংলা সাময়িকপত্র প্রকাশ — সংস্কৃত–প্রভাব প্রতিষ্ঠা | ১৮১৮ সালে বাংলা সাময়িকপত্র প্রকাশিত হবার আগেই সংস্কৃত-প্রভাবিত বাংলা লেখার রীতি নীতিগতভাবে সর্বজনস্বীকৃতি লাভ করে। এ সময় থেকে রামোহন নিজেও সংস্কৃত রীতিতে বানান পদ্ধতি গ্রহণ করেন। | প্রকাশনা / ভাষা |
| ১৮১২ | ইতিহাসমালার ভাষা প্রকাশ | অন্তত ১৮১২ সালে প্রকাশিত ইতিহাসমালার ভাষা থেকে এ কথাই মনে হয় যে সংস্কৃতায়ণের প্রক্রিয়া তখন থেকেই চলছিল। | প্রকাশনা / ভাষা |
| ১৮২৫-এর দশক | মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের উর্দু–দাবি | ১৮২৫ সালের দিকে কলকাতা-কেন্দ্রিক মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা অনেকেই আবদুল লতীফের মতো দাবি করতে শুরু করেন যে, বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, উর্দু। | ভাষা / ঘটনা |
| ১৮৭০–৮০-এর দশক | মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের আরবি–ফারসি গ্রহণ বৃদ্ধি | ১৮৭০-৮০-এর দশকে যখন আরো প্রতিষ্ঠিত তখন তাঁদের ভাষায় আরবি-ফারসির এবং চেতনায় আরব-ইরানের তথা ইসলামী বিশ্বের প্রভাব অনেক বেশি মাত্রায় প্রকাশ পায়। ফররুখ আহমদ প্রমুখ এই নতুন যুগের সঙ্গে তাল রেখে ব্যাপক মাত্রায় আরবি-ফারসি শব্দ তথা মুসলমানী উপকরণ ব্যবহার করেন। | ভাষা / ঘটনা |
| ~১৯০০ | আসামে বাংলা ভাষার পরিবর্তন | মোটামুটি ১৯০০ সাল পর্যন্ত আসামের নবশিক্ষিত সম্প্রদায় বাংলা ভাষাকেই মেনে নিয়েছিলো। কিন্তু শিক্ষাবিস্তার হলে এই দিকে ভৌক বাড়তে থাকে এবং এখন অহমিয়াই আসামের শক্তিশালী ভাষা। | ভাষা / ঘটনা |
| ১৯৪৭ | দেশ বিভাগ — সংস্কৃতায়ণ প্রক্রিয়া আরো জোরদার | ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়া আরো জোরদার হয় | ঘটনা / ভাষা |
| ১৯৬০-এর দশক | পূর্ববঙ্গে নতুন করে সংস্কৃতায়ণ বৃদ্ধি | ১৯৬০-এর দশকে পূর্ববঙ্গের নবশিক্ষিত নতুন মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে আবার যখন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ নতুন ধাঁচে আরম্ভ করে, তখন নতুন করে সংস্কৃতায়ণ বৃদ্ধি পায়। | ভাষা / ঘটনা |
এবার না’হয় একটু ব্যক্তি-বিশেষদের আলাদা করে ফের নতুন করে পড়ে নেওয়া যাক।
| ব্যক্তি | কাল / পর্ব | বিবরণ |
| ফরস্টার (Forster) | ১৭৯৪–১৮০৫ | ফরস্টারের নামে প্রকাশিত বাংলা রচনার পরিমাণ মোট দু হাজার পৃষ্ঠারও বেশি। কিন্তু তিনি অনুবাদ করিয়েছিলেন মুনশিদের সহায়তায়। তিনি নিজে বাংলায় কিছু লিখেছিলেন কিনা, তা আমাদের জানা নেই। তবে তাঁর নামে প্রকাশিত বাংলা গদ্যের নমুনাসমূহ বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তা কোনো এক ব্যক্তির রচনা নয়। ১৭৯৪ সালে অনুবাদে হাত দেন। সামনে আদর্শ: ডানকান, মেয়ার, চেরী, এডমনস্টোন। |
| শ্রীশ্রীরাম–স্মরণকারী মুনশি | ১৭৯৩–১৭৯৭ | শ্রীশ্রীরাম-স্মরণকারী মুনশি ১৭৯৭ সালের পর ফরস্টারের হয়ে কাজ করেননি। মুনশিরা নিজ নিজ অভিরুচি অনুযায়ী উপাস্য দেবদেবীকে স্মরণ করেছেন। এরা যে সবাই হিন্দু ছিলেন, তা-ও স্পষ্ট বোঝা যায়। |
| সূর্য–স্মরণকারী মুনশি | ১৭৯৯-র আগে পর্যন্ত অজ্ঞাত | সূর্যকে স্মরণকারী মুনশির অস্তিত্ব ১৭৯৯ সালের আগে পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না। |
| ঈশ্বর–স্মরণকারী মুনশি | –১৮০২ | ঈশ্বর-স্মরণকারী মুনশি ১৮০২ সালের পর ফরস্টারের হয়ে কাজ করেননি। |
| গুরুবেনম–স্মরণকারী মুনশি | ১৭৯৮–১৮০৪ | ১৭৯৮ থেকে ১৮০৪ সাল পর্যন্ত গুরুবেনম-স্মরণকারী মুনশি ফরস্টারের হয়ে কাজ করেন। |
| এডমনস্টোন (Edmondstone) | ১৭৯০, ১৭৯২ | ১৭৯০ এবং ৯২ সালে প্রকাশিত এডমনস্টোনের অনুবাদই ছিলো সবচেয়ে বেশি আরবি-ফারসি প্রভাবিত। ফরস্টারের ভাষায়ও গোড়ার দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি আরবি-ফারসি শব্দ ছিলো। |
| ডানকান, মেয়ার, চেরী | ১৭৯০-এর দশক | ফরস্টার যখন অনুবাদে হাত দেন তখন তাঁর সামনে আদর্শ ছিলো ডানকান, মেয়ার, চেরী আর এডমনস্টেনের অনুবাদ। |
| হ্যালহেড (Halhed) | ১৭৭০-এর দশক — ১৮১৮ | হ্যালহেড যখন বাংলা শেখেন — ১৭৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে — তখন তিনি সংস্কৃত ভালো করে জানতেন না। ১৭৭৪-৭৫ সাল নাগাদ ফারসি শেখেন। A Code of Gentoo Laws তিনি অনুবাদ করেছিলেন সংস্কৃত থেকে নয়, ফারসি থেকে। তিনি সংস্কৃতায়ণের পক্ষে ছিলেন। বাংলা ব্যাকরণের প্রথম সংস্করণ ১৮০১, দ্বিতীয় ১৮০৬, তৃতীয় ১৮১৮। |
| উইলিয়াম কেরী (William Carey) | ১৭৯০–১৮১৫ | কেরী দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় আরবি-ফারসি শব্দ বর্জন করেন। তিনি বরং সংস্কৃতের সঙ্গে বাংলার ঘনিষ্ঠতা বোঝানোর জন্যে মতব্য করেন: ‘The Bengalee may be considered as more nearly allied to the Sungskrit than any of the other languages of India, for though it contains many words of Persian and Arabic origin, yet the far greater number are pure Sungskrit.’ (2nd ed; Preface, p. VI). কেরী ১৮১৫ সালে বাংলা বিভাগের মুনশিদের অভিযোগ প্রসঙ্গে সংস্কৃত-জ্ঞানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেন। |
| রামমোহন রায় | ১৮১৫–১৮৩০ (আনু.) | ১৮১৫ সালে রামোহন রায় তাঁর প্রথম বাংলা বই প্রকাশ করেন। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত হলেও, বাংলা ভাষায় নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। তাঁর প্রথম দিকের বাংলা ও গৌড়ীয় ভাষায় যথেষ্ট বৈশিষ্ট্য উপাদান ছিলো। ১৮১৮ সালে বাংলা সাময়িকপত্র প্রকাশিত হবার আগেই সংস্কৃত-প্রভাবিত বাংলা লেখার রীতি সর্বজনস্বীকৃতি লাভ করে। এ সময় থেকে রামোহন নিজেও সংস্কৃত রীতিতে বানান পদ্ধতি গ্রহণ করেন। |
| আনিসুজ্জামান | আধুনিক বিশ্লেষক | আনিসুজ্জামান লিখেছেন যে, ১৭৯৮ সালের অনুবাদ থেকে আরম্ভ করে আইনের শুরুতে হিন্দু দেবদেবীর নাম উল্লিখিত হয়েছে — কিন্তু নথি অনুযায়ী এটি আসলে ১৭৯৩ সাল থেকেই শুরু। ফরস্টারের ভাষায় গোড়ার দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি আরবি-ফারসি শব্দ ছিলো বলে তিনি উল্লেখ করেন। |
| ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতগণ | ১৮০০ (আনু.) থেকে | কেরীর তত্ত্বাবধানে বাংলা গদ্যে সংস্কৃত-প্রভাব আমদানি করেন। মৃতুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, গোলোকনাথ শর্মা, রাজীবলোচন মুখ প্রমুখ সংস্কৃত পণ্ডিতই বিশ্বাস স্থাপন করেননি; রামরাম বসু ভালো সংস্কৃত না জানা সত্ত্বেও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো। |
| মীর মশাররফ হোসেন | ১৮৭০–৮০-এর দশক | ১৮৭০-৮০-এর দশকে মীর মশাররফ হোসেন কি মোজাম্মেল হক তাঁদের রচনায় ইসলাম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কথাও সংস্কৃত শব্দ দিয়ে বর্ণনা করে প্রামাণিতা বাংলার প্রতি আনুগতা দেখিয়েছিলেন। নিজেদের ধর্ম, পরিচয় এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে ১৯০০ সাল পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন অনেকটা apologetic, এবং হীনমন্য। |
অর্থাৎ, যে ভাষায় আজ আমরা লিখি, পড়ি, ভাবি, সেটা কোনো স্বাভাবিক বিবর্তনের ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে একাধিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রেক্ষাপট বদল, বহু মানুষের সচেতন পছন্দ আর অপছন্দের ফলাফলের জাল। ফরস্টারের মুনশিরা যেসব হিঁদু দেবতার নাম লিখতেন, কেরী যেভাবে সংস্কৃতকে “আসল বাংলা”র মাপকাঠি বানিয়ে দিলেন, হ্যালহেড যেভাবে ফারসি থেকে অনুবাদ করেও সংস্কৃতায়ণের পক্ষ নিলেন — এই প্রতিটা ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে উপনিবেশের হাতে পড়ে বাংলা ভাষাটা একটা ছাঁচে ঢালা হয়েছে। আর সেই ছাঁচের বাইরে যারা রয়ে গেলেন — বাংলাভাষী মুসলমান লেখকরা, যাঁরা ১৮৭০-৮০-র দশকেও নিজের ধর্মের কথা সংস্কৃত শব্দে লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন, বা যাঁরা দাবি করেছিলেন তাদের আসল ভাষা উর্দু — তাঁরা সবাই এই ছাঁচ-বানানোর রাজনীতির শিকার। বাংলা ভাষার ইতিহাস মানে তাই শুধু শব্দের ইতিহাস নয়, কে কাকে “বাঙালি” বলে মানবে আর কাকে মানবে না — সেই গণ্ডগোলের ইতিহাস।
ছয় (ঘ)।। পোশাকের রাজনীতি
তাই দেপ্রব আর আব-কে পাড়তে হবে ভাষা ছাড়াও নেশন তৈরির আরো কিছু মড্যুলের কথাতে।
নয়াউদারবাদী সময়ে আমাদের বসন, মেক-আপ ইত্যাদির “ট্রেন্ড”-ধর্মী চয়ন বিশ্ব-বাজারি কর্পোরেটই তৈরি করে দিচ্ছে, কিন্তু সেটাকে আমরা ঠাউরে বসছি “আমার চয়ন” হিসেবে। এটাই পুঁজিতন্ত্রের খেলা। এই চয়ন বানিয়ে তোলবার ব্যাপারটা ভাল না মন্দ, সে তর্কে আপাতত যাচ্ছি না। কিন্তু ব্যাপারটা হলো, এসবের চোটে আমাদের মনটাকে আসলি সমস্যার থেকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখা হচ্ছে। কেনা-কেনা প্রদর্শনের বাতিকগ্রস্ততায় মত্ত থাকছি আমরা, ওদিকে কিছু হাতে গোনা আম-আদা সদাগর দেশের প্রায় সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দখল বসাচ্ছে, সেসবকে ধ্বংস করছে, আর তার নাম দেওয়া হচ্ছে “উন্নয়ন”! এই ভানের খেলাটা তাই মড্যুলে মড্যুলে ছড়িয়ে পড়ে।
এবার চট করে সঙ্ঘের হনুকরণের ধাঁচটা বুঝুন। আর-এস-এস-এর পোশাক দেখুন। খাঁকি শর্টস থেকে পাৎলুন— সবটাই সাহেবদের (ব্রিটিশ আর্মি) থেকে নেওয়া। আবার তাদের বুকে হাত দিয়ে শপথ নেওয়ার ভঙ্গি হিটলারি সম্ভাষণকেই মনে করিয়ে দেয়। এই পোশাক দেখলেই বোঝা যায় যে এরা শুধু হনুকরণই করেনি, সাম্রাজ্যবাদের চর হিসেবেও কাজ করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাই এদের অবদান ফক্কা!
এবার তলিয়ে ভেবে দেখুন। পোশাক পরি কেন? মূলত আতপ ও “লজ্জা” নিবারণের তাগিদেই তো? তবে এতো রঙ-চঙে এতো কায়দার জিনিসপত্তর পরবার দরকারটা কোথায়? এই রঙের “ডাই” প্রস্তুত করতে গিয়ে ধ্বস্ত হয় নদী-নালা-খাল-বিল-সমুদ্দুর। অন্যদিকে গান্ধীজির মতোন নাঙ্গা ফকিরের কথা ভাবুন। তাঁর পোশাক দিয়ে সোচ্চার প্রতিবাদ মনে করুন। এখানে খেয়াল রাখতে হবে বিশেষ বিশেষ সাংস্কৃতিক নজর বা গেজের বিষয়টাও। পোশাকআশাক সেদিক থেকে মানানসই করে তোলার দিকটাও তাই আলোচনার মধ্যে আনতে হবে। জাভা দ্বীপপুঞ্জে যা “স্বাভাবিক” (অবশ্যই স্বাভাবিকরণ ব্যাপারটাই “স্বাভাবিক” নয়), কুঠিঘাটের গলিতে তা নয়। কিন্তু যদি সেটা এদিক-ওদিক হয়ে যায়, তখন তৈরি হয় সাংস্কৃতিক শক। সেই শক কিন্তু খাওয়ার-দাওয়ার এবং চিন্তা-তক্কো করবার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে করে দেখিয়েছিলো ইয়াং বেঙ্গলের ছেলেরা, তবে সে ধরণের “শক”-দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া থাকে। গরুর হাড় ব্রাহ্মণের বাড়িতে ছোঁড়া হোক, কিংবা মাক্ষালিকে “গুড মর্নিং ম্যাডাম” বলাটা ছিলো সেই “শক”-এরই নানান দৃষ্টান্ত। এগুলোকে কি আজকের দিনে দাঁড়িয়ে স্রেফ বালখিল্য ব্যাপার বলেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া চলে?
কেরালায় বাউনরা নিয়ম করেছিলো, দলিত নারীদের বুক অনাবৃত থাকবে। নইলে তাদের সেই বুকগুলো কেটে দেওয়া হবে!
একসময় বিগত শতাব্দীর নয়ের দশকে কোনো এক সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ শুভঙ্কর চক্রবর্তী হঠাৎই খ্যাতনামা হয়ে গেলেন যখন তিনি কলেজে মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ পরা নিষিদ্ধ করলেন। অথচ ওড়না সমেত সালোয়ার কামিজ সাংস্কৃতিক আব্রুতা রক্ষা শুধুই করে না, তার সঙ্গে বাসে-ট্রামে চলা-ফেরাকেও সহজ করে দেয়। ধূতি বা শাড়ি দুটোই এখনকার বাঙালির কাছে পরিবহন-উপযোগী নয়। ইচ্ছে করলে সালোয়ার কামিজ এবং আরো বেশি করে শাড়িতে সাংস্কৃতিকভাবে নির্নিত আব্রুতা খুব সহজেই লঙ্ঘন করা যায়।
পোশাকের ব্যাপারে আপাতত যেটা বলতে চাই, তা হলো এই যে একজন মানুষের মোটামুটি চার-সেট পোশাক থাকলেই সারা বছর চলে যায়। কাজেই নিসর্গের সংকটকালে কিপটেমির অর্থনীতি যাপনে না নিয়ে এলে পোশাক রাজনীতির মোকাবিলা করবার অনেকগুলো দিকই অধরা থেকে যাচ্ছে।
আরো খেয়াল রাখুন। শুধু পোশাকেই ব্যাপারটা একদমই থেমে থাকছে না। হনুকরণের ছাঁচেই “আমাদের” সংস্কৃতিতে চলে এসেছে “রামনবমী”, “ধনতেরাস”, “গণেশ চতুর্থী”, “হনুমান জয়ন্তী”-র মতোন ব্যাপার-স্যাপার। এসব উৎসব-মোচ্ছব আমাদের মতো ষাটোর্দ্ধের কাছে এক্কেবারে অজানা। অনেকে বলবেন হয়তো যে এই বিচ্ছুরণ হওয়া তো ভালো ব্যাপার! এই পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়া তো সংস্কৃতিতে-সংস্কৃতিতে চলতেই পারে, তাতে দোষের কী আছে? কিন্তু মুশকিলটা হলো, এই বিস্তারটা যদি স্বতস্ফূর্তভাবে হতো, তাহলে সমস্যা পাকতো না। কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া, মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া, কিংবা আত্মীকৃত করে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আধিপত্যের দিকেই গড়িয়ে যায়। সেটা তখন স্বভাবতই হয়ে ওঠে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান ভাবাদর্শেরই অংশ।
ছয় (ঙ)।। “যত কিছু খাওয়া লেখে বাঙালির ভাষাতে…”
[Language শব্দের উৎস লাতিন Lingua থেকে। মানে হল, “জিভ”, যা না থাকলে রসনা রস-না হয়ে যেতো! পান্নাবাবু বলতেন, পুষ্টি-যোগানো খাওয়ার খেলেই হলো। অত রসনা-তৃপ্তির দিকে না তাকালেও চলবে। একটাই উনুনে সমস্ত গাঁয়ের খাওয়া-দাওয়া চলবে। উনুন-ভাগাভাগিতে মুনাফা কাদের? মানিক বাঁড়ুজ্জ্যের “একান্নবর্তী” গপ্পের সমাপ্তিতে এই ব্যাপারটাই ঘটেছে।]
খাবারের ক্ষেত্রে গোবলয়ের ঔপনিবেশিকরণের সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছু ব্যাপার চলে এসেছে। এই কর্পোরেট বিশ্বায়নের চোটে আমি চাইলেই লেবানিজ, ইতালিয়ান, মেক্সিকান, কোরিয়ান, চাইনিজ, মুঘল, পঞ্জাবি, এমনকি বাংলা খাওয়ারও টাকা ফেলে অর্ডার করে দিতে পারি। এই সমস্ত “কুইজিন” সেখানে সহ-অবস্তিত, পাশাপাশি সারণীভুক্ত। রাস্তার বা ফুটপাথের খাওয়ারেও সেই ব্যাপার চালু হয়ে গেছে অনেকদিনই। তবে অনেক সময় এসব খাওয়ারের উপাদানে মিলে-মিশে যাচ্ছে এই বিশেষ স্বভূমির টেস্ট স্ট্যান্ডার্ডগুলোও, যেমন ধরুন চাউ চচ্চড়ি!
এই প্রসঙ্গে কয়েকটা আন্তর্সম্পর্কিত গপ্পো বলি।
১৮৫৬ সালে ইংরেজদের তাড়ায় যখন লখনৌ ছাড়তে বাধ্য হলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্, তখন বড়ো দুঃখে একটা গান বেঁধেছিলেন তিনি। সেই ঠুংরির প্রথম দুটো লাইন,
“জব ছোড় চলে লখনৌ নগরী, কহেঁ হাল কে হাম পর ক্যা গুজ়রি লখনৌ হাম পর ফিদা আর হাম ফিদা-এ-লখনৌ ক্যা হ্যায় তাকত আসমান কী, হামসে ছুড়ায়ে লখনউ”।
(যখন অগত্যা ছেড়ে যেতেই হলো লখনউ, বল রে ভাই কি হাঙ্গামাই না পোয়াতে হয়েছে আমাদের/লখনউ আমাদের জন্য ফিদা, তেমনিই আমাদের ভাল্লাগে লখনউ। আকাশের এমন কী খ্যামতা আছে যে আমাদের লখনউ ছেড়ে যেতেই হয়।)
এমনই এক উচ্চারণই পাই শেষ নবাব বাহাদুর শাহ্ জ়ফরের গলায় পরভূম রেঙ্গুনে নির্বাসিত হওয়ার সময়ঃ
কিতনা হ্যায় বদনসিব জ়ফর, দফন কে লিয়ে
দো গজ় জ়মিন ভী না মিলি কূ-এ-ইয়ার মেঁ
হায়রে পোড়াকপালে হতভাগা জফর, কবরের জন্য
প্রিয়তমার গলিতে (স্বভূমিতে) দু’গজ জমিও মিললো না।
এঁরা কি এই ভারতের কোনো এক অংশকেই “স্ব”-ভূমি মানতেন?
(তখনো “অখণ্ড [হিঁদু] ভারত”-এর কল্পনাটা দানা বাঁধে নি, তাই “এক অংশ” বল্লুম। এখনো তা’বাঁধেনি অবশ্য, বরং উলট পুরাণে বুল্ডোজারের কৃপায় ছন্নছাড়া ভারত এখন, চাগিয়ে উঠছে [এবং উঠবেও] বহুতার বহমান(ব)তা। আশায় বাঁচে চাষা)
রাজনারায়ণ বসুর ১৮৬৬ সালের একটা পুস্তিকাকে (Prospectus of a Society for the Promotion of National Feeling among the Educated Natives of Bengal) ইস্তেহার বানিয়েই ১৮৬৭-তে তৈরি হল “হিন্দু” মেলার জাতীয়তাবাদী আসর!
কোনো এক কার্যগতিকে যে ওয়াজিদ আলি শাহ্-এর গানের সুর ধরেই হিন্দু মেলার জন্য গোবিন্দচন্দ্র রায় কিংবা (ফেলুদার কথামতো–বাদশাহী আংটি দেখুন) জ্যোতিদাদা লিখে ফেলেছিলেন এই গানটাঃ
“কতকাল পরে, বল ভারত রে!
দুখ-সাগর সাঁতরি পার হবে।
অবসাদ-হিমে, ডুবিয়ে ডুবিয়ে ওকি শেষ নিবেশ রসাতল রে।
নিজ বাসভূমে, পরবাসী হলে পর-দাস-খতে সমুদায় দিলে…”
ওয়াজিদ আলি শাহ্-এর ঠুংরির সুরেই হিন্দু মেলার “জাতীয়” সঙ্গীত রবি ঠাকুরের কলমে হয়ে উঠলো প্যারোডি, “চিরকুমার সভা” নাটকেঃ
কত কাল রবে বল’ ভারত রে
শুধু ডাল ভাত জল পথ্য ক’রে ।
দেশে অন্নজলের হল ঘোর অনটন—
(খিদের সূচকে ভারত এখনঃ ১২৩টা দেশের মধ্যে ১০২)
ধর’ হুইস্কি-সোডা আর মুর্গি-মটন ।
যাও ঠাকুর চৈতন-চুট্কি নিয়া—
এস’ দাড়ি নাড়ি কলিমদ্দি মিয়া ।
পাঠক, খেয়াল করুন এই গানের শেষ দুটি লাইনঃ “যাও ঠাকুর চৈতন-চুট্কি নিয়া/এস’ দাড়ি নাড়ি কলিমদ্দি মিয়া।” আহা, একেই বলে রসেবশে থাকা!
নাকি হিন্দুদের মেলাকে কি বিদ্রুপ করছেন না-নেশনের বাসিন্দে রবি ঠাকুর এমন এক গানে?
মনে রাখবেন পাঠক, প্যারোডির আর প্যারোডি হয় না!
ব্যাপক বিষন্ন অবস্থায়
মোহরদির গলায় একটা গান শুনছিলুমঃ
“তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়
কোন্খানে রে কোন্ পাষাণের ঘায়॥
নবীন তরী নতুন চলে, দিই নি পাড়ি অগাধ জলে–
বাহি তারে খেলার ছলে কিনার-কিনারায়॥…”
হঠাৎ খেয়াল করি, আরে এটা তো “চিরকুমার সভা”-র মতো এক তথাকথিত হাসির নাটকের গান।
এই তরী ডোবার কথা আমরা ওয়াজিদ আলি শাহ আর বাহাদুর শাহ্ জ়ফরের পংক্তিতেও আভাসে পাই!
নবাব আমাদের শুধু বিরিয়ানির আলু আর চিড়িয়াখানা দিলেন না, গানের সুরও দিলেন। তিনি নিজে ওস্তাদ ছিলেন কত্থক নৃত্যে। সাজতেন কেষ্টঠাকুর।
হায়রে! এসব আজকাল আর কেই বা মনে রাখে?
অলিগলিতে সস্তা বিরিয়ানি আর চাউমিনের দোকান ছেয়ে গেছে যদিও। চিনের চেয়ারম্যান থুড়ি চাউমিন আর আলুওলা বিরিয়ানির দারুণ চাহিদা। চিন নাকি দখল করেছে ভারতের অনেকটা অংশ। আর অন্য দিকে রয়েছে বানিয়ে তোলা “ইসলাম-শঙ্কা”-র কথা।
কিন্তু আজ ঘেন্নার দুর্গন্ধ, চাউমিন-চচ্চড়ি আর সস্তা বিরিয়ানির গন্ধ মিলেমিশে একাকার…
আমরা কি হিপোক্রিট?
ভাজপা—আর-এস-এস কি নিজেরাই হিপোক্রিট নয়?
তবে আসুন, “নিষিদ্ধ” মাংসের কথাই বলা যাক এবার!
দুঃখের কথা কী জানেন, আজ আর আমাদের চেনা সব দোকান, যেমন অলি-পাব, নিজাম – এসব কোনো জায়গায় “বিফ”-এর খোঁজ মেলেনা।
আচ্ছা, সনাতন শাস্তর-আচারে এই বিফ পেঁদানো নিয়ে কেমনতর কথা কওয়া হয়েছে?
গরু নিয়ে গো-এষণা
।। “সনাতন” (“most oldest”?!) হিঁদু শাস্তরে গোরু-মোষ-ষাঁড়ের মাংস খাওয়ার নজির ।।
১. ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৩
কিতাব: ঋগ্বেদ সংহিতা, মণ্ডল ১০, সূক্ত ৮৬ (বৃষাকপি সূক্ত), ঋক্ ১৩ ঋষি: বৃষাকপি, ইন্দ্র, ইন্দ্রাণী ছন্দ: পঙ্ক্তি
বৃষাকপায়ি রেবতি সুপুত্র আদু সুস্নুষে।
ঘসত্ত ইন্দ্র উক্ষণঃ প্রিয়ং কাচিৎকরং হবির্বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ ॥
“হে বৃষাকপির মাতা, তুমি ধনবতী, উত্তম পুত্রের অধিকারিণী, উত্তম পুত্রবধূর অধিকারিণী — ইন্দ্র তোমার ষাঁড়গুলো খেয়ে ফেলুন; তাঁকে প্রিয় ও পরম সুস্বাদু ঘি প্রদান করো। ইন্দ্র সক্কলের ওপরে।”
২. ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৪
কিতাব: ঋগ্বেদ সংহিতা, মণ্ডল ১০, সূক্ত ৮৬, ঋক্ ১৪ বক্তা: ইন্দ্র (প্রত্যক্ষ বাক্য)
উক্ষ্ণো হি মে পঞ্চদশ সাকং পচন্তি বিংশতিম্।
উতাহমদ্মি পীব ইদুভা কুক্ষী পৃণন্তি মে বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ ॥
“[ইন্দ্র বলছেন:] উপাসকেরা আমার জন্য পনেরোটি এবং বিশটি ষাঁড় রান্না করে; আমি সেগুলি খেয়ে ফেলি এবং মোটাসোটা হই — সেগুলো আমার উভয় পার্শ্বদেশ পূর্ণ করে দেয়। ইন্দ্র (সচরাচর খ্যামতাধারী ব্যক্তিরা নিজেদের সে-পক্ষে পরিণত করেন, যেমন জুলিয়াস সিজার কিংবা উনিজি) তো সকলের ওপরে।”
৩. মনুস্মৃতি ৫.৩০
কিতাব: মানব-ধর্মশাস্ত্র (মনুস্মৃতি), অধ্যায় ৫, শ্লোক ৩০
নাত্তা দুষ্যত্যদন্নাদ্যান্ প্রাণিনোঽহন্যহন্যপি।
ধাত্রৈব সৃষ্টা হ্যাদ্যাশ্চ প্রাণিনোঽত্তার এব চ ॥ ৩০ ॥
“খাওয়ার মতো প্রাণীদের প্রতিদিন খেলেও খাদকের কোনো পাপ হয় না; কেননা খাদ্য এবং খাদক — উভয়ই স্রষ্টা কর্তৃক সৃষ্ট।”
৪. মনুস্মৃতি ৫.৩৫
কিতাব: মানব-ধর্মশাস্ত্র, অধ্যায় ৫, শ্লোক ৩৫
নিযুক্তস্তু যথান্যায়ং যো মাংসং নাত্তি মানবঃ।
স প্রেত্য পশুতাং যাতি সম্ভবানেকবিংশতিম্ ॥ ৩৫ ॥
“কিন্তু বিধিমতো আমন্ত্রিত হয়েও যে মানুষ মাংস ভোজন করে না, সে মৃত্যুর পর একুশটা (আইনে?) জম্মো পশুরূপে জম্মো নেয়।”
৫. মনুস্মৃতি ৫.৫৬
কিতাব: মানব-ধর্মশাস্ত্র, অধ্যায় ৫, শ্লোক ৫৬
ন মাংসভক্ষণে দোষো ন মদ্যে ন চ মৈথুনে।
প্রবৃত্তিরেষা ভূতানাং নিবৃত্তিস্তু মহাফলা ॥ ৫৬ ॥
“মাংস খাওয়ায় কোনো দোষ নেই, যেমন দোষ নেই মা*ল খেলে কিংবা মিথুনে — এসব প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি; তবে কিনা এর চেয়ে নিবৃত্তি মহাফলদায়ক।”
৬. শতপথব্রাহ্মণ ৩.১.২.২১
কিতাব: শতপথব্রাহ্মণ (মাধ্যন্দিন শাখা, শুক্ল যজুর্বেদ), কাণ্ড ৩, অধ্যায় ১, ব্রাহ্মণ ২, অনুচ্ছেদ ২১ রচয়িতা: যাজ্ঞবল্ক্য
তদ্ যাজ্ঞবল্ক্যঃ — অহং ত্বেব খাদামি, যদেব মাংসলম্ ইতি।
“তাপ্পর যাজ্ঞবল্ক্য বললেন: ‘আমি অবশ্যই তা (মাংস) খাই, যদি তা মোলায়েম হয়।'”
(প্রসঙ্গ: এর ঠিক আগের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে দেবতারা সমস্ত প্রাণীর সারাংশ গো ও বৃষভের মধ্যে স্থাপন করেছেন, তাই সেগুলি খাওয়া উচিৎ নয়। যাজ্ঞবল্ক্য এই নিষেধাজ্ঞাকে সরাসরি অস্বীকার করে নিজের ব্যক্তিগত আচরণ ঘোষণা করে দেন।)
৭. আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্র, প্রশ্ন ১, খণ্ড ৩, সূত্র ৯
কিতাব: আপস্তম্ব-গৃহ্যসূত্র (তৈত্তিরীয় শাখা, কৃষ্ণ যজুর্বেদ)
এতে গোঽলম্ভনস্য কালাঃ — অতিথিঃ, পিত্র্যম্, বিবাহঃ
“গোহত্যার এই উপলক্ষগুলি (বর্ণনা করা হলো): অতিথির আগমন; বাবাপুজো অর্থাৎ বাপের অষ্টকা ছেরাদ্দ; এবং বিয়ে-থা।”
৮. পাণিনি অষ্টাধ্যায়ী, সিদ্ধান্তকৌমুদী, সায়ণের মাধবীয় ধাতুবৃত্তি
কিতাব: পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী (সূত্র); ভট্টোজি দীক্ষিতের সিদ্ধান্তকৌমুদী (১৭শ শতক), উত্তরকৃদন্ত অধ্যায়; সায়ণাচার্যের মাধবীয় ধাতুবৃত্তি
৮ক. পাণিনি অষ্টাধ্যায়ী
দাশগোঘ্নৌ সম্প্রদানে।।
“দাশ এবং গোঘ্ন — এই ২ নম্বর শব্দটা সম্প্রদান কারকে ব্যবহৃত হয়।”
(বৈয়াকরণিক সূত্র; বিস্তারিত অর্থ সিদ্ধান্তকৌমুদীতে)
৮খ. সিদ্ধান্তকৌমুদী — উত্তরকৃদন্ত অধ্যায় (ভট্টোজি দীক্ষিত)
গাং হন্তি তস্মৈ গোঘ্নঃ — অতিথিঃ।।
“যার জন্য গাভী খু*ন করা হয়, সে হলো গোঘ্ন — অর্থাৎ অতিথি/মেহমান।”
৮গ. সায়ণাচার্য — মাধবীয় ধাতুবৃত্তি
গৌর্যস্মৈ দাতুং হন্যতে স গোঘ্নঃ অতিথিঃ।।
“যাকে দেওয়ার জন্য গাভী খু*ন করা হয়, সে হলো ‘গোঘ্ন’ এবং ‘অতিথি’।”
(বৈদিক ভাষায় ‘অতিথি’ শব্দের মানেই হলো ‘গোঘ্ন’ — যার জন্য গরু মা#রা হয়। অর্থাৎ “সনাতন”-কালে অতিথিসেবার অর্থই ছিল তাঁর জন্য গো-ব*ধ করা।)

রামশরণ শর্মা যখন এই বিষয়গুলোকে এন-সি-ই-আর-টি র বইতে তুলে আনেন, তখন তৎকালীন অন্ধভক্তরা খুব খেপে যায়। রামশরণ শর্মা তার জবাব দেন In Defence of Ancient India’s History কিতাবে। এই সূত্রেই মনে পড়ে যায় আচার্য সুনীতিকুমারের কথা। তিনি জাতকের একটা কাহিনী তুলে দেখান, রাম-সীতা ভাই-বোন। এবার চাড্ডিরা তাঁর লাইফ হেল করে তোলে। এমনকি, একবাক্স হাগু পার্সেল করে তাঁর কাছে পাঠানো হয়।
এসব বুঝে-টুঝে আমরা খুঁজতে থাকি… পেতে চাই আরো সাম্প্রতিক কিছু হিসেব-নিকেশের হদিশ।
।। ক-অক্ষর গোমাংসের আমলে “বিফ” (??) রফতানির বাড়বাড়ন্ত ।।
আমি আতান্তরে পড়েছি। একী দেখছি। মহান হিঁদুশাসনের অমৃতকালে “বিফ”-রফতানিতে ভারত এক্কারে ৪র্থ স্থানে। ঠিক যেমন ভারত বিশ্বের অর্থনীতিতে ৪র্থ স্থানে (ওরে বাবা, এ নিয়ে কথা কইবো না, কেনোনা, কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে), ঠিক তেমনই (ইয়া-)আর কী!
তবে কিনা, এখানে একটা গোলমাল পেকে গেছে। ভারত গরুর মাংস চালান করে না, করে মোষের মাংস (?)। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোষের (?) মাংস রফতানি করে। এই রফতানিতে ভারতের কোম্পানি, Allana Group-এর flagship company Alanson’s Pvt. Ltd, ১৬০ বছর ধরে এই বেওসা চালাচ্ছে। মালিকানা যবনদের হাতে।
এবার হলো কী, ২০১৯ সালে আয়কর বিভাগ Allana Group-অধীন ১০০+ জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে ২০০০ কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ আনে। এ ঝামেলা কিভাবে সামলানো যায়? ওই বছরই Alanson’s গোষ্ঠী ইলেক্টোরাল বন্ড কিনতে শুরু করে। ব্যাস, ভাজপা ওয়াশিং মেশিনে তাঁরা ধোয়া তুলসিপাতা হয়ে গেলেন।
অবাধ “বিফ”-রফতানি খোশমেজাজে চলতে থাকলো। ওই সেই আবার crony quid pro quo—পরস্পর পিঠ চুলকোনো! মহান গো-রক্ষক দল গেলেন কোথায়? ঘোষিতভাবে ইসলামবিদ্বেষী দল তবে ইসলামি প্রতিষ্ঠানের থেকে টাকা নিতে পারে? বা তালিবানদের পরপর দু’বছর ২০০ এবং ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে কেন?
এবার আরেকটা কোম্পানির কথা কইঃ Al Kabeer Exports। এর মালিকানা ও পরিচালনা আগের শতকের ৭-এর দশকে Subberwal (অতি অবশ্যই হিঁদু) ও Ghulam Shaikh পরিবারের ৫০:৫০ অংশীদারি বেওসা হিসেবে বজায় ছিলো। তবে বর্তমান পরিচালক পর্ষদ (MCA, ২০২৫)-এর চেহারাটা এরকম: Asif Ghulamuddin Shaikh, Shabbir Amir Shaikh, Altaf Ghulamuddin Shaikh, Arshad Salar Siddiqui এবং Kuldip Singh Brar (শিখ–শিখরা হিঁদু কিনা, তা নিয়ে আইনি ক্যাঁচাল আছে)।
কিন্তু হিঁদু Subberwal-ভাইরা ভারতের এতো বড়ো লাভজনক বেওসা ছেড়ে কোথায় উধাও হয়ে গেলেন? জানা যায় তাঁরা নাকি আল কবিরের “গালফ” (খাঁড়ি)-র দিকটা সামলাতেন; পরে (২০১৮ সাল নাগাদ) সেটাকেও সৌদি আরবের সাভোলা গ্রুপের হাতে তুলে দিয়েছেন বলেও কানাঘুষো শোনা যায়।
এবার আরো একটা কথা বলি। ভারতের মাংস পরিদর্শনের (meat inspection) ব্যাপারটা খুব-একটা শক্ত-পোক্ত নয়। রফতানির আগে ডি-এন-এ পরীক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই হয় না বলেও শোনা গেছে। খেয়াল রাখবেন, দূর্নীতি নিরীক্ষা সূচকে ভারতের স্থান ১৮২টা দেশের মধ্যে ৯১তম। এবার তথ্য ঘেঁটেঘুঁটে দুয়ে দুয়ে চার করে নিতেই পারেন (আমি কিন্তু ভীষণ প্যারানোইয়ায় ভুগি!)। আপনার-আমার অজান্তে মোষের মাংস বলে গরুর মাংস পাচার হয়ে যাচ্ছে না তো? খাইসে! এ ব্যাপারে FSSAI কিংবা APEDA-এর উদ্দেশ্যে আরটিআই করেও বিশেষ কোনো লাভ নেই, কারণ ও ব্যাপারটা ভাজপা-কালে এমনিতেই মরে হেজে গেছে।
এখন “সুনার বঙ্গাল”-এর কোলকাতায় “বিফ” প্রায়-নিষিদ্ধ। অলি পাব বা নিজামে গিয়ে বিফের অর্ডার দিলে কী মাংস আসবে? গরু না মোষ? নাকি কোনোটাই নয়? এখনকার শাসক গরু-মোষের ব্যাপারটা নিয়ে একটু নজরদারি করলে আমাদের মতো বৈদিক ঋষিদের অনুসরণকারী ভোজকদের বড় আহ্লাদ হয়।
।। গরুর আত্মকথা।।
তোমরা আমার মতো গো-বেচারাদের নিয়ে রচনা লেখো। এবার আমার পালা। বোকারামদের নিন্দার্থে “গরু” বলো। কিন্তু, আমার আসল কথাটাই বেমালুম চেপে যাও। হে সনাতনী হিঁদুগণ, আমাকে বারংবার কৃত্রিমভাবে প্রসবিনী করো, কেননা তোমাদের পুজোআচ্চায় দুধ লাগবে, ছানা লাগবে, ক্ষীরও লাগবে।
তোমাদের এই কৃত্রিম প্রজননব্যবস্থা আমাকে রতিহীন বিরহিনী করে তোলে। শুধু তাই নয়, আমার ছানারা আমার দুধ পায় না। তাদের বঞ্চিত করে, দুধের অপচয় করো শিব-ফ্যালাসের মতো পুতুলের মাথায় (OMG ফিলিমে এমন প্রশ্নই তোলা হয়েছিলো), বা নদীতে ঢেলে। নদীতে দুধ ঢাললে কাদের ক্ষতি হয় জানো কি?
দুধের খুব বেশি জৈব পদার্থ (ল্যাকটোজ, প্রোটিন, ফ্যাট) জলে মিশলে ব্যাকটেরিয়ারা দ্রুত বিয়োজন করতে শুরু করে, আর এর চোটে জলে-মিশে থাকা অক্সিজেন (DO) ব্যাপকভাবে কমে যায় — যাকে তোমরা বলো Biochemical Oxygen Demand (BOD)-এর মারাত্মক বেড়ে যাওয়া। এই কারণেই মাছ, শামুক, জলজ কীটপতঙ্গ ছাড়াও সমস্ত জলজ প্রাণীরাই শ্বাসকষ্টে ভুগতে ভুগতে একে-একে মরে যেতে শুরু করে। ওদিকে নদীর তীরে ঘরবাঁধা চাষিরা, যাঁরা সেই জলকেই আবার সেচের কাজে ব্যবহার করেন, তাঁদের জমিতে ফসল নষ্ট হয়। একে কিভাবে মেনে নিই বলো দেখি? দুধ থেকে তৈরি হওয়া বর্জ্য শ্যাওলার অতিবৃদ্ধি (algal bloom) ঘটায় যা আরও অক্সিজেন শুষে নেয় এবং বিষাক্ত সায়ানোব্যাকটেরিয়া তৈরি করে চলে। পানীয় জলের উৎস হিসেবে নদীর জল ব্যবহার করা মানুষজন এবং আমাদের মতোন গবাদি পশুদের মধ্যেও নানান রকমের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। জেলেদের জীবিকা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত তো হয়-ই হয়। তাছাড়া এসব কাণ্ডকারখানায় নদীর নিজেকে পরিষ্কার রাখবার ক্ষমতাটাও বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাহলেই বোঝো—তোমাদের ওসব ধর্মীয় আচারগত উদ্দেশ্যে “পবিত্র” জিনিসপত্তর নদীতে ঢেলে দেওয়ার এই প্রথা আদতে সবচেয়ে নির্মম আঘাত হানে তাঁদের ওপর, যাঁরা সেই নদীকে আশ্রয় করেই নিজেদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন।
তারপর, প্রসব করতে করতে আমরা যখন দুবলা হয়ে পড়ি, তখন তোমরা, হিঁদুরা, আমাদের এই বাতিল শরীরকে বেচে দাও “অন্য” ধার্মিকদের হাতে। ব্যাস, আমি খালাস! খতম। টাটা। বাই বাই। গুড বাই। গায়া!
এবার আসা যাক তথ্যের কথায়। একে একে সাজিয়ে দিই।
১। হিঁদু ভারতে মোষ-মাংস (Carabeef) রফতানির তামামি
১. ২০২২ সালে ভারত ১.৪৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন carabeef রফতানি করে, যার দাম প্রায় ২.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২. ২০২৩-২৪ সালে carabeef রফতানির মূল্য দাঁড়ায় ৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার এবং পরিমাণ প্রায় ১২.৯৬ লাখ মেট্রিক টন।
৩. ২০২৪-২৫ সালে রফতানির মূল্য ৩.৯২–৪.০৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ২০১৮ সালের পর প্রথমবার ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
৪. ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে মোষ-মাংস, দুগ্ধজাত ও পোল্ট্রি মিলিয়ে রফতানি ২.১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায় এবং প্রায় ২০% বেড়ে যায়।
৫. ২০১৪-১৫ সালে রফতানির পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১৪.৭৫ লাখ মেট্রিক টন; পরে দীর্ঘ পতনের পর ২০২৪-২৫ সালে পুনরুদ্ধার দেখা যায়।
৬. উত্তর প্রদেশ ভারতের মোট মোষ-মাংস উৎপাদনের প্রায় ৪০% যোগান দেয়; মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানাও এ ব্যাপারে ওস্তাদ।
৭. প্রধান রফতানি গন্তব্য হলো ভিয়েতনাম, মিশর, মালয়েশিয়া, ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব।
৮. ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম carabeef রফতানিকারক।
৯. ইন্দোনেশিয়ায় buffalo meat রফতানি বৃদ্ধির জন্য ভাজপা সরকার ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে।( মনে রাখবেন, ইন্দোনেশিয়ায় ৮৭% মুসলিম, হিঁদু মাত্তর প্রায় ১.৬৭–১.৭%
১০. পশ্চিম আশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব আশিয়ার বাজার লক্ষ্য করে ভারত হালাল সার্টিফিকেশনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
১১. Carabeef আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শ্রেণিবিন্যাসে “beef and veal” হিসেবে গণ্য হলেও ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে গরুর মাংস নিষিদ্ধ এবং মোষের মাংস অনুমোদিত—এই আইনি তফাৎ বড়ো নীতিগত ফাঁক।
২। Allana Group ও রাজনৈতিক অর্থনীতি
১২. Allana Group ১৮৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বৃহৎ খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও মোষ-মাংস রফতানিকারক গোষ্ঠী।
১৩. প্রতিষ্ঠানটি ৮৫টিরও বেশি দেশে পণ্য রফতানি করে এবং ভারতের অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারি খাদ্য-রফতানিকারক হিসেবে পরিচিত।
১৪. ২০১৯ সালে আয়কর বিভাগের ব্যাপক অভিযান ও কর ফাঁকির অভিযোগের পরও গোষ্ঠীটি রাজনৈতিক অনুদান প্রদান অব্যাহত রাখে।
১৫. ২০১৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে Allana Group ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলি BJP-কে ধারাবাহিকভাবে অনুদান ও ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে অর্থ প্রদান করেছে।
১৬. ২০২৪-২৫ অর্থবছরে BJP-কে ৩০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ গুণ বেশি।
১৭. একই সময়ে Allanasons-এর রাজস্ব ১০,০০০ কোটিরও বেশি টাকায় পৌঁছে যায়।
১৮. এই গোষ্ঠীর এক নির্বাহী পরিচালক মোদী সরকারের কর-সরলীকরণ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ নীতির প্রকাশ্য প্রশংসা করেন।
১৯. এরেই কয়, “ইমপিউনিটি লুপ”!
৩। প্রধান রফতানিকারক ও মালিকানা কাঠামো
২০. Allanasons Pvt. Ltd. ভারতের বৃহত্তম buffalo meat exporter।
২১. Frigorifico Allana, Frigerio Conserva Allana, Allana Cold Storage ও Indagro Foods Allana Group-এর গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
২২. Al Kabeer Exports প্রথমে যৌথ অংশীদারিত্বে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে ভারতীয় শাখার মালিকানা সম্পূর্ণভাবে Shaikh পরিবারের হাতে রয়েছে।
২৩. Al Hamd Agro Food Products, HMA Agro Industries, Al Faheem Meatex এবং Fair Exports India-কে মুসলিম মালিকানাধীন প্রধান রফতানিকারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২৫. গো-রক্ষা-সংক্রান্ত হিংস্রতা ছোট ব্যবসায়ীদের দুর্বল করে বৃহৎ রফতানিকারদের বাজার-নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে।
৪। গো-রক্ষক হিংস্রতা: তথ্য ও ঘটনা
২৬. ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে গো-রক্ষা-সংক্রান্ত হিংস্রতায় অন্তত ৪৪ জন নিহত এবং প্রায় ২৮০ জন আহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৭. নিহতদের অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন।
২৮. Reuters-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
২৯. ACLED-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০২৪ সময়কালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বহু হামলার একটি বড় অংশ cow vigilantism-এর সঙ্গে জড়িত।
৩০. ২০১৫ সালের দাদরি হত্যাকাণ্ডে মোহাম্মদ আখলাককে গরুর মাংস রাখার অভিযোগে হত্যা করা হয়; পরে মাংসটি মটন বলে জানা যায়। আরিয়ান নামের এক হিন্দু কিশোরকে আলটপকা খুন করে গো-রক্ষকরা।
৩১. ২০১৯ সালের আলওয়ার হিংস্র লিঞ্চিং ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।
৩২. ২০২৪ সালের চরখি দাদরি হিংস্রতা একই ধারাবাহিকতার অংশ।
৩৩. ২০২৫ সালে দিল্লির বিজয় নগরে গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগে চমন কুমারকে জনতা মারধর করে।
৩৪. বহু ক্ষেত্রে আদালতি আলসেমি ও ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হয়েছে।
৫। স্বয়ং শঙ্করাচার্য-এর সমালোচনা ও বিজেপির দু’মুখো চেহারা
৩৫. শঙ্করাচার্য অবিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী বিজেপির গো-রক্ষা নীতি ও মোষ-মাংস রফতানির কূটাভাসের তীব্র সমালোচনা করেন।
৩৬. তিনি যুক্তি দেন যে একদিকে গো-রক্ষার দাবি করা হলেও অন্যদিকে গোমাংস ও মোষ-মাংস রফতানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৩৭. ‘গৌ ধ্বজ স্থাপনা ভারত যাত্রা’ এবং ‘গৌ রক্ষা সংকল্প যাত্রা’-তে তিনি একই সমালোচনা করেন।
৩৮. ২০২৬ সালের কুম্ভ মেলায় তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার ভাজপার অসহিষ্ণুতার চরম নমুনা।
৩৯. তাঁর ‘শঙ্করাচার্য’ উপাধি ব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারি নোটিশ পাঠানো হয়।
[সূত্র: APEDA • DGCIS • USDA FAS • Human Rights Watch • ACLED • ECI • MCA • Supreme Court of India • Scroll.in • The Print • Zee News • Navbharat Live • The Wire • Reuters • Al Jazeera • Factly • The Quint • Economic Times • Siasat Daily • iref. net • Tribune India • Deccan Herald • IndiaSpend।]
এতো গেলো “বিফ/বাফ”-এর বাড়াবাড়ি। এবার যদি আমাদেরকে বাঙালির খাওয়ার নিয়ে কথা কইতে হয়? তখন?
আসলে কী জানেন, “বাংলা” খাওয়ার বলতে যা বুঝি, “বাংলা” ভাষা বলতে যা বুঝি, সেটা কোনো একরৈখিক, একপেশে ব্যাপার নয়। এর মধ্যে নানান শেডস, নানান অবশেষ মিলে গিয়েছে।
চলুন একটা গান শুনে নিই আবারঃ
“রুচি পাল্টাও, মনটা খুলে দাও
বাঙালির ভেতরেই spaghetti bolognese
চিংড়ি মাছের কোর্মা শুরু হয়েছে বর্মায়
পটলের দোলমা আসলে পর্তুগিজ
কাটলেট আসলে côtelettes ফরাসি
তোমার আহারে বাহারে গোটা পৃথিবী
জিলিপি কিন্তু ফিলিপিনো নয়, আরবের জেলেবি
তাই বাঙালিয়ানার মধ্যে রয়েছে অনেক রোয়াবি
ছিলে না তুমি কূপমণ্ডুক, ছিল না কুরুচি
রুচি গেল বলে বাড়লো তোমার এই mediocrity
জাতীয়তাবাদ নিয়ে কেন আজ করছো এত ঢং
তোমার মনের ভেতরে রয়েছে যে সাত সমুদ্দুরের রঙ
পুরানো সেই দিনের কথা ভুলতে বসেছো তাই
একসাথে গাই সকলে মিলে
Auld lang syne, dear
পুরানো সেই দিনের কথা Auld lang syne…” (অঞ্জন দত্তের “খাওয়ার গান”, “সাহেবের কাটলেট” চলচ্ছবিতে)
একগাদা বাংলা ব্যাকরণ যে আংলা-বাংলা “খিচুড়ি”, তা’বলেছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাই। এই খিচুড়ির ডাল বাংলায় মিলতোই না। বিহার থেকে ডাল না এলে খিচুড়ির স্বাদ মিলতোই না। এই ধরণের ঘণ্টপাক আকছার ঘটেই থাকে। খেয়াল রাখতে হবে যে এই সব ব্যাপারগুলো জোর করে চাপানো হচ্ছে, নাকি বিজ্ঞাপনের জেরে হচ্ছে বা স্বতস্ফুর্ত ভাবে ঘটছে।
যাই হোক, এসব কথা বলার শেষে, ইউরোপ আর প্রাচ্যের এই সংকর অবস্থানকে (ইতালিয়ান ঝিঁঝিট-এর মতো) সুনীতিবাবু উপস্থাপিত করেছন পরশুরামকে স্মরণ করে ঃ
“জজ মেজিষ্টর মহামেহাপাধ্যায় গণের দ্বারা পৃষ্ঠপোষিত
রেন্ডেজভোঁস
আংগ্লোমোঘলাই কেফের নবতম অবদানঃ
কচি ভাইটো পাঁঠার ইষ্টু
মুরগির ফ্রেঞ্চমালপো
ডবল-ডিমের রাধাবল্লভী।”
সাত।। আমাদের তর্পণের ইন্তেকাল
মহালয়ার সকালে দেখি দূষিত নর্দমা গঙ্গার জল দিয়ে “পিতৃ”-তর্পণ করছেন লোকজন, অথচ এইসব মন্তরের মানে জানেন না প্রায় কেউই।
“ওঁ যেঽবান্ধবা বান্ধবা বা যেঽন্যজন্মনি বান্ধবাঃ।
তে তৃপ্তিমখিলাং যান্তু যে চাস্মত্তোয়কাঙ্ক্ষিণঃ।।”
“যাঁরা এই জন্মে আমার বন্ধু বা আত্মীয় নন (শত্রু বা অপরিচিত), যাঁরা আমার আত্মীয় বা বন্ধু, অথবা যাঁরা পূর্ববর্তী কোনো জন্মে আমার আত্মীয় ছিলেন—এবং অন্য যে কেউ আমার হাত থেকে জল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেন, তাঁরা সকলেই এই জল গ্রহণে সম্পূর্ণ তৃপ্তিলাভ করুন।”
“ক্রূরাঃ সর্পাঃ সুপর্ণাশ্চ তরবো জিহ্মগাঃ খগাঃ। বিদ্যাধরা জলাধারাস্তথৈবাকাশগামিনঃ। নিরাহারশ্চ যে জীবাঃ পাপে ধর্ম্মে রতাশ্চ যে। তেষামাপ্যায়নায়ৈতদ্দীয়তে সলিলং ময়া।।”
“ভীষণ সর্পগণ, পক্ষীরাজ গরুড়ের বংশধরগণ (বা শিকারী পক্ষী), বৃক্ষসমূহ, কুটিলগামী (সরীসৃপ) ও আকাশে বিচরণকারী অন্যান্য পক্ষীগণ; বিদ্যাধর (একপ্রকার দেবযোনি), জলাশয়সমূহ এবং একইভাবে অন্তরীক্ষে বা আকাশে ভ্রমণকারী অন্যান্য সত্তাগণ; যাঁরা আহারহীন অবস্থায় (কষ্টে) আছেন এবং যে সমস্ত জীব পাপকর্মে অথবা ধর্মকর্মে লিপ্ত হয়ে আছেন—তাঁদের সকলের পুষ্টি ও পরম তৃপ্তির উদ্দেশ্যে আমি এই জল উৎসর্গ করছি।”
আরেকটা গপ্পো বলি। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর যুধিষ্ঠির পরাজিত করেন কৌরবদের — তাঁর চিরশত্রু দুর্যোধন সহ — এবং নিজের স্বজনদের উদ্দেশ্যে তর্পণ অর্পণ করেন। মহাকাব্যে এই ঘটনাটিকে কোনো ব্যতিক্রমী কাজ হিসেবে নয়, বরং ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবেই চিত্রিত করা হয়েছে: যে শত্রু রণক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছে, সেও জল পাওয়ার অধিকারী।
বিশেষভাবে, সেই মুহূর্তটি — যখন কুন্তী যুধিষ্ঠিরকে প্রকাশ করেন যে কর্ণ তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন — এবং তার অব্যবহিত পরেই যুধিষ্ঠির কর্ণের উদ্দেশ্যে তর্পণ দেন — এই দৃশ্যটি সেই নৈতিক যুক্তিকে পূর্ণ মূর্ত করে তোলে: শত্রু (যে আসলে অজ্ঞাতসারে স্বজনও ছিল) জলাঞ্জলি লাভ করে। মূল কথা এই যে তর্পণের ক্রিয়া “শত্রু” নামক জীবিতকালীন বর্গকে অতিক্রম করে যায়।
“যে কে চাস্মজ্জাতাঃ পুরুষাঃ পরে চ তেষাং শান্তিং তর্পণং চোদকং চ।।”
“আমাদের পক্ষে (বা আমাদের কুলে) জন্ম নেওয়া যে সমস্ত পুরুষেরা এবং যাঁরা আমাদের বিরোধী বা শত্রু পক্ষে ছিলেন—তাঁদের সকলের জন্যই শান্তি, তর্পণ এবং জল (উৎসর্গ করা হোক)।”
একদিকে এ যেমন শত্রু-মিত্রের সরল-তরল বাইনারি পেরোনো, আবার একই সঙ্গে এতো দেখি নিসর্গশৃঙ্গার! আস্তম্ভ ব্রহ্ম পর্যন্ত সবাইকে আমন্ত্রণ করে সম্পূর্ণ নিসর্গকে নিজের মধ্যে যেন আহ্বান করছি।
এখানেই জেগে ওঠে আদিরসের বিশ্বদোল। “শৃঙ্গার” ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ ইতরার সন্তান মহীদাসের বলা কথার মধ্যেই যেন অনেকখানি ধরা আছেঃ
“ঐতরেয় ব্রাহ্মণ বলছেন : আত্মসংস্কৃতির্বাব শিল্পানি। শিল্পই হচ্ছে আত্মসংস্কৃতি। সম্যক্ রূপদানই সংস্কৃতি, তাকেই বলে শিল্প। আত্মাকে সুসংযত করে মানুষ যখন আত্মার সংস্কার করে,অর্থাৎ তাকে সম্যক্ রূপ দেয়, সেও তো শিল্প। মানুষের শিল্পের উপাদান কেবল তো কাঠপাথর নয়, মানুষ নিজে। বর্বর অবস্থা থেকে মানুষ নিজেকে সংস্কৃত করেছে। এই সংস্কৃতি তার স্বরচিত বিশেষ ছন্দোময় শিল্প। এই শিল্প নানা দেশে, নানা কালে, নানা সভ্যতায়, নানা আকারে প্রকাশিত, কেননা বিচিত্র তার ছন্দ। ছন্দোময়ং বা এতৈর্যজমান আত্মানং সংস্কুরুতে। শিল্পযজ্ঞের যজমান আত্মাকে সংস্কৃত করেন, তাকে করেন ছন্দোময়।” (বাঙলা ছন্দের প্রকৃতি, ছন্দ)
এখানেই ফুটে ওঠে, রূপ পায় আত্মের আবাদ, যা সময়ের মধ্যে না ঘটাতে পারলে ফসল ফলবে না! প্লেটো একেই অন্যভাবে বলেছিলেন “epimelia heateaou”, যাকে ফুকো বুঝলেন ‘care of self”-এর মাধ্যমে। তবে এ “সেলফ” যেমন-তেমন “সেলফ” নয়। এই সেলফ আপন ঘরের দেবালয়ের কোণে পড়ে থাকা “এক” সত্তা নয়, বরং বিশ্ব সাথে যোগ বিহারে সদা-সর্বদা মত্ত। এই সেলফ “অয়ম” (আমি) থেকে “বয়ম”-এর দিকে পাড়ি দেওয়া, বান্টু ভাষায় যাকে ধরা হয় “উবুন্তু”-র ধারণা দিয়ে।
মুশকিল হলো, মারকুটে হিঁদুত্ববাদীরা এতশত সমোস্কৃত জানেন না। তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি তাদের ঘিরে রেখেছে। তবু আমরা বিশেষভাবে আহরণ করি মহাবিশ্বকে। এর নাম ব্যাহৃতি। রবি ঠাকুর বলেনঃ
“ভারতবর্ষে এই উদ্বোধনের যে মন্ত্র আছে, তাহাও অত্যন্ত সরল। তাহা একনিশ্বাসেই উচ্চারিত হয়–তাহা গায়ত্রীমন্ত্র। ওঁ ভূর্ভু বঃ স্ব–গায়ত্রীর এই অংশটুকুর নাম ব্যাহৃতি। ব্যাহৃতিশব্দের অর্থ–চারিদিক হইতে আহরণ করিয়া আনা। প্রথমত ভূলোক-ভুবর্লোক-স্বর্লোক অর্থাৎ সমস্ত বিশ্বজগৎকে মনের মধ্যে আহরণ করিয়া আনিতে হয়–মনে করিতে হয়, আমি বিশ্বভুবনের অধিবাসী–আমি কোনো বিশেষ-প্রদেশবাসী নহি–আমি যে রাজ-অট্টালিকার মধ্যে বাসস্থান পাইয়াছি, লোকলোকান্তর তাহার এক-একটি কক্ষ।” (“ধর্মের সরল আদর্শ”, ধর্ম)
“সাধনা” বক্তিমেতেও রবি ঠাকুর এই একই কথা কয়েছেন।
আচ্ছা, আমরা এতো সমোস্কৃত ঝাড়ছি কেন? কারণ আমি জানি, বিষকে বিষ দিয়েই মারতে হয়ঃ বিষস্য বিষ মহৌষধম্। আনপড় হিঁদুত্ববাদীদের বিষকে মারতে গেলে সংস্কৃতের বিষ দিয়েই মারতে হবে। এইভাবেই আমাদের শেকড় থাকে, আবার ডানার খোঁজও চলতে থাকুক।
“আগন্তুক” চলচ্ছবিতে ভবঘুরে “নিমো” (নো-ওয়ান!) মনমোহন বারংবার সেই শেকড় আর ডানাকে দেখিয়েছেন। শঙ্খ ঘোষের অনুবাদে তাই আবারো বলে ফেলি হিমেনেথের একটি দু’লাইনের কবিতাঃ “শিকড়ের ডানা হোক, ডানার শিকড়।”
কোনো মোহরঞ্জিত মন্তরের নেশায় নয়, নিজের মধ্যে চাগিয়ে তুলতে হবে, বারবার বলতে হবে, এই মহাবিশ্বে আমি একটা ছোট্টতম বিন্দু মাত্র। তাহলে, কার্ল সেগানের সেই কথাটা মনে পড়বে। মনে পড়বে কিভাবে তিনি ভয়েজার-১-এর তোলা ছোট্ট নীল ফুটকি পৃথিবীর ছবি নিয়েই তাঁর “pale blue dot… on a mote of dust suspended in a sunbeam” কয়েছিলেন।
এখন আমরা মানবগোত্রে থিতু হয়ে লেননের “ইমাজিন” শুনছিঃ
“Imagine there’s no countries
It isn’t hard to do
Nothing to kill or die for
And no religion, too
Imagine all the people
Livin’ life in peace
You may say I’m a dreamer
But I’m not the only one
I hope someday you’ll join us
And the world will be as one.”
আমরা আদতে সেই কলকাতার বাঁড়ুজ্জ্যে, যারা এই মহাবিশ্বের বাসিন্দে হয়েই থেকে যেতে চায়।
“নক্ষত্রেরা দূরে
আমাদের কাছ থেকে
অনেক, অনেক দূরে।…
আর তাদের মাঝখানে কী ক্ষুদ্র আমাদের এই পৃথিবী
একটি কণিকা মাত্র
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি বিন্দু।…
পৃথিবীকে পাঁচ টুকরো করলে তার এক টুকরো
এশিয়া
এশিয়ার অনেক দেশের একটি দেশ
ভারতবর্ষ,
ভারতবর্ষের অনেক শহরের একটি শহর
কলকাতা,
সেই কলকাতার একটি মানুষ
বাঁড়ুজ্জ্যে।” – নাজিম হিকমত (তর্জমাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়)
এই বয়ান খতম করবার আগে আরো একটা ব্যাপার স্মরণে রাখা দরকার।
দক্ষিণেশ্বরের এক নিরক্ষর পুরুত একটা গপ্পো বলেছিলেন।
তোতাপাখিকে বুলি শেখানো হয়। সে হরিনাম করে। তার গলাটা টিপে ধরো। সে ট্যাঁ ট্যাঁ করে চিৎকার করবেই করবে – করতে বাধ্য। অর্থাৎ ধাক্কা খেলে, মার খেলে, ঝাড় খেলে, রাগ হলে আমরা যে ভাষায় গালাগালি দিই, প্রতিবাদ করি, প্রতিরোধে নামি, তখন যে ভাষাটা বেরিয়ে আসে- সেটাকেই বলা চলে আর্তনাদের ভাষা।
আর্তনাদের ভাষা কখন তৈরি হয়? কীভাবে তৈরি হয়? মায়ের পেট থেকে বাচ্চা বেরোনোর পর চিল-চিৎকার করে— জন্মানোটাই যেন একটা ট্রমাটিক ব্যাপার, এ হলো সেই আর্তনাদ। এ জগত-সংসার যে দুঃখময়, তথাগত বুদ্ধের সেই আর্য সত্য স্মরণ করি।
আন্তর্জাতিকতা, বিশ্বনাগরিকত্বের পরিচয় বজায় রাখা মানে কিন্তু চ্যাটাই চাপা দিয়ে বহুত্বের, না-একান্ত পরিচয়দের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে তুচ্ছ করে দেওয়া নয়। আমাদের এই প্রয়াসে তাই ছিলো এই দুই মেরুকেই আরো বেশি মেরুকৃত না করে একটা সমভাব তৈরি করা – যাকে বলে equilibrium বা বলা ভালো “syncretism”!
আমাদের শেষ (?) তর্পণ তাই আজকের দিনে এই আর্তনাদের ভাষাকে অহিংসভাবে চাগিয়ে তোলবার উদ্দেশ্যে নিবেদিত হল।।
দেপ্রব-র নিম্নোক্ত লেখা-পত্তরে লিস্টি থেকে ওপরের বইতে ব্যাপকভাবে ঝাড়া হয়েছেঃ
বাংলা ব্যাকরণের প্রত্নতত্ত্ব ARCHAEOLOGY OF BANGLA GRAMMAR VIEW HERE ⤡
“মান্দাস” থেকে শীঘ্র প্রকাশিতব্য আব-র লিখিত বই “ভগৎ-এর ভূত” কিতাব থেকেও বিস্তর ঝাপা হয়েছে।
